ঈমান না থাকাই কি ডিপ্রেশন বা সুইসাইডাল হওয়ার মূল কারণ?

আমাদের মধ্যে অনেকের একিন ইসলামের রজ্জু মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরে থাকলে তার উপর ডিপ্রেশন বা সুইসাইডাল চিন্তা ভর করা মুমকিন না। হলিউড-বলিউডসহ ভোগবাদী দুনিয়ার আইডলরা যখন সুইসাইড করেন বা ডিপ্রেশন নিয়ে ওয়াজ করেন তখন আমাদের মধ্যকার এই ধারণা আরও পাকাপোক্ত হয়। কিন্তু আসলেই কি শুধুমাত্র ঈমান থাকলেই ডিপ্রেশন ও সুইসাইডাল হওয়ার হাত থেকে আজাদী মেলে?
একথা সত্য যে কিছু গবেষণা দেখাচ্ছে যে মুসলমান সমাজে আত্মহত্যার হার কম। তবে আমরা যদি ঈমান ও মুসলমানিত্বের প্রসঙ্গ আনি তাহলে নবীজীর চেয়ে বড় মুমিন ও মুসলমান আর কেউ নাই। অথচ কোরানে এবং নবীজীর জীবনে ডিপ্রেশন এবং আত্মহত্যাপ্রবণতার কথা এরশাদ হয়েছে। যখন দীর্ঘদিন ওহী আসা বন্ধ ছিল তখন নবীজী মক্কার সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহন করেছিলেন। নিজের জীবননাশের পরিকল্পনা ছিল তাঁর। এছাড়াও কোরানে পাকে আল্লাহ তা’লা এরশাদ করেছেন যে মানবজাতির দুঃখ দুর্দশা এবং পাপ-পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত থাকা নবীজীকে ডিপ্রেস্‌ড করে (Rosenthal, 1946)।
সৃষ্টির আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত সবচেয়ে মহিমান্বিত ইনসানও তাহলে সুইসাইডাল ও ডিপ্রেশনের দশা অতিক্রম করেছেন! তাহলে একথা আর বলার কোনই অপেক্ষা রাখে না যে শুধুমাত্র ঈমান থাকলেই সুইসাইডাল চিন্তা ও ডিপ্রেশন থেকে মুক্ত হওয়া যায় না। এখানে আমার সীমিত অবজার্ভেশনে দেখেছি যাদের মধ্যেই সত্য অন্বেষণের চিন্তা আছে তারাই জীবনে কখনো না কখনো ব্যাপক মানসিক পীড়ন, সুইসাইডাল চিন্তা ও ডিপ্রেশনের মধ্যে দিয়ে গেছেন। সত্য বড়ই যন্ত্রনাদায়ক। একটা সত্য উপলব্ধি করতে হলে অনেক কোরবানী স্বীকার করতে হয়। সাহাবাদের অনেকের ইসলাম গ্রহণের ঘটনা পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পারি ইসলাম গ্রহণের সময়টা তাদের জন্য অনেক যন্ত্রনাদায়ক ছিল। কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা, কোনটা করা উচিত আর কোনটা করা উচিত, বাপ-দাদার ধর্ম-দর্শন-সম্পর্ক বিসর্জন দিয়ে সত্যের রাস্তায় হাঁটাটা আসান ছিল না। এমনকি অনেক কাফের-মুশরেক যারা ইসলাম গ্রহণ করে নাই তারাও ইসলাম নিয়ে চিন্তা করতে গিয়ে মানসিক দ্বন্দ্বের সম্মুখীন হয়েছে। আধুনিক যুগে যারা মুসলমান থেকে মুরতাদ হয় তারাও অনেকসময় চিন্তার ভ্রান্তির শিকার হয়ে মারাত্মক মানসিক কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে এক পর্যায়ে ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। আবার যেসমস্ত কাফের-মুশরেক ইসলামে প্রত্যাবর্তন করেন তারাও একইভাবে সত্যের আগুনে ঝলসে তবেই ইসলামে প্রবেশ করতে পারেন।
এপ্রসঙ্গে আমরা উল্লেখ করতে পারি মরিয়ম জামিলার কথা। মরিয়ম জামিলা ছিলেন আমেরিকান ইহুদী। সত্যের অন্বেষণে মরিয়ম জামিলা এতটাই অধীর ছিলেন যে তিনি দুইবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েও গ্রাজুয়েশন করতে পারেন নাই। তাঁর পরিবার তাঁকে একাধিকবার পাগলা গারদে রাখে। একটা পর্যায়ে মরিয়ম জামিলা মিশরের শহীদ সাইয়েদ কুতুব ও পাকিস্তানের মাওলানা মওদূদীর সাথে পত্র মারফত পরিচিত হন। মরিয়ম জামিলা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং দারুল ইসলামে বসবাসের নিয়্যতে জাহাজে করে আমেরিকা থেকে পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। পাকিস্তানে মরিয়ম জামিলা মাওলানা মওদূদীর আতিথেয়তা লাভ করেন এবং মাওলানা তাঁকে এক জামাত কর্মীর সাথে শাদী করিয়ে দেন। পাকিস্তানে এসেও মরিয়ম জামিলার সত্য অন্বেষণ বন্ধ থাকে নাই। সত্যের যন্ত্রনায় এখানেও মরিয়ম জামিলাকে কাতর হতে হয়। মাওলানা মওদূদীও মরিয়ম জামিলাকে পাগলাগারদে ভর্তি করেছিলেন। পরবর্তীতে মরিয়ম জামিলা আবার সুস্থির হন এবং কিছুদিন আগে ইন্তেকাল করেন (Baker, 2011)।
এছাড়াও, পশ্চিমা সভ্যতার চিন্তকদের মাঝেও এই প্রবণতা লক্ষনীয়। কোঁত, মার্ক্স, ডুর্খেইম, ফ্রয়েড, ওয়েইবার প্রত্যেকেই ট্রমা, মার্জিনালাইজেশন, ডিপ্রেশন, অথবা মানসিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছেন এবং তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাদের চিন্তাকেও প্রভাবিত করেছে (Kurtz, 2016)।
নিরেট দুনিয়াবী কারণে আত্মহত্যা ও ডিপ্রেশন নিয়ে আধুনিক যুগে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণা করেছেন এমিল ডুর্খেইম। ডুর্খেইমের মতে আত্মহত্যার হার বেশী হয় মারাত্মক সামাজিক পরিবর্তনের সময়। যেমনঃ হুট করে বড়লোক হয়ে যাওয়া বা হুট করে গরীব হয়ে যাওয়া। একারণে বিভিন্ন পটপরিবর্তনের সময় আত্মহত্যা বেশী দেখা যায়। আবার প্রচন্ড কড়া শাসনের মধ্যে থাকা এবং একদম বাঁধনহারা স্বাধীন উভয় প্রকার মানুষের মধ্যেই আত্মহত্যার প্রবণতা বেশী দেখা যায় (Lester, 1991)।
আবার, সমাজ থেকে অতিবিচ্ছিন্নতা এবং সমাজের সাথে অতিএকাত্মতাও আত্মহত্যাপ্রবণ করতে পারে মানুষকে। যেমনঃ মানুষ যখন সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, সমাজ তাকে সাপোর্ট দেয় না, পথ দেখায় না তখন সে আত্মহত্যা করে। আবার, যদি সে সমাজের সাথে এতটাই নিজেকে জুড়ে ফেলে যে সমাজের জন্য সে জীবন দিতে প্রস্তুত তখন সে সেনাবাহিনী বা এধরণের ঝুঁকিপূর্ণ সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করে প্রাণোতসর্গ করে (Thompson, 1982)।
মোদ্দা কথা হচ্ছে, শুধুমাত্র ভোগবাদীতা বা ঈমানহারা হওয়ার কারণেই যে মানুষ আত্মহত্যাপ্রবণ হয় এমন না। বরং সত্যের প্রতি প্রবল আকর্ষণও মানুষকে বিমর্ষ, এমনকি আত্মহত্যাপ্রবণ করে তুলতে পারে। একারণেই আমাদের সবসময় আল্লাহ তা’লার সাহায্য চাইতে হবে। সম্ভবত এই একই কারণে আল্লাহ্‌ আমাদেরকে নিজেদের সন্দেহের মধ্যে ফেলে দিতে নিষেধ করেছেন। অনেক মুসলমান ঠিকমত ঈমান না এনেই অন্যান্য ধর্মের বইপত্র পড়া শুরু করেন। ইসলামে এটা নিষেধ করা হয়েছে। সম্ভবত এটাও তার একটা কারণ। সত্যের ভার সবাই সইতে পারে না। একারণে আল ফারাবি সত্যের বিভিন্ন স্তরবিন্যাস করেছেন। যারা একদম পুরোপুরিভাবে সত্যকে উপলব্ধি করতে পারে তাদের জন্য সত্যের সর্বোচ্চ স্তর। যারা সত্যের ভার বইতে পারার সক্ষমতা নাই তাদের জন্য রয়েছে নীচু স্তরের সত্য। এই নীচু স্তরের সত্য হচ্ছে তাই যা মুসলমান সমাজে সাধারণ জ্ঞান আকারে পাওয়া যায়। এটার জন্য গবেষণা বা বিষেশ বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন হয় না (Vallat, 2016)।
Baker, D. (2011). The Convert: A Tale of Exile and Extremism. Minneapolis: Graywolf Press
Kurtz, L. (2016). Religious life in the global village. In Gods in the global village (pp. 1-44). Thousand Oaks, CA: SAGE Publications, Inc doi: 10.4135/9781483399119.n1
Lester, D. (1991). Totalitarianism and Fatalistic Suicide, The Journal of Social Psychology, 131(1), 129-130, DOI: 10.1080/00224545.1991.9713831
Rosenthal, F. (1946). On Suicide in Islam. Journal of the American Oriental Society, 66(3), 239-259. doi:10.2307/595571
Thompson, K. (1982). Emile Durkheim. New York : Tavistock Publications
Vallat, T. (2016). Principles of the Philosophy of State. in The Routledge Companion to Islamic Philosophy. R. C. Taylor and L. C. Lopez-Farjeat (Eds.). London: Routledge

Leave a Reply