গাযালি ও হিউমের ‘কার্য-কারণ’ তত্ত্ব

অধিবিদ্যা ও প্রকৃতি বিজ্ঞানের উল্লেখযোগ্য একটি অধ্যায় জুড়ে আছে ‘কার্য-কারণ তত্ত্ব ‘। দুটি বস্তু বা ঘটনার মধ্যবর্তী অনিবার্য সম্পর্ককে কার্য-কারণ বলা হয়। দুটি ঘটনার যেটি পূর্বে সংগঠিত হয় তাকে কারণ বলে; আর এর প্রভাবে বা কারণে পরে যা প্রকাশিত হয়, তাকে বলে কার্য। এ তত্ত্বকে আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণের ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। অর্থাৎ, পৃথিবীর সকল কিছুই কোন না কোন বিষয়ের প্রভাবে সৃষ্ট আর সর্বপ্রথম বস্তু সৃষ্টি হয়েছে আল্লাহর প্রভাবে। আরবিতে কার্য-কারণ তত্ত্বকে বলা হয় কানুনুল ইল্লিয়া’

ইলমুল কালামের এমন একটা গ্রন্থ পাওয়া যাবে না, যাতে আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণের ক্ষেত্রে কার্য-কারণ তত্ত্বকে হাযির করা হয়নি। এ বিষয়টিকে কেন্দ্র করে ধর্মতত্ত্ববিদদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। কালক্রমে এ তত্ত্ব একটি স্বীকৃত বাস্তবতার মর্যাদা পেয়েছিল। তত্ত্বটি যেমন ধর্মতত্ত্বের ক্ষেত্রে স্বীকৃত, তেমনি প্রকৃতি বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও স্বীকৃত।

তবে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, উভয় শাস্ত্রে আমরা এমন কিছু পণ্ডিতের উপস্থিতি পাই, যারা কার্য-কারণ তত্ত্বকে অস্বীকার করেছেন। ধর্মতত্ত্বে ইমাম গাযালী, এবং প্রকৃতি বিজ্ঞানে হিউম। ডেকার্তে ও কান্ট সীমাবদ্ধ একটি ক্ষেত্রকে অস্বীকার করেছেন।

এক্ষেত্রে ইমাম গাযালীর বক্তব্য যদি পর্যালোচনা করি, দেখি, তিনি তাহাফুতুল ফালাসিফা’ গ্রন্থে লিখেছেন – সকল কার্য বা বস্তুর ঘটিত হবার পেছনে কারণ বা ইল্লত থাকা জরুরি নয়। বরং, কারণ ছাড়াও কার্যের বিদ্যমানতা স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে ইমাম গাযালী ইবরাহিম আ. এর অগ্নিকুন্ডে নিক্ষিপ্ত হওয়ার ঘটনাকে পেশ করেছেন। তিনি বলেন, কোন বস্তু দগ্ধ হবার ক্ষেত্রে আগুন কারণ হিসেবে ক্রিয়াশীল থাকে বলে আমাদের বিশ্বাস। অথচ, আগুনের বিদ্যমানতা সত্তেও ইবরাহিম আ. এর কোন রকম ক্ষতি হয়নি। সুতরাং, বুঝা যাচ্ছে, কোন বস্তু অস্তিত্বশীল হওয়ার পেছনে কারণের কোন প্রভাব নেই। বরং আল্লাহর ইচ্ছা ও ক্ষমতা মূল কারণ।

অন্যদিকে, হিউমকে পাঠ করলে দেখি, তিনি বলেছেন, ‘বস্তুতে বস্তুতে, ঘটনায় ঘটনায় আমরা কার্য-কারণের যে সম্পর্ক উদ্ধার করি, তা আমাদের কল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ । আমরা আগুন দেখি ধোঁয়া দেখি , কিন্তু আগুন ও ধোঁয়ার মাঝে কল্পিত সম্পর্ককে দেখি না । সুতরাং, তার অস্তিত্বও আমরা স্বীকার করতে পারবো না’।

কার্য-কারণ তত্ত্বের ক্ষেত্রে গাযালী ও হিউমের তুলনামূলক পাঠ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক । কারণ, কয়েকটি বিবেচনায় উভয়ের চিন্তার মধ্যে বিস্তর ফারাক বিদ্যমান –

১ . ইউরোপের বস্তুবাদী হিউমের ‘কার্য-কারণ তত্ত্ব’ অস্বীকারের মূলে নিহিত ছিল ‘অজ্ঞেয়বাদ’। অন্যদিকে, গাযালির অস্বীকারের পেছনে ছিল আল্লাহর অস্তিত্ব ও প্রভাবকে গভীরভাবে উত্থাপন করার প্রয়াস।

২ . হিউম ছিলেন দৃশ্যমান বিষয়ে বিশ্বাসী। চোখে যা দেখা যায় না, অভিজ্ঞতায় যা পাওয়া যায়না, তিনি তার বিদ্যমানতা অস্বীকার করতেন। সে হিসেবে তিনি কার্য-কারণ সম্পর্ককেও মেনে নেননি। পক্ষান্তরে, গাযালির প্রসঙ্গ ছিল ভিন্ন।

৩ . এক হিসেবে বলা যায় যে , ইমাম গাযালী কার্য-কারণ তত্ত্বের অনিবার্যতা মেনে নিয়েছেন। কারণ, তিনি প্রকৃতির সকল বস্তু ও ঘটনার ক্ষেত্রে আল্লাহর ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ দেখিয়েছেন। অন্যদিকে, হিউম আল্লাহর অস্তিত্ব-ই অস্বীকার করতো।

তবে গাযালি ও হিউমের মাঝে বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার বিশ্লেষণে কার্য-কারণ সম্পর্কের অ-বিদ্যমানতা ও এর অভ্যাসজনিত হওয়ার ব্যাপারটাতে উভয়ের মধ্যে সাযুজ্য আছে।

দর্শন ও অধিবিদ্যায় কার্য-কারণ তত্ত্বের অনিবার্যতাকে অস্বীকার করলে বহু বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। এজন্যেই ইবনে রুশদ বলেছেন, ‘ গাযালীর কার্য-কারণ সম্পর্ক মেনে নিলে জগতের যাবতীয় সৌন্দর্য ও নিয়মানুবর্তিতা থেকে পরম সুন্দর আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণ করা যায় না।’ ফলে, গাযালী ও হিউমের উত্তরকালে, কার্য-কারণ সম্পর্কিত বিষয়ে তাদের মতামত ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়নি – না ধর্মতত্ত্বে, না প্রকৃতি বিজ্ঞানে।

১টি মন্তব্য

Leave a Reply