কেমন ছিলেন মুহাম্মদ ইউসুফ মুসা?

(ইউসুফ কারযাভীর ‘ওদাউল আ’লাম’ গ্রন্থের ‘ইউসুফ মুসা’ শীর্ষক প্রবন্ধ থেকে অনূদিত।)

ড . মুহাম্মদ ইউসুফ মুসা। দর্শন ও নীতিশাস্ত্রের একজন পন্ডিত হিসেবে ‘উসুলে দ্বীন’ বিভাগে কর্মরত ছিলেন দীর্ঘকাল। আজহারের জ্ঞান-বলয়ে পড়াশোনা আরম্ভ করলেও, কালক্রমে তিনি বৈশ্বিক পরিমন্ডলে এসে হাজির হয়েছেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি ‘যাকাযিকের’ এক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপ্রাপ্ত হোন। কিন্তু, দৃষ্টি শক্তির স্বল্পতা তার অধ্যাপনার ক্ষেত্রে হন্তারক রুপে আবর্তিত হয়; তিনি অধ্যাপনার সমাপ্তি ঘটান। তার বহু সংকটের মূলে ছিল এই ‘দৃষ্টি শক্তির দূর্বলতা ‘।

পরবর্তীতে মুহাম্মদ মুস্তাফা মারাগীর অধ্যাপনার সময় যখন শেষ হলো, তখন তার স্থানে নিযুক্ত হন ইউসুফ মুসা। তিনি উসুলে দ্বীন বিভাগে যে ধারার অধ্যাপনা আরম্ভ করেন, তা ছিল আজহারের ইতিহাসে নতুন অভিজ্ঞতা। দর্শন ও নীতিশাস্ত্রে তিনি পদ্ধতিগত সৃজনশীলতা আনেন এবং বিভিন্ন জার্নালে লেখালেখি শুরু করেন। এছাড়াও প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাস বিষয়ক ফরাসি ভাষায় রচিত নানা গ্রন্থ তিনি আরবিতে অনুবাদ করেন।

ফ্রান্সে অবস্থান-কালে তার একটি চমকপ্রদ গল্প আছে –

তিনি বলেন : আমরা যে বাড়িতে ছিলাম , সেখানে আমাদের সেবা করতো একজন সম্ভ্রান্ত পরিবারের নারী। জীবিত থেকেও তার চাচা তার দেখাশোনা করতো না। এ নিয়ে অন্যরা আক্ষেপ করে বলতো :
‘তোমার এ ব্যাপারে আদালতে নালিশ করা উচিত। সে বললো, আমাদের এমন কোন আইন নাই , যা দিয়ে আবশ্যিক কোন ফায়দা হবে।’

তারা আমাকে প্রশ্ন করলো , ‘তোমাদের ধর্মে এমন কোন নীতি আছে ?’
আমি বললাম, ‘অবশ্যই! তাকে তার ভাতিজির প্রতিপালন করতে হবে এবং আদালতে তার পক্ষেই রায় হবে ।’
এ কথা শুনে মহিলা বলল, ‘হায়! আমাদের যদি এমন আইন থাকতো।’

আবুল হাসান আলী নদভী রহ. এর সাথে ইউসুফ মুসার সাক্ষাৎ হয়েছিল, ১৯৫১ সালের নভেম্বরে। তিনি তখন নদভী সাহেবের ‘মা যা খাছিরাল আলাম বি ইনহিতাতিল মুসলিমিন ‘ গ্রন্থের একটি ভূমিকাও লিখে দিয়েছিলেন ।

আজহারের দিনগুলোতে আমার স্বাধীন নির্বাচন ক্ষমতা ছিল দুটি বিষয়ে – এক. কুরআন-সুন্নাহ, দুই. আকিদা-দর্শন। প্রথম বিষয়ের অধ্যায়ন খুব সহজে ইসলামের জ্ঞানগত উৎসের উপর স্পষ্ট ধারণা দিবে। এছাড়াও কুরআন সুন্নাহর উপর গভীর গবেষণার সুযোগ হবে, এবং কুরআন সুন্নাহর উপর আরোপিত সংশয়ের উৎপাটন সম্ভব হবে। একজন মুসলিমের প্রকৃত জ্ঞানী (আলেম) হতে এদুটি শাস্ত্রে পারদর্শিতা ছাড়া গত্যন্তর নেই।

অন্যদিকে, আকিদা-দর্শন এবং এর আনুষঙ্গিক বিষয়- মানব চিন্তা , দর্শন ও চিন্তাগত মতভিন্নতার পূর্ণপাঠে মনোযোগী হওয়া, যুগের ভাষায় তার যথার্থ রূপায়ণ করা। এ দুটি ক্ষেত্রে আমার নির্বাচন স্থবির হয়ে ছিল, কোন সঠিক সিদ্ধান্তে পৌছাতে আমি বরাবর অক্ষম ছিলাম।

শেষে, আল্লাহর উপর ভরসা করে আমি ইউসুফ মুসার নিকট পৌঁছলাম। প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে তার সাথে আমার কোন সম্পর্ক না থাকলেও, সখ্যতা ছিল বেশ। আজহারে ভর্তি হওয়ার পূর্বেই তার শিক্ষকতার ইতি ঘটে, তবে বার কয়েক তার সাথে আমার দেখা হয়েছে, সফরে এবং একান্তে ।

পৃথিবীতে তার সংসার বলতে ছিল – পাঠাগার ও জ্ঞান। তিনি নিবিষ্ট ছিলেন ফিকহ ও শরিয়া অধ্যায়নে। দর্শনে তার প্রভাব ছিল ব্যাপক; তিনি ফ্রান্স থেকে দর্শন বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জন করেন। সুতরাং, আমাকে পরামর্শ দানে তিনি বেশী সক্ষম হবেন ভেবে তার কাছে যাই ।

দরজার কড়া নেড়ে বললাম, উস্তাদ! অ-সময়ে-ই চলে এলাম । তিনি বললেন, সু-সময় আর কি ? আমার দরজা তোমার জন্য উন্মুক্ত সবসময়ই ।

আমার যাবতীয় ভাবনা তার নিকট উত্থাপন করলে তিনি কালজয়ী এক ভাষণ দিলেন

‘কারযাভী শুনো , তুমি জানো, আমি আমার সুদীর্ঘ জীবনে দর্শন, দর্শনের ইতিহাস ও নীতিশাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করেছি, গ্রন্থও রচনা করেছি ; এর কয়েকটি তুমি সম্ভবত পড়ে থাকবে ।’

আমি বললাম, ‘জ্বী ! একাধিক পড়েছি।’

তিনি বললেন, ‘কালপ্রবাহে , আখেরে আমি শরিয়া অধ্যায়ন-অধ্যাপনাতে থিতু হয়েছি। এ বিষয়ে বেশ কিছু রচনাও আমার রয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ, এসব গ্রন্থ ব্যাপক গ্রহনযোগ্যতাও পেয়েছে।

আমি বললাম, ‘জ্বী! কিছু গ্রন্থ আমি পড়েছি , উপকৃত হয়েছি।’

ইউসুফ মুসা বললেন, ‘শেষপর্যন্ত বিশ্বাসের দৃঢ়তা নিয়ে আমি বলছি যে, দর্শন ও ইতিহাস বিষয়ক আমার সকল অধ্যায়ন ছিল ‘ইসলামী শরিয়া’ বিষয়ক অধ্যায়নের ভূমিকা বা সোপান । আর ‘শরিয়া’ মৌল ও উদ্দিষ্ট ছিল, অন্যসব ছিল এর সহায়ক বিষয়।’

তিনি আরো বললেন, ‘নিশ্চিত ভাবে আমি বলবো, ‘উসুলে দ্বীন’ বিভাগে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শন এবং ইসলামী দর্শনের প্রাচীন ও আধুনিক চিন্তাধারাগত যে জ্ঞান তুমি অর্জন করেছ , তার উপর নির্ভর করে তোমার জ্ঞান-বলয়ের যে জগত নির্মিত হয়েছে, তা দিয়ে তুমি ইসলামের সেবা যথেষ্ট করতে পারবে। এখন মৌলিক বিষয় হচ্ছে, শরিয়া ও কুরআন সুন্নাহর উপর গভীর অধ্যায়নের মধ্যে দিয়ে ইসলামের আবেদনকে বিস্তৃত করা। আর তোমার দ্বারা এটি সম্ভবও বটে। এবং আমি আশাবাদী, তোমার হাতে এ দ্বীনের ব্যাপক সংস্কার ও ইজতিহাদের কাজ হবে , ইনশাআল্লাহ ।’

ইউসুফ মুসার পক্ষ থেকে প্রদত্ত পরামর্শগুলো আমার জন্য ছিল ‘প্রজ্বলিত শিখা’ সদৃশ; আমার সকল দ্বিধা-দ্বৈরথ এর দ্বারা দূরীভূত হয়ে যায়। প্রসন্ন অন্তরে আমি তাকে বিদায় জানালাম, ততক্ষণে আমার পথ-পরিক্রমা স্পষ্ট করে নিলাম।

আমার প্রথম গ্রন্থ আল হালাল ওয়াল হারাম ফিল ইসলাম’ যখন প্রকাশিত হয়, তার নিকট যাই। একটা কপি তার হাতে তুলে দিলে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কেন তুমি এ গ্রন্থ রচনা করলে?’
আমি আমার দীর্ঘ কালের শ্রম, যা আজহারের দিনগুলোতে করেছি, সে কথা বললাম। তিনি বললেন, আশ্চর্য! এ বিষয়ে আমার বন্ধুদের একদল কাজ করতে আরম্ভ করলেও ঐ সীমা অতিক্রম করতে পারেনি, যা আল্লাহ তোমার দ্বারা সম্পন্ন করেছেন। আল্লাহ তোমার কাজে বরকত দিবেন।’

ড . মুহাম্মদ ইউসুফ মুসার রচনাবলী শরিয়া, নীতিশাস্ত্র, দর্শন ও ধর্মতত্ত্বের মাঝে বিস্তৃত ছিল। তার বেশ কিছু অনূদিত রচনাও রয়েছে। তার পি এইচ ডি গবেষণার চারটি গ্রন্থ ফরাসি লিখেছেন, যা পরবর্তীতে আরবিতে অনুবাদ হয়েছে ; নীতিশাস্ত্রের উপর – মাবাহেস ফি ফালসাফাতিল আখলাক’ , আল আখলাক ফিল ইসলাম’, ফালসাফাতুল আখলাক ফিল ইসলাম ওয়া সিলাতুহা বিল ফালাসিফাতিল ইগরিকিইয়া’, তারিখুল আখলাক’, ইত্যাদি গ্রন্থ তিনি রচনা করেছেন ।

দর্শন বিষয়ে তার গ্রন্থগুলির মধ্যে আছে – কুরআন ওয়াল ফালসাফা (কুরআন ও দর্শন ), বাইনাদ দ্বীন ওয়াল ফালসাফা ফি রা’য়ি ইবনে রুশদ (ইবনে রুশদের দৃষ্টিতে ধর্ম ও দর্শনের সম্পর্ক), ফালাসিফাতুল উসুরিল উসতা (মধ্যযুগীয় দর্শন ) , বাইনা রিজালিদ দ্বীন ওয়াল ফালসাফা ( আলেম ও দার্শনিক ) ইত্যাদি ।

শরিয়া বিষয়ে তার রচিত মৌলিক গ্রন্থগুলির মধ্যে আছে মাদখাল লি দিরাসাতিল ফিকহিল ইসলামী ( ফিকহে ইসলামী অধ্যায়নের ভূমিকা) , নিজামুল হুকমি ফিল ইসলাম ( ইসলামে রাষ্ট্রনীতি ) সহ আরো কিছু গ্রন্থ ।

জ্ঞান অর্জনে তার এতটাই নিবিষ্টতা ছিল যে, তিনি সংসার বাঁধেননি, সর্ব-অস্তিত্ত্ব বিলীন করেছেন সংস্কার ও সংশোধনের ময়দানে। তার অন্তরে যে সুবিশাল আকাঙ্ক্ষা লালিত ছিল, তা সংস্কার ও ইজতিহাদের আকাঙ্ক্ষা। এবং এ পথে যথেষ্ট ক্লেশ হয়েছিল তার, সংস্কার ধারার স্বাভাবিক রীতি অনুসারে।

তিনি ১৯৬৩ সালের ৮ আগষ্ট সকালে ইন্তেকাল করেন। সে-সময়ে তার বয়স ছিল ৬৪ বছর।

(সূত্র: আল-এত্তেহাদুল আলমী লি উলামা আল-মুসলিমিন)

Leave a Reply