দাতব্য কার্যক্রমের স্বৈরাচারপ্রীতি

যেকোন দূর্যোগে মানুষের মধ্যে দান-খয়রাতের হিরিক পড়ে। বিদেশী অনুদান, এনজিও-দের কর্মততপড়তা ও ব্যক্তি উদ্যোগে মানুষকে সহায়তার কোন কমতি থাকে না। শুধু দুর্যোগের ক্ষেত্রেই নয়, দীর্ঘমেয়াদী অভাব ও অনুন্নয়ন ঘোচাতেও এধরনের দাতব্য কার্যক্রম চোখে পড়ে। নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের জুলিয়াস সিলভার প্রফেসর অব পলিটিক্স ও আলেক্সান্দার হ্যামিল্টন সেন্টার ফর পলিটিকাল ইকোনমির ডিরেক্টর ব্রুস বুনো ডে মেসকেটা (Bruce Bueno de Mesquita) এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির অধ্যাপক এলেস্টার স্মিথ (Alastair Smith) তাঁদের সার জাগানো বই The Dictator’s Handbook (Public Affairs, 2011)-এ দাতব্য কার্যক্রম কিভাবে স্বৈরাচারকে সহায়তা করে সে সম্পর্কে তাদের গবেষণার ফলাফল দেখান।

অধ্যাপকদ্বয় আমাদের দেখান যে অনুদানের রাজনীতির দুইটা দিক আছে। একটা হচ্ছে আন্তর্জাতিক, আরেকটা ঘরোয়া। আন্তর্জাতিকভাবে দাতা দেশগুলি অনুদানের মাধ্যমে গ্রহীতা দেশের আনুগত্য খরিদ করে। ঘরোয়াভাবে এই অনুদান ও অন্যান্য এনজিও ও ব্যক্তি উদ্যোগে দান-খয়রাত স্বৈরাচারকে টিকে থাকতে সহায়তা করে। উদাহরণ হিসাবে তাঁরা কম্বোডিয়ার কথা তুলে আনেন। কম্বোডিয়াতে এনজিওর মাধ্যমে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে প্রচুর অনুদান পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এর ফলে দূর্নীতিবাজ স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থাই শুধু লাভবান হয়েছে। এর অর্থ কিন্তু এই না যে অনুদানের টাকা সরাসরি সরকার মেরে দিয়েছে। বরঞ্চ এখানেই রয়েছে অনুদানের রাজনীতি। ধরা যাক, কম্বোডিয়াতে কোন এনজিও শিক্ষাখাতে অর্থ ব্যয় করছে না। এখন তাহলে সরকারকেই শিক্ষার্থীদের শিক্ষার ব্যয়ভার বহন করতে হবে। কিন্তু যখনই এনজিওগুলি তাদের কার্যক্রম শুরু করছে তখনই সরকার তাদের দায়িত্বে ফাঁকিবাজির সুযোগ পাচ্ছে। কোন একটা গ্রামে যদি একটা এনজিও ৫০ জন শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দেয় তাহলে সরকার ঐ ৫০ জন শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দেয়ার দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেল। কিন্তু সরকারি বরাদ্দে তো ঐ শিক্ষার্থীদের জন্যও অর্থ বরাদ্দ ছিল। ওটা তাহলে কোথায় যাচ্ছে? ওটাই সরকারের নানান স্তরের লোকদের পকেটস্থ হচ্ছে। সরকারের পকেটও ভারী হচ্ছে, আবার সরকার দেখাতেও পারছে যে শিক্ষা ব্যবস্থা তো সচল আছে। এইভাবেই বিদেশী অনুদান, এনজিও, এবং ব্যক্তি উদ্যোগে দান-খয়রাত একটা স্বৈরাচারী সরকারকে টিকিয়ে থাকতে ও আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে সহায়তা করে।

করোনাভাইরাস-সহ বিভিন্ন দুর্যোগের সময় দেশে দেশে দেখবেন বেসরকারী সংস্থা, এনজিও, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির জনকল্যানের হিরিক পড়ে গেছে। মানুষ নিজে থেকে অন্যের উপকার করছে। এইগুলা একটা গণতান্ত্রিক দেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু স্বৈরাচারী কোন দেশে এধরণের কার্যক্রমের অর্থই হচ্ছে জনগনের ট্যাক্সের টাকা যে সরকার খেয়ে ফেলছে ওটা আড়াল করে বেসরকারী সংস্থা ও জনগনের ওপর দুর্যোগ মোকাবেলার দায় চাপিয়ে দেওয়া। এজন্যই অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় পৃথিবীর বিভিন্ন স্বৈরাচারী দেশে তারাই সরকারকে দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য না বলে জনগনকে এগিয়ে আসতে বলে যারা বিভিন্নভাবে স্বৈরাচারের সুবিধাভোগী। এমনকি যেসমস্ত কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ও এনজিও জনকল্যানে এগিয়ে আসে তাদের অধিকাংশও বিভিন্নভাবে স্বৈরাচারের পদলেহী। এখানে মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে স্বৈরাচারের দুর্নীতি ও অদক্ষতাকে আড়াল করে জনগন ও বেসরকারী সংস্থার ঘাড়ে দায়িত্ব চাপানো।

Leave a Reply