শরিয়তির মার্ক্সপাঠের দুটি ক্রিটিক্যাল দিক

আলি শরিয়তি তার ম্যান মার্কসিজম এন্ড ইসলাম  বই-তে চারটি বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা সম্পর্কে চিহ্নিত করেছেন – যেসব ধারা পারস্পরিক বৈপরীত্য ও পার্থক্য সত্ত্বেও নিজেদের মানবতাবাদী হিসেবে উপস্থাপন করে ।

১. পশ্চিমা উদারনীতিবাদ
২. মার্কসবাদ
৩. অস্তিত্ববাদ
৪. ধর্মসমূহ

এ গ্রন্থে মার্কসবাদ যেহেতু প্রধান উপপাদ্য, সে হিসেবে মানবতার সাথে মার্কসবাদের সম্পর্কের প্রশ্নকে ফোকাস করা সঙ্গত ভাবছি ।

প্রথমত:

আলি শরিয়তি দেখাচ্ছেন যে, মার্কসবাদ সহ ইউরোপ কেন্দ্রীক যে মানবতাবাদ একটি সময়ে বিকশিত হয়েছিল, তার সূতিকাগারে আছে ‘মানবতা সম্পর্কীয়’ গ্রীক পৌরাণিক ধারণা। গ্রিক পুরাণের দেবতাগণ প্রাকৃতিক শক্তি-গুলোরই প্রতিনিধিত্ব করে। যেমন: সমুদ্র, নদী, ভূমিকম্প, রোগ, মহামারী এবং মৃত্যু। এ কারণে দেবগণ ও মানুষের মধ্যবর্তী দ্বন্দ্ব মূলত প্রাকৃতিক শক্তির আধিপত্যের বিরুদ্ধে মানুষের সেই লড়াই যা মানুষের জীবন, আকাঙ্ক্ষা এবং নিয়তিকে নির্ধারণ করে। একজন মানুষ তার ক্রমাগত সচেতনতা দ্বারা প্রাকৃতিক শক্তির আধিপত্য থেকে মুক্ত হতে চায় এবং সেই মুক্তির পথ ধরে সে নিজেই শাসকের স্থানে অধিষ্ঠিত হয়ে প্রাকৃতিক শক্তির মধ্যে থেকে সবচেয়ে প্রভাবশালী হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করতে চায়। এরই ভিত্তিতে গ্রিক মানবতাবাদ মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব দেখে সৃষ্টিকর্তাকে বর্জনের মধ্য দিয়ে; কালক্রমে, এই তত্ত্বটিই গ্রিসের মানবতাবাদ থেকে উৎসারিত হয়ে ইউরোপের মানবতাবাদের রুপ পরিগ্রহ করেছে।

শরিয়তি এর বিপরীতে ইসলামের প্রাসঙ্গগিকতা তুলে ধরেছেন। যদিও খৃষ্টবাদের বাইবেলীয় শিক্ষার দয়া ও মানবতার প্রসঙ্গ তুলে ধরা যেত, তথাপি, শরিয়তি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন আদিপাপ বা original sin এর কারণে। খৃষ্টবিশ্বাস তাদের আদিপাপের ধারণার মধ্যে দিয়ে বলতে চেয়েছে যে, মানবজাতি আদম আ. এর পাপের দায়ে দীর্ঘকাল ছিল ন্যুব্জ। যীশুখৃষ্ট শূলে বিদ্ধ হওয়ার ভেতর দিয়ে মানবজাতিকে মুক্তি দিয়েছে । এ বিশ্বাস দু’দিক থেকে মানবতা-বিরুদ্ধ:

১. আদমের আ. পাপের কারণে সমগ্র সৃষ্টির দায়বদ্ধতা।
২. সমগ্র মানুষের পাপের কারণে যীশুর ক্রুশ বিদ্ধ হওয়া।

এখানে যে বিষয়টি বিবেচ্য, তা হলো, মার্কসবাদ, সার্ত্রের লালিত অস্তিত্ববাদ সহ ইউরোপ কেন্দ্রীক যতসব মানবতাবাদের সূচনা হয়েছিল, সেসব ব্যাপক অংশে গ্রীক পৌরাণিক ও রোমের পোপতন্ত্রে নিষ্পেষিত মানবতার বিভৎস রুপ থেকে মুক্তি লাভের জন্য গড়ে উঠেছিল। পরবর্তীকালের ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ; তারও পদযাত্রা হয়েছিল নাৎসি বাহিনীর বর্বরতার রক্ত মেখে। আদতে ইউরোপের মানবতাবাদীরা কখনো ইসলামের মানব সম্পর্কীয় ধারণাকে পাঠযোগ্য ভাবেনি। এ বিষয়টির সাথে মার্কসের আরেকটি দূর্বলতার জায়গা অনেকেই চিহ্নিত করেছেন, তা হলো – ধর্ম সম্পর্কে মার্কসের অসম্পূর্ণ পাঠ। ইরানের মার্কসবাদী চিন্তক আসিফ বায়াত আলি শরিয়তির ‘ম্যান মার্কসিজম এন্ড ইসলাম‘ বইয়ের একটি সমালোচনা লিখেছেন, যা Shariati and Marx : a critique of an Islamic critique of Marxism (শরিয়তি- মার্কস : মার্কসবাদের একটি ইসলামী সমালোচনার সমালোচনা) নামে প্রকাশিত হয়েছে।

তিনি এতে মার্কসের এ দূর্বলতা স্বীকার করে বলেছেন, “এটি সত্য যে মার্কসের ধর্ম সংক্রান্ত জ্ঞান খ্রিস্ট ও ইহুদি ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তিনি ইসলাম, হিন্দু ও তাওবাদ প্রভৃতি প্রাচ্য দেশীয় ধর্ম সম্পর্কে বিশেষ পরিচিত ছিলেন না”। সুতরাং, গ্রীক পৌরাণিক ধারণাকে কেন্দ্র করে মার্কস ধর্ম ও স্রষ্টার প্রাসঙ্গগিকতাকে যেভাবে উপেক্ষা করেছেন, তা অবশ্যই একদেশদর্শীতা। এবং ধর্মে মানবতা উপেক্ষিত হওয়ার প্রশ্নটাও যুগপৎ বাতিল ।

দ্বিতীয়ত :

আলি শরিয়তি দেখাচ্ছেন যে, গ্রীক পৌরাণিক বিশ্বাসে মানবতার বিপর্যস্ত অবস্থাকে বি-মূর্তায়ন করার লক্ষ্যে মার্কস যে ধারণার জন্ম দিয়েছেন, তা আগাগোড়া বস্তুবাদী। মার্কস তার মানব মুক্তির ধারণার বলয় থেকে ‘আধ্যাত্মবাদকে’ ঝেটিয়ে বিদায় করেছেন। ফলে পুজিঁ ও বস্তুর নিপীড়ন থেকে মানবের মুক্তির ধারণায় মার্কস আরো বেশি বস্তু ও পুজিঁবাদী হয়ে উঠেছেন।

আলি শরিয়াতীর দ্বিতীয় টপিকে কেউ কেউ অবশ্য প্রশ্ন তুলেছেন। এক্ষেত্রে তারা ভিত্তিমূলে রেখেছেন এরিখ ফ্রমের Marx’s concept of man ( মানব সম্পর্কে মার্কসের ধারণা)। এরিখ ফ্রম মনে করতেন, “মার্কস ছিলেন একাধারে অস্তিত্ববাদী ও মানবতাবাদী – যে কারণে মানুষ তার সার্বিক মানবতার ও মুক্তির স্বাদ আস্বাদন করার সাথে সাথে তার সার্বিক সৃজনশীলতার পূর্ণ বিকাশ ঘটাবে”। ফ্রমের মতে, যেহেতু মার্কস ব্যক্তির সার্বিক বিকাশে বিশ্বাসী, ফলে মার্কস মানুষের একধরনের আত্মিক মুক্তির কথা বলেছেন, তবে তা ধর্মীয় আধ্যাত্মিকতা থেকে ভিন্ন। ”

এদিকের বিবেচনায়, শরিয়তির সমালোচনার দ্বিতীয় টপিক অনেকটাই বিতর্কিত। তবে, মার্কসের আধ্যাত্মিকতার রুপ-প্রকৃতি ও প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে ক্রিটিক্যাল আলোচনা হতে তো কোন সমস্যা নেই। কারণ, শুধুমাত্র আধ্যাত্মিকতার বিদ্যমানতাই যথেষ্ট নয়, বরং এর উপযোগিতার প্রশ্ন নিতান্ত জরুরি। সুতরাং, মার্কসের আধ্যাত্মিকতা নিয়ে আমরা নতুনভাবে আলোচনা তুলতে চাই ।

১টি মন্তব্য

  • লেখাটা পড়ে ভালো লাগল। তবে এরিখ ফ্রম তার উক্ত বইতে মার্ক সম্পর্কে যেসব ধারণা দিয়েছেন, তা যেকোন মার্কপাঠকের জন্য– ঝুনো হোক কি নবিন– একেবারেই আনুখা। তার সত্যতা নিয়েও সহজে প্রশ্ন তোলা সঙ্গত। মার্কসকে এরিখ ফ্রম যেখানে মসিহত্বের দরজায় নিয়ে ঠাঁই দিয়েছেন, সেখানে আপত্তি থাকাই স্বাভাবিক। ধন্যবাদ!

Leave a Reply