ইতিহাস বিকৃতি: একটি খালদুনীয় বিশ্লেষণ

  1. মানুষ অতীতের দর্পণে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে উঠতে চায়৷ সে মূলত মরিয়া থাকে অতীতের পাতায় নিজের বর্তমান কার্যাবলীর একটা বৈধতা খুঁজে পেতে৷ সেজন্যই আমরা আমাদের চারপাশে হারহামেশা দেখে উঠি— দায়িত্বশীলরা একেক কাজ করে বসে আর ত্রুটি ঢাকতে দোহাই পাড়েন অতীতের : পিতা এমন করেছেন৷ পিতার স্বপ্ন এমন ছিল৷ পিতার দেখানো তরিকায় এসব চলছে৷

আমরা তো দেখছিই— রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের সিংহভাগেরই বৈধতা দেয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে ওই অতীতের ‘পিতার’ কাঁধে সওয়ার হয়ে৷

নবিজী যখন ইসলামের বার্তা নিয়ে মক্কার কাফিরদের দুয়ারে গিয়ে দাঁড়ালেন তারা প্রত্যাখ্যান করে বসলো৷ তাদের দোহাই ছিল ওই অতীত— মুহাম্মাদ আমাদেরকে বাপ দাদাদের ধর্ম থেকে বিমুখ করতে চায়৷ আমাদের পূর্ব পুরুষ মূর্তির পূজা করে গেছে৷ আমরা কেন তা ছেড়ে নিরাকার এক আল্লাতে ঈমান আনব!

তারা তাদের মূর্তি পূজার বৈধতার জন্য অতীত হাতড়ে ফিরেছে৷ নিকট অতীতে পেয়েও গেছে তাদের কর্মের ‘সমর্থন’৷

ইবনে খালদুন আমাদের জানাচ্ছেন— এইখানেই ভুলটা করে বসে বর্তমানে বাস করা মানুষটি৷ সে তার কাজের সমর্থনে অতীতের ওই চ্যাপ্টারটাই মেলে ধরে যেটা তার পক্ষে৷ মক্কার কাফিররা কিন্তু তাদের অতীত হাতড়ে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম পর্যন্ত যায়নি৷ তাহলে দেখতে পেতো— মূর্তির বিপক্ষে সব চাইতে কঠিন ‘মূর্তি’ ধারণ করেছিলেন যিনি তিনি তাদেরই ‘পিতা’৷

ইতিহাসের বিকৃতিরও সূচনা— এই অতীতের দর্পণে নিজের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাবার উৎসাহ থেকে৷ যখন মানুষ দেখে তার কর্মের বৈধতা অতীতের পাতা উল্টে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না তখনই সে অতীতকে সাজিয়ে নেয় নিজের মতো করে৷ ইতিহাস লিখতে বসে মনের মাধুরি মিশিয়ে৷ তখন নৈর্বক্তিকতা তার উদ্দেশ্য থাকে না; নিজের কর্মের বৈধতা তৈরি করাটাই হয় তার মুখ্য৷ স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাস রচনাতে তার ছটা দেখতে পাবেন বোদ্ধা পাঠক৷

ইবনে খালদুনের এই বিশ্লেষণ থেকে আমরা কিন্তু একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি৷ ঐতিহাসিক বিকৃতি ঘটে থাকে বর্তমানে বাস করা মানুষটির নৈতিক স্খলনের কারণে৷ নৈতিকভাবে বর্তমানের মানুষটি যদি সৎ থাকেন নিজের প্রতি, দায়বদ্ধ থাকেন ইতিহাসের প্রতি তবে ঐতিহাসিক বিকৃতি ঘটতে পারে না৷ এই যে আমরা দেখে উঠি— প্রতি কালেই ইতিহাসের বিকৃতি যেমন ঘটেছে আবার ঐতিহাসিক তথ্যাবলী যথাযথ পৌঁছেছেও আমাদের হাতে তার কারণ ওই কিছু মানুষের দায় বদ্ধতা৷ তাদের ঐতিহাসিক সততা৷

প্রতি যুগেই অজস্র বুনোফুলের ভেতর মোহনীয় সুবাস ছড়িয়ে যায় কোনো রজনীগন্ধা৷ বুনোফুল এড়িয়ে ওই রজনীগন্ধার সুবাসটুকু তুলে আনতে পারাটাই ‘ঐতিহাসিক’ সফলতা৷

Leave a Reply