একবিংশ শতাব্দির নতুন চাহিদায় দরকার নতুন সমন্নিত রাষ্ট্রনীতি

আমাদের নীতি কি হবে তা ঠিক হতে হবে আমার ভবিষ্যত পরিনতির আলোকে। নাইন ইলেভেন, অর্থনৈতিক মন্দা, করোনা বিপর্যয় এমন এক ভবিষ্যত বিশ্বব্যবস্থার দিকে ইংগিত করছে যা হবে বহুমেরু সম্পন্ন। উপরোক্ত ঘটনাগুলোর ফলে পশ্চিম কেন্দ্রিক রাজনৈতিক মুলনীতি এবং চিন্তাচেতনার মৃত্য ঘটে গিয়েছে। তাই এখন নতুন বিশ্বব্যবস্থায় আমাদের অস্তিত্ব ধরে রাখার জন্য সম্পুর্ন নতুন রাষ্ট্রনীতি তৈরি এবং ধারন করতে হবে। 

 

নতুন বিশ্বব্যবস্থায় নতুন শক্তির উথ্যান ঘটছে। এই উথ্যানের পেছনে রয়েছে প্রযুক্তির বিকেন্দ্রিকরন, পশ্চিমা চিন্তাধারার পতন, এবং ভু-রাজনৈতিক সংঘাত। এই সংঘাত সামনে আরো বাড়বে। যার কিছুটা আঁচ মায়ানমারে দেখা গিয়েছে। কোন দেশ যখন কোন পরাশক্তির খেলার মাঠে পরিনত হয় তখন সেই দেশ তার সার্বভৌমত্ম হারায়। তাই কোন একটি দেশের অধিনে যাওয়ার সুযোগ নেই। আবার একই সাথে দুই নৌকায় পা রেখে চলাও সম্ভব নয়। তাই বাঁচার একমাত্র উপায় নিজেদের শক্তি বাড়িয়ে চলা। আমাদের এখন বুঝতে হবে কি কারনে এতদিন বিশ্ব পশ্চিমের অধিনে ছিল। এর কারন তারা ছিল একক শক্তি। তারা কার্যকর সফটপাওয়ার এবং হার্ডপাওয়ার তৈরি করেছিল। যেকারনে কেউ তাদের সামনে টিকতে পারতোনা। ফলে তাদের বানানো নিয়ম বিশ্ব মানতে বাধ্য ছিল। কিন্তু এখন আর সেই পরিস্থিতি নেই। এখন আমাদের চিন্তা করতে হবে রাজা বাদশাদের আমলের মত যখন এক রাজ্য আরেক রাজ্যকে দখল করে নিত। আমাদের শক্তি আমাদের ভাগ্য ঠিক করবে। 

 

একটা সাম্রাজ্যকে পরাজিত করতে করতেই নতুন সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে। ডাকাত দল আক্রমন করলে রাস্তা একটাই। তাহলো তাদের প্রতিহত করা। তা নাহলে নিজের পরিবারের ভাগ্য ডাকাতদের দয়ায় ছেড়ে দিতে হয়। তাই পরাশক্তিদের খেলা থেকে বাঁচার একমাত্র রাস্তা হলো নিজেদেরকেই পরাশক্তিতে রুপান্তরিত করা। 

 

নতুন পরিস্থিতি অনেক দেশকে নতুন সম্পর্ক গড়ার জন্য বাধ্য করছে। একই সাথে পুরাতন মিত্রদের সাথেও সম্পর্ক রক্ষা করে চলতে হচ্ছে। আমাদের রাষ্ট্রনীতিকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে গেলে এই বৈশ্বিক চাহিদার কথা মাথায় রাখতে হবে। এই চাহিদা আমাদের জন্য শক্তি বাড়ানোর সোপান। এই শক্তি বাড়ানোর ক্ষেত্রে যদি পশ্চিমা বা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক তত্বগুলোকে মাথায় রেখে কাজ করি তাহলে ভুল হবে। পশ্চিমের তত্বগুলোর মধ্যে একটি হলো যখন দুই দেশের মধ্যে স্বার্থ মিলে যায় তখন দুই দেশের মধ্যে স্বার্থগত সম্পর্ক তৈরি হয়। এই নীতি পৃথিবী জুড়ে স্বীকৃত। কিন্তু এই নীতির ফলে বহুদেশ পুড়ে গেছে। পাকিস্তান আমেরিকার স্বার্থ যখন এক ছিল তখন দুই দেশ একসাথে কাজ করেছিল। কিন্তু যখন স্বার্থ যখন আলাদা হয়ে যায় পাকিস্তানকে তখন ভুগতে হয়। আফগানদের অস্ত্র ও ট্রেনিং পাকিস্তান দিলেও পরে আমেরিকার মিত্র পরিবর্তনের ফলে এদের মধ্যে থাকা চরেরা পাকিস্তানের বারোটা বাজিয়ে দেয়। ভিয়েতনামে মার্কিনপন্থিদের কচুকাটা করা হয়। ফলে দেখা যাচ্ছে এই ক্ষনস্থায়ী বন্ধুত্বের নীতি বাস্তবে মানবজাতির জন্য ভয়ংকর ক্ষতিকর। পশ্চিমের আদর্শ বাস্তবে খুবই বাজে পরিনতি ডেকে আনছে।

 

আমি রাষ্ট্রনীতি বলতে বুঝাচ্ছি রাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্রনীতি, পররাষ্ট্রনীতি অর্থনীতি সহ সমস্ত নীতির সুসমন্নিত সামষ্টিক নীতিমালা। আমাদের ভবিষ্যতকে নিছক স্বার্থগত  রাজনীতি, বা আদর্শিক নীতির আলোকে দেখা ভুল হবে। সবার আগে বুঝতে হবে আমাদের কোথায় কোথায় প্রভাব বিস্তার করতে হবে এবং কোন পন্থায় প্রভাব বিস্তার করতে হবে। যৌক্তিক এবং গ্রহনযোগ্য আত্মপরিচয় এবং সাম্প্রতিক সম্পর্ক আমাদের মুল চালিকা শক্তি। আমাদের পাকিস্তান, ও দক্ষিন এশিয়া, আফ্রিকা সবজায়গায় পা রাখতে হবে। পুরাতন মিত্রদের সাথে সম্পর্ক ধরে রাখতে হবে এবং নতুন মিত্র তৈরী করতে হবে। একই সাথে মিত্রদের শক্তি বাড়াতে সাহায্য করতে হবে। আমাদের কথা যদি স্বার্থের  সাথে সাথে পাল্টে যায় তাহলে সেটা আমাদের বিশ্বাসযোগ্যতাকে হুমকির মুখে ফেলবে এবং মিত্ররা আমাদের উপর বিশ্বাস হারাবে। তাই আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হতে হবে অত্যন্ত ধারাবাহিক এবং বাস্তবমুখী। পশ্চিমের সাথে সম্পর্ক হবে স্বার্থভিত্তিক কিন্তু নতুন অঞ্চলে আমাদের প্রভাব বাড়াতে ভাতৃত্বের বিষয়টি সামনে আনতে হবে। আমাদের ইতিহাস হতে পারে আমাদের মূল শক্তি। আমাদের ভূখণ্ডকে আফ্রিকান, আফগান, তুর্কি, পারস্যের লোকেরা শাসন করেছে এবং সে সময় আমরা সবচেয়ে শক্তিশালী ছিলাম। এর কারণ এখানে বহুমুখী মেধার এক সমন্বয় হয়েছিল। এই বিষয়টি আমাদের গ্রহণ করতে হবে। আমাদের জাতিকে এমন মানসিকতা সম্পন্ন হতে হবে যার ফলে তারা মেধাবীদের আপন করে নেয়। সেধরণের প্রচারণা এবং কর্মযজ্ঞ চালাতে হবে। জাতিসংঘের মাধ্যমে আফ্রিকায় আমাদের একটা অবস্থান তৈরী হয়েছে। সেটাকে কাজে লাগিয়ে আফ্রিকায় শক্তি বাড়াতে হবে। 

একটি নতুন বাংলাদেশ তৈরী করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। এই আলোচনা একটি সূচনা হতে পারে । তবে আরো ব্যাপক আলোচনা করতে হবে। নতুন বাংলাদেশ তৈরী করতে বাইরের এবং অভ্যন্তরীণ বাধাকে সক্ষম এবং সফলভাবে মোকাবেলা করতে হবে। আমাদের অস্তিত্ব শক্তিশালী বাংলাদেশের উপর নির্ভর করছে। এই বিষয়ে কোন ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই। 

 

Leave a Reply