কিভাবে মানুষের মনকে প্রভাবিত করা যায়?

মানুষের মন সার্বিকভাবে পরিণতিবোধ এবং আকাঙ্খা দ্বারা পরিচালিত হয়। আর পরিণতি বোধ তৈরী হয় পরিবেশ দ্বারা। যতবেশি উদাহরণ মানুষের সামনে আসে তারা ততবেশি পরিণতিবোধসম্পন্ন হয়ে থাকে। এই কারণে এখানে ন্যায় অন্যায় অনেক সময় গৌণ হয়ে যায়। মানুষ যখন ভীত হয়ে পড়ে তখন সে এমন কাজ করে যা অন্যের কাছে ঘৃণিত বা ছোটলোকি হিসেবে বিবেচিত হয়। আবার এমন অনেক কিছু করে যা সেই সময় মানুষের কাছে বোকামি হিসেবে কিন্তু পরবর্তীদের কাছে বীরত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়। এখানে মানুষের কাজ এবং মূল্যায়নের ভিন্নতা আসে পরিণতিবোধের ভিন্ন রূপের কারণে। 

মানুষের পরিণতিবোধ মূলত পরিচালিত হয় মৌল বিশ্বাস এবং সীমাবদ্ধতার আলোকে। আর আকাঙ্খা মূলত পরিচালিত হয় অনুভূতির আলোকে। মৌল বিশ্বাস হলো মানুষের অভিজ্ঞতালব্ধ মূলনীতি যা কোন যুক্তির আলোকে আসেনা। সে যা চোখে দেখেছে, যা কানে শুনেছে, যা স্পর্শে বুঝেছে তার আলোকেই এই বিশ্বাস আসে। পরোপকারী মানুষের মৌল বিশ্বাস হলো যদি সে অন্যকে দেখে রাখে তাহলে তাকেও মানুষ দেখে রাখবে। স্বার্থপর মানুষ বিশ্বাস করে নিজে বাঁচলে বাপের নাম।

এর কারণ হলো উভয় এমন উদাহরণ তৈরী করেছে অথবা এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছে যে তারা পরোপকার বা স্বার্থপরতাকে তাদের জন্য কল্যাণকর মনে করছে। তাদের মধ্যে পরিবর্তন আনতে গেলে সবার আগে তাদেরকে উদাহরণ দেখাতে হবে। কারণ চোখের সামনে যা ঘটে তা মানুষের মাঝে বিশ্বাস সৃষ্টি করে। মানুষের বিশ্বাস পরিবর্তন না হলে নীতির পরিবর্তন হয়না, অনুভূতির পরিবর্তন হয়না। 

মাঝে মাঝে অনুভূতি এতটাই শক্তিশালী একটি পক্ষ হয়ে উঠে যে সেটা মানুষের বিশ্বাসকে পাল্টে দেয়। মানুষের অনুভূতি যখন ক্রমাগতভাবে মানুষের মনে আঘাত করতে থাকে তখন তা ক্রমেই বিশ্বাসকে নড়বড়ে করে দেয়। ইউরোপে সেকুলারিজমের উত্থান সেটাই নির্দেশ করে। 

অনুভূতি বিষয় এবং বস্তুভেদে ভিন্ন হয়। এবং সেটা নির্ধারণ হয় মৌল বিশ্বাসের আলোকে। মৌল বিশ্বাস এই সীমারেখা ঠিক করে দেয়। যেমন: একশ্রেণীর মানুষ চোরকে গণধোলাই দিলে আনন্দ পায় আরেক শ্রেণীর মানুষ তা দেখে কষ্ট পায়। কিন্তু একজন নিরপরাধ মানুষকে মারধর করলে সুস্থ মস্তিষ্কের যেকোনো মানুষ কষ্ট পায়। একপক্ষ বিশ্বাস করে যে চোরকে গণধোলাই দেয়া ঠিক। এখানে তাদের অনুভূতি ধনাত্মক। আরেক শ্রেণীর মানুষ এই বিষয়টা সহ্য করতে পারেনা। এখানে তাদের অনুভূতি ঋণাত্মক। 

মানুষের অনুভূতি নির্ভর করে পরিবেশ, শিক্ষা, সামাজিক মস্তিষ্ক ইত্যাদির উপর। সামাজিক মস্তিস্ক বলতে আমি সমাজে বিদ্যমান একটি শক্তিশালী চিন্তাধারাকে বুঝিয়েছি যাকে মানুষ তার সামাজিক নিরাপত্তার একটি রক্ষাকবজ হিসেবে দেখে থাকে। এটা হচ্ছে সেই সব বৈশিষ্ঠের সমষ্টি যার আলোকে সমাজ একজন মানুষকে ভালো বা মন্দ হিসেবে বিবেচনা করে। 

সমাজে কোন নতুন চিন্তাধারার প্রবেশ ঘটাতে হলে আগে একটি সুযোগ তৈরী করতে হয়। তার জন্য একটি গোষ্ঠীর মনের মধ্যে থাকা অভাববোধ থাকতে হয় অথবা তৈরী করতে হয়। সেই চিন্তাধারার একটি সহজ পরিষ্কার বার্তা থাকতে হয়। সেই চিন্তাধারা মানুষকে তার নিজের বোধগম্য শব্দ ব্যবহার করে বুঝতে হয়। যেমন: কোরোনার সময় তিন ফুট দূরত্বর কথা বলা হলো। কিন্তু খেটে খাওয়া মানুষ ফুট বুঝেনা। তারা বুঝে হাত। তাই বলা উচিত ছিল কত হাত দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।

এরপর সেই বার্তাকে সঠিক সময়ে ক্রমাগতভাবে মানুষের কানে পৌঁছে দিতে হবে, চোখের সামনে ভাসিয়ে আনতে হবে। এবং এমন সেলিব্রেটিদের ব্যবহার করতে হবে যার নাম শুনলে মানুষ যা মনে করে সেটা নতুন চিন্তাধারার সাথে যায়। যেমন: ক্লিয়ার শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপনে বলা হতো “I have nothing to hide” । দেখানো হতো ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে। যার উপর সবসময় ক্যামেরা ফোকাস করানো হয়। সেখানে কি জিদান বা টাক মাথার কোন ফুটবলারকে আনা হলে কাজ হতো? কারণ সেলিব্রেটিদের দেখলে আমজনতা তাড়াতাড়ি বিশ্বাস করে। কিন্তু এই জন্য তার ব্যক্তিগত বৈশিষ্টের সাথে নতুন চিন্তাধারার মিল থাকতে হবে। 

ইউনিলিভার সহ সব এফএমসিজি পণ্য নিয়ে ব্যবসা করা সফল প্রতিষ্ঠান কয়েক মাস ধরে প্রচুর টাকা খরচ করে শুধুমাত্র নিজের একটা ক্যারেক্টার দাঁড় করানোর জন্য এবং তার ব্রান্ডের নাম মানুষের মাথায় গেথে দেয়ার জন্য। যেন মানুষ যখন এই কাজ করতে যাবে প্রথমে তার ব্রান্ডের নাম মাথায় আসে।

বহু নামকরা ব্র্যান্ড ধ্বংস হয়ে গিয়েছে একবার ব্র্যান্ড ক্যারেক্টার তৈরী করে ফেলার পর তা পাল্টে ফেলার কারণে। একজন খারাপ লোক কাউকে সালাম দিলে মানুষের মনে সন্দেহ হয় যে নিশ্চয় তার কোন কুমতলব আছে। আবার কোন ভালো মানুষ খারাপ কোন কাজ করলে মানুষ সেটা সহজে মেনে নিতে পারেনা। 

মানুষ বিশ্বাস করে উদাহরণ দেখে। তাই বাস্তব উদাহরণ তৈরী করতে হবে। এই কারণে মানুষকে জড়িত করতে হবে। ইকমার্সের মার্কেট শেয়ার দিনে দিনে বেড়ে চলেছে। এটা মানুষের মাঝে বিশ্বাস সৃষ্টি করে। নতুন চিন্তাচেতনাকে গ্রহণ করানোর উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে। 

নতুন চিন্তাচেতনাকে গ্রহণ করা যে মানুষের জন্য মঙ্গলজনক তা প্রতিনিয়ত প্রমান করে যেতে হবে এবং তা প্রচার করে চলতে হবে। যেমন: মোবাইল ব্যাঙ্কিং ব্যবহার করে মানুষ দরকারি সময়ে অনেক দূর থেকে টাকা পাঠিয়ে জীবন রক্ষা করতে পেরেছে। এই প্রযুক্তি মানুষের কল্যানে নিবেদিত এই বিষয়টা প্রমান করা সম্ভব হয়। তখন এটার সাথে আবেগ জড়িয়ে যায়। ফলে এমন এক শ্রেণী তৈরী হয় যারা সেই চিন্তা বা সেই প্রতিষ্ঠানকে কখনোই ছেড়ে যায়না। 

নতুন চিন্তাধারাকে সব সময় আলোচনায় ইতিবাচকভাবে রাখতে হয়। তখন মানুষ এই নতুন চিন্তাধারা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করে। তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত ইতিবাচক না হলেও ধাপে ধাপে মানুষ সেই চিন্তাধারার সাথে জড়িয়ে পরে। এইজন্য নতুন নতুন কাজে জড়িয়ে আলোচনায় থাকতে হয়। কারণ মানুষ যতবেশি সেই নতুন চিন্তা চেতনা নিয়ে আলোচনা করবে তত ভালোভাবে মানুষের মনে গেথে যাওয়া সম্ভব। 

নতুন চিন্তাধারাকে সঠিক ভাবে, সঠিক সময়ে আলোচনায় আনতে হয়। কোন সময়ে আলোচনায় আনা গুরুত্বপূর্ণ তা বিচার বিশ্লেষণ করে ঠিক করতে হবে। কারণ মানুষ হাজারটা কাজে জড়িত থাকে। আপনার প্রচারণা এমন হওয়া উচিত যাতে সেটা দৃষ্টিগোচর হয় এবং সেই সময় দর্শকশ্রোতার মন ইতিবাচক থাকে। তা নাহলে ফলাফল খুবই নেতিবাচক হতে পারে। 

উপরের আলোচনায় আমি বলতে চেয়েছি কিভাবে মানুষের মনকে প্রভাবিত করা যায়। বাস্তব দুনিয়ায় মানুষের মনকে প্রভাবিত করার বহুল ব্যবহৃত বিভিন্ন কলাকৌশলএবং নিজের জীবনে বিভিন্ন অভিজ্ঞতার আলোকে মানুষের মনকে প্রভাবিত করার একটি প্রক্রিয়া এখানে দেখিয়েছি। এই বিষয়ে আরো ব্যাপক আলোচনা হবে এবং এই আলোচনা কখনো শেষ হবেনা। কারন মানুষের মন দুনিয়ার সবচেয়ে জটিল বিষয়। উপরের আলোচনা সূচনা হতে পারে কিন্তু কোনোভাবেই শেষ কথা নয়।

Leave a Reply