সৈয়দ জামাল উদ্দীন আফগানী

এক

এক শতাব্দীর বেশি সময় অতিক্রান্ত হলাে সৈয়দ জামাল উদ্দীন আফগানী আমাদের ভিতর থেকে বিদায় নিয়েছেন। এ দীর্ঘ সময়ে পৃথিবী নামক গ্রহে নানা উত্থান-পতন, ধ্বংস, বিপর্যয় ও সৃষ্টির ঘটনা ঘটেছে। আমরা প্রত্যক্ষ করেছি মারণাস্ত্র ও যুদ্ধের বিভীষিকা, এক পরাশক্তির তিরােভাবে অন্য পরাশক্তির উত্থান, রাষ্ট্রীয় সীমানার পুনর্বিন্যাস, বিজ্ঞানের অসাধারণ সৃষ্টিশীলতার সাথে এক অনন্য ধ্বংসকামী ক্ষমতা এবং একই সাথে মানবতার পারস্পরিক শত্রুতা ও নিষ্ঠুরতার মধ্যেও এক সর্বমানবিকতার কল্যাণবােধে উজ্জীবিত হওয়ার গভীর আকুতি। এই রূপান্তর ও পরিবর্তনের দিগন্তপ্লাবী স্রোতের মুখে আফগানীর বাণী ও বিশ্বাসের মূল্য আজও এতটুকু কমেনি বরং একালের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষিতে তা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আফগানী এখন ইস্তাম্বুলের এক নিভৃত ও অবহেলিত কবরগাহে চিরনিদ্রায় শায়িত। কিন্তু তার প্রিয় আফগানিস্তানের মানচিত্র আজ ক্ষতবিক্ষত, রক্তাক্ত। মুসলিম উম্মাহ যার ঐক্য ও সমৃদ্ধি কামনায় তিনি জীবনমান ছুটে বেড়িয়েছেন দেশ থেকে দেশান্তরে, তাকে আজ খামচে ধরেছে হতাশা, অবিশ্বাস, অনৈক্য আর সাম্রাজ্যবাদী শকুন। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় মুসলিম দেশগুলাের যে দিকবিদিশাহীন অবস্থা দেখে গিয়েছিলেন তার তুলনায় বর্তমানের চিত্রকে খুব কি ভিন্ন রকম বলা যাবে? উনবিংশ শতাব্দীতে সৈয়দ জামাল উদ্দীন আফগানীর মত ইউরােপীয় সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আর কেউ এত তীব্রভাবে প্রতিবাদ জানাননি। কিন্তু আজকে মুসলিম উম্মাহর পক্ষ থেকে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সেই ধ্বনিটুকুও নিস্তন্ধ হয়ে গেছে। এই নীরবতা ও মুসলিম উম্মাহর মরণ ঘুমের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আফগানীর কণ্ঠস্বর আরও তীব্রভাবে শুনতে পাচ্ছি।

সৈয়দ জামাল উদ্দীন আফগানী প্যান ইসলামিজমের মন্ত্রগুরু হিসেবে গণবন্দিত হয়েছেন। আরাে বিশেষ করে বললে একালে বিশ্বব্যাপী মুসলিম পুনর্জাগরণের যে ঢেউ উথিত হয়েছে তার অন্যতম বীজ রােপণকারী হিসেবে তাঁর নাম শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয়। তিনিই প্রথমবারের মতাে এশিয়া-আফ্রিকার মজলুম জনসাধারণকে ইউরােপীয় সাম্রাজ্যবাদের বিপদাশংকা সম্বন্ধে সতর্ক করেন এবং এর প্রতিরােধের জন্য সকলের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রয়ােজনীয়তার কথাও গভীরভাবে উল্লেখ করেন। আল্লামা ইকবাল সৈয়দ জামাল উদ্দীন আফগানীকে আধুনিককালের ‘মুজাদ্দিদ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন তাঁর মতাে আর কেউ একালে ইসলামের আত্মাকে এতাে গভীরভাবে নাড়া দিতে পারেননি।

জীবদ্দশায় তিনি উল্কার মতাে মুসলিম দেশগুলাে চষে বেড়িয়েছেন। নানা দেশ পরিব্রাজনায় তিনি বুঝতে পেরেছিলেন মুসলমানদের সত্যিকারের দুর্বলতাগুলাে কোথায় এবং কিভাবে পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদ সেই দুর্বল জায়গাগুলাে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদ বিশেষত বৃটেন তার সাম্রাজ্যবাদবিরােধী ভূমিকা ও মুসলিম ঐক্যের পক্ষে তার অভাবিত কর্মসূচীর মুখে আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিল। একই ভাবে মুসলিম দেশসমূহের একনায়ক ও স্বৈরাচারী সুলতান ও রাজন্যবর্গের মুসলিম স্বার্থবিরােধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে তাঁর সাহসী ভূমিকায় তারা উৎকন্ঠিত হয়ে ওঠে। আফগানী যথার্থ বুঝেছিলেন সাম্রাজ্যবাদের মােকাবিলায় মুসলিম ঐক্যের চেয়ে বড় কোন অস্ত্র নেই; তাছাড়া সাম্রাজ্যবাদকে প্রকৃত অর্থেই রুখতে হলে মুসলমানদের চাই আধুনিক জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে করায়ত্ত করা। মুসলিম উম্মাহর শরীরে অনৈক্য ও জড়তার যে ব্যাধি বাসা বেঁধেছে তার প্রতিকারে আফগানীর এই মহৌষধের কোন বিকল্প আছে কি?

 

দুই

সৈয়দ জামাল উদ্দীন আফগানী উনিশ শতকের সন্তান। এ শতকেই ইউরােপীয় সাম্রাজ্যবাদ প্রবল গতি ও নিষ্ঠুরতার সাথে মুসলিম ভূখন্ডগুলােতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। একটির পর একটি মুসলিম রাষ্ট্র ইউরােপীয় শক্তির সামনে অবনত হয়। এদের কাছে সেদিন মুসলমানদের শুধু সামরিক পরাজয়ই ঘটে না, এক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বশ্যতার মধ্যেও তারা ডুবে যায়। মুসলমানদের এই নিমজ্জমান প্রক্রিয়াটি আফগানীর চোখের সামনেই ঘটে এবং তার মনােজগতে যে প্রতিক্রিয়ার জন্ম হয় তা তাঁর চিন্তাভাবনা ও ব্যক্তিত্বের সংগঠনে বড় ভূমিকা পালন করে। এ কারণেই উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে মুসলিম ভুখণ্ডগুলােতে আপতিত ইউরােপীয় সাম্রাজ্যবাদের জুলুম ও অপচারের বিরুদ্ধে তিনি হয়ে ওঠেন প্রতিবাদের প্রতীক। অসাধারণ বাগ্মিতা, দূরদৃষ্টি ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের জোরে তিনি তার প্রতিবাদের ভাষা আরাে জ্বালাময়ী করে তােলেন। যেখানেই তিনি যান সেখানেই তিনি জাগরণের ঢেউ তােলেন এবং একটি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ভক্ত ও কর্মীবাহিনী গড়ে তােলেন। তার প্যান ইসলামিজমের লক্ষ্য ছিল মুসলিম দুনিয়াকে এক ঐক্যসূত্রে গ্রথিত করা এবং মুসলিম ভূখন্ডগুলােকে পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদীদের অধীনতা পাশ থেকে মুক্ত করা। আফগানী চেয়েছিলেন ইসলামী আদর্শের আলােয় মুসলমানরা পুনরুজ্জীবিত হােক। একই কারণে তিনি মুসলিম ঐক্যের স্বপক্ষে এক প্রবল জনমত গড়ে তােলেন।

আফগানীর জন্ম আফগানিস্তানে না ইরানে এ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিস্তর মতান্তর রয়েছে। তবে প্রচলিত মতটি হলাে তিনি কাবুলের নিকটবর্তী আসাদাবাদে ১৮৩৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং জীবদ্দশায় তার নামের সাথে আফগানী লকবটি এমনভাবে অপরিহার্য করে নেন যা তার জন্মভূমি আফগানিস্তানেরই ইংগিত দেয়। আফগানীর প্রথম জীবন সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না যদিও তার জীবনীকাররা জানিয়েছেন আফগানিস্তান ও ইরানের বিভিন্ন জায়গায় তিনি অধ্যয়ন করেন। চার্লস এডামস তার ‘Islam and Modernism in Egypt’ গ্রন্থে আফগানীর প্রথম জীবন সম্পর্কে যে বর্ণনা দিয়েছেন তা এখানে উদ্ধৃত করছি:

‘By the time he was eighteen he had studied practically the whole range of Muslim sciences and acquired a remarkable familiarity with Arabic grammar, philosophy and rhetoric in all branches, Muslim history, Muslim theology, sufism, logic, philosophy, physics, metaphysics, mathematics, astronomy, medicine, anatomy and various other subjects.'[১]

আঠার বছর বয়সে তিনি ভারতে আসেন, এখানে দেড় বছর অবস্থান করেন এবং ইংরেজিতে কিছু দক্ষতা অর্জন করেন। ভারতে অবস্থানকালেই তার মুসলিম ও ইসলাম চিন্তার স্বরূপটি বিকাশমান হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের অধ্যাপক Nikki R. Keddie আমাদের জানিয়েছেন ১৮৫৭ সালে ভারতে সিপাহী বিপ্লবােত্তর পরিস্থিতিতে মুসলমানরা যে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক লাঞ্ছনা ও দুর্ভোগের শিকার হয় তা আফগানীকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তােলে। তিনি আরাে উল্লেখ করেছেন ভারতে সৈয়দ আহমদ ব্রেলভীর বৈপ্লবিক কার্যক্রম ও চিন্তাভাবনা আফগানীকে প্রভাবিত করে এবং পাশ্চাত্যবিমুখ করে তােলে, একই সাথে সমসাময়িক ইসলামের সমস্যাগুলােকে বাস্তবতার সাথে বিশ্লেষণ করতে তাঁকে উদ্বুদ্ধ করে। [২]

এরপর তিনি আফগানিস্তানে প্রত্যাবর্তন করেন ও অনেক জীবনীকারের মতে আফগান আমীর দোস্ত মােহাম্মদের মন্ত্রী হিসেবে যােগ দেন। বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায় মন্ত্রী হিসেবে তিনি আমীরকে আফগানিস্তানের সংস্কার ও আধুনিকায়নের জন্য নানা পরামর্শ দেন। আমীরের ইন্তেকালের পর তার পুত্রদ্বয়ের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয় এবং সে দ্বন্দ্বে তিনি অধিকতর যােগ্য ও ব্রিটিশবিরােধী আযম খানকে সমর্থন দেন। কিন্তু যুদ্ধে ব্রিটিশ অনুরাগী শের আলী খানের কাছে ভাই আযম খানের পরাজয় ঘটে, সেই সাথে আফগানীরও ভাগ্যবিপর্যয় হয়। তিনি আফগানিস্তান পরিত্যাগ করেন এবং ভারত হয়ে কায়রাে পৌঁছেন। সেখানে স্বল্পকালের জন্য অবস্থান করে তিনি ইস্তাম্বুল এসে হাজির হন। ব্রিটিশ গােয়েন্দা রিপাের্ট থেকে যতদূর জানা যায় আফগানিস্তানে অবস্থানকালে আফগানী আমীরকে রাশিয়ার সাথে মিত্রতা স্থাপন করে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে পরামর্শ দেন। তাঁর মন্তব্যসমূহ যা গােয়েন্দারা উদ্ধৃত করেছে তার সুর রীতিমত ব্রিটিশবিরােধী, যা তাকে আমৃত্যু অনন্য বিশিষ্টতা দিয়েছে।[৩] এইভাবে আফগানী ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চে ধর্মীয় নেতা বা সংস্কারক হিসেবে নয়, একজন নিখাদ সাম্রাজ্যবাদবিরােধী রাজনীতিবিদ হিসেবে আবির্ভূত হন।

ইস্তাম্বুলে সুলতান আবদুল হামিদ কর্তৃক তিনি বন্দিত হন, তুরস্কের বুদ্ধিজীবী ও আলেমরা একযােগে তাকে খােশ আমদেদ জানান। কিন্তু আফগানীর অদম্য উৎসাহ, সাহস, অনমনীয় বিশ্বাস ও উদ্দেশ্যের প্রতি সমর্পিত চিত্ততা খুব শীঘ্রই শেখ উল ইসলাম ও তার অন্ধ স্তাবকদের প্রতিহিংসাপরায়ণ করে তােলে। আফগানীর জীবনীকাররা লিখেছেন প্রশাসনিক শৃঙ্খলার স্বার্থে সুলতান তাঁকে তুরস্ক ত্যাগের নির্দেশ দেন। বিতাড়িত আফগানী এবার কায়রো উপস্থিত হন। এখানে মিসর সরকার তাকে সামান্য বৃত্তি মঞ্জুর করে। অতঃপর তিনি এখানেই থাকবার সিদ্ধান্ত নেন ও সাম্রাজ্যবাদ আক্রান্ত ধ্বংসােন্মুখ মিসরের ত্রাণকর্তা রূপে অনতিকালের মধ্যে আবির্ভূত হন। মিসরে তাকে কেন্দ্র করে একদল আলােকপ্রাপ্ত ছাত্র একত্রিত হয়, তিনি তাদেরকে তার বিশিষ্ট চিন্তাভাবনায় প্রবুদ্ধ করে তােলেন। অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদীদের কুচক্র ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে তিনি মিসরবাসীকে জাগিয়ে তােলেন। তিনি ঘােষণা দেন: মেসর লেল মেসরিয়িন, ওয়ামা সাহামা ফিহা লেল ওবরেয়িন – মিসরবাসীর জন্য মিসর, ইউরােপীয়দের তাতে কোন অংশ নেই। একটানা আট বছর বক্তৃতা দিয়ে, লেখালেখি করে, সর্বোপরি রাজনীতিতে অংশ নিয়ে মিসরবাসীর মধ্যে তিনি গণজাগরণ ও গণআন্দোলনের সৃষ্টি করেন যাতে সাম্রাজ্যবাদের ক্রীড়নক সরকার ভীত হয়ে পড়ে এবং অবশেষে তাকে ১৮৭৯ সালে মিসর থেকে বহিষ্কার করে। মিসরে আফগানীর সাম্রাজ্যবাদবিরােধী আন্দোলনে তাঁর যােগ্য শিষ্য-সহচর ছিলেন মুফতি আবদুহু।

মিসর থেকে তাড়া খেয়ে আফগানী ভারতের হায়দারাবাদে আসেন। এখানে বসেই তিনি তার বিখ্যাত পুস্তিকা ‘Refutation of the Materialists’ রচনা করেন। এ পুস্তিকায় তিনি ভারতের মুসলিম নেতা স্যার সৈয়দ আহমদ খানের ইংরেজের সাথে সহযােগিতার নীতির তীব্র সমালােচনা করেন। ১৮৮২ সালে ভারত অবস্থানকালে মিসরে কর্নেল আরাবীর নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু হয়, যার সূচনা আফগানী নিজেই করে এসেছিলেন। কর্নেল আরাবীর বিদ্রোহের সময় ব্রিটিশ সরকার তাঁকে কলকাতায় অন্তরীণ করে রাখে। বিদ্রোহ শেষে তিনি ভারত ত্যাগ করেন ও লন্ডন হয়ে প্যারিসে পৌঁছেন। এখানে তিনি তিন বছর অবস্থান করেন এবং মুসলিম দুনিয়ায় সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করেন। তার সাথে এসে যুক্ত হন পুরনাে শিষ্য মুফতি আবদুহু, যিনি ইতিমধ্যে কর্নেল আরাবীর বিদ্রোহের সাথে সম্পৃক্ততার অভিযােগে মিসর থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। গুরু-শিষ্য মিলে এবার তারা বের করেন বিখ্যাত আরবী পত্রিকা আল উরওয়াতুল উসকা’ বা দৃঢ় রজ্জু। আফগানী এ পত্রিকার মাধ্যমে মুসলিম ভূখণ্ডগুলােতে পাশ্চাত্যের আগ্রাসী ভূমিকার বিরুদ্ধে মুসলমানদের জাগিয়ে তােলার পাশাপাশি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। স্বল্প-স্থায়ী হলেও এ পত্রিকা বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে ও সাম্রাজ্যবাদবিরােধী আন্দোলনে এক নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। আল উরওয়াতুল উসকা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আফগানী মস্কো আসেন ও সেন্ট পিটার্সবার্গে চার বছর অবস্থান করেন। তার জীবনীকাররা লিখেছেন এখানে তিনি রাশিয়ার নেতৃবৃন্দকে বৃটেনের বিরুদ্ধে অভিযান চালানাের পরামর্শ দেন, কিন্তু সে আবেদনে রাশিয়ার নেতৃবৃন্দ তেমন সাড়া দেননি। এখানে বসেই তিনি ইরানের বাদশাহ নাসিরুদ্দীন শাহর আমন্ত্রণ পান। কিন্তু আফগানীর জীবনে ইরানেও একই ঘটনা ঘটেছিল। শাহের কুশাসন ও সাম্রাজ্যবাদীদের শাহ কর্তৃক অন্যায় সুযােগ-সুবিধা প্রদানের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে তিনি তার রােষের শিকার হন এবং আবার বহিষ্কৃত হন। মিসরের মতাে ইরানেও শাহের নতজানু নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদী আন্দোলন গড়ে ওঠে যা ইতিহাসে ‘তামাক বিদ্রোহ’ হিসেবে খ্যাত। এ বিদ্রোহের পিছনে আফগানীর সবিশেষ ভূমিকা ছিল। ইরান থেকে আফগানী বসরা যান, তারপর যান লন্ডন এবং সেখানে থেকে সবশেষে ইস্তাম্বুলে প্রত্যাবর্তন করেন এবং আমৃত্যু সেখানেই অবস্থান করেন। তার মৃত্যুর তারিখটি ছিল ৯ মার্চ, ১৮৯৭। আফগানীর শেষ জীবন কেটেছিল অন্তরীণাবস্থায়। তুর্কী সুলতান ষড়যন্ত্র করে সাম্রাজ্যবাদবিরােধী আন্দোলনের এ মহানায়ককে তিল তিল করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে শুধু মুসলিম উম্মাহর ক্ষতি সাধন করেননি, নিজের ধ্বংসকেও সেদিন ত্বরান্বিত করেছিলেন। ইতিহাস তার সাক্ষী। অধ্যাপক ই.জি.ব্রাউন এই অসাধারণ পুরুষের কৃত্রি মূল্যায়ন করেছেন এমনিভাবেঃ

‘Enormous force of character, prodigious learning, untiring activity, dauntless courage, extraordinary eloquence both in speech and in writing, and an appearance equally striking and majestic. He was at once a philosopher, writer, orator, and journalist, but above all politician, and was regarded by his admirers as a great patriot and by his antagonists as a dangerous agitator.’ [৪]

 

তিন

ইউরােপীয় সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসন ও জুলুমবাজির মুখে উনবিংশ শতাব্দীতে মুসলিম দুনিয়ায় জামাল উদ্দীন আফগানীর চিন্তাভাবনা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে তার রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা সেকালের মুসলিম মানসকে তীব্রভাবে নাড়া দেয়। জগৎ সংসারে মুসলমানদের দুরবস্থা ও ভাগ্য বিপর্যয়ের কার্যকারণগুলাে আফগানী গভীর মমতা ও বুদ্ধিমানতার সাথে খুঁজে ও বুঝে দেখার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর জীবদ্দশায় মুসলিম পুনর্জাগরণের প্রধান বাধক শক্তি হিসেবে তিনি চিহ্নিত করেছিলেন সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলাে কর্তৃক মুসলিম দেশগুলাের স্বাধীনতা হরণ। এ কারণেই তিনি তার অপরিসীম উদ্যম ও সাহসকে আমৃত্যু সাম্রাজ্যবাদবিরােধী ভূমিকায় নিয়ােজিত করেছিলেন। তাঁর মেধা, মনন, মনীষা, বাগ্মিতা, লেখাজোখা সবকিছুর উদ্দেশ্যই ছিল এক বিশ্ব মুসলিম ঐক্যের সাধনা। আফগানী তাঁর দূরদৃষ্টিতে অনুভব করেছিলেন একমাত্র ঐক্যবদ্ধ মুসলিম উম্মাহই সাম্রাজ্যবাদের চক্রান্ত নস্যাৎ করতে সক্ষম। জীবদ্দশায় তিনি এ দাবি নিয়ে মুসলিম শাসক, উলেমা আর জনসাধারণের কাছে নিশিদিন ছুটে বেড়িয়েছেন। সাম্রাজ্যবাদের কালাে হাত ব্যতীত মুসলিম উম্মাহর জন্য তিনি আরাে কতকগুলাে সমস্যার কথা বলেছেন যা মুসলমানদের অনৈক্য, বিভ্রান্তি ও দুর্দশার জন্য সমানভাবে দায়ী। এগুলাে হচ্ছেঃ

 

১. মুসলিম দুনিয়ার একনায়ক, স্বৈরাচারী শাসক ও সুলতানবৃন্দ

২. গণতান্ত্রিক ও নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনুপস্থিতি।

৩. সে সব আলেম ও ধর্মীয় নেতা যারা হীনস্বার্থে কায়েমী স্বার্থধারীদের মদদ যােগায়।

৪. আধুনিক প্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞান অর্জনে মুসলমানদের ভয়ানক রকমের ব্যর্থতা।

আফগানী কুরআন ও হাদিস থেকে উদাহরণ দিয়ে বলেছেন ঐক্য ব্যতীত মুসলমানদের উন্নতির দ্বিতীয় কোন পথ নেই। অনেকে মনে করেন ‘ইন্নামাল মুসলিমুনা ইখওয়াতুন’- মুসলমানরা পরস্পরের ভাই- কোরআনের এই বাণীর সত্যিকারের বাস্তব রাজনৈতিক ব্যবহার তার চেয়ে কুশলতার সাথে অন্য কেউ করতে পারেননি। সাম্রাজ্যবাদের বিশেষ করে বৃটেনের আগ্রাসী ভূমিকার কারণে তিনি মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিবাদসমূহ মিটিয়ে ফেলে বহিঃশত্রুকে মােকবিলা করার আহ্বান জানান। তিনি তার সম্পাদিত উরওয়াতুল উসকা পত্রিকায় লেখেন ‘লা জিনসিয়া লিল মুসলিমিন ইল্লা ফি দিনিহিম’- ইসলাম ছাড়া মুসলমানদের কোন জাতীয়তা নেই।[৫] তিনি স্বধর্মীয়দের বারবার স্মরণ করিয়ে দেন বিশ্বাসের এই ঐক্য ব্যতীত মুসলমানরা তাদের রাজনৈতিক  ক্ষমতাকে সংহত করতে পারবে না। মুসলমানদের তাই চাই পারস্পরিক সম্প্রীতিকে প্রবুদ্ধ করা, আল্লাহর রাস্তায় সদা সতর্ক অতন্দ্র প্রহরীর মতাে যুথবদ্ধ থাকা আর নিজেদের ভিতরকার ভাঙ্গনের উৎসগুলা বন্ধ করে দেয়া।

আফগানী আরাে লিখেছেন ইসলামের অভ্যুত্থান ঘটেছে সব ধরনের গোত্রতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে। ঈমানই হচ্ছে এর সাংগঠনিক ভিত্তি এবং ঐক্যের গােড়াপত্তনকারী। ইসলামী সমাজ তাঁর ভাষায় এক সর্বজনীন ধর্মীয় ভ্রাতৃত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত। বর্ণ, গােত্র কিংবা ভাষা কোনটিই এর ঐক্যের প্রতীক নয়। যতদিন মুসলিম শাসকরা শরীয়াহর নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, ততদিন আরবরা তুর্কীদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি, ইরানীদের আরবীয় কর্তৃত্ব স্বীকার করে নিতে অসুবিধা হয়নি তেমনি ভারতীয় মুসলমানরাও আফগান শাসকদের সাথে কোন রকম বিরােধিতায় জড়িয়ে পড়েনি। কিন্তু যেইমাত্র শাসকরা শরীয়াহর নীতি থেকে বিচ্যুত হয়ে নিজেদের খেয়াল খুশিমত চলতে শুরু করল তখন তারা তাদের কর্তৃত্বকে অস্বীকার করে বসল। তাই আফগানীর মতে মুসলিম রাষ্ট্রসমূহকে বিদেশী আক্রমণ ও আগ্রাসন প্রতিহত করতে কুরআনী নীতির ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া চাই এবং এমনি করে মুসলিম উম্মাহর উপর আপতিত ঝড় ও দুর্যোগকে মােকাবিলা করা এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। আফগানী তাই সঙ্গতভাবে প্রশ্ন করেন মুসলিম রাষ্ট্রসমূহ ও জনগণ কি অতীতের ধ্বংসস্তুপ থেকে উঠে দাঁড়াতে পারবে এবং শক্তিশালী পাশ্চাত্যের মোকাবিলা করা কি আদৌ তাদের পক্ষে সম্ভব হবে। আফগানীর শেষাবধি বিশ্বাস ছিল মুসলমানদেরকে ফের বিশ্বাসের অগ্নিমন্ত্রে উজ্জীবিত করা যাবে এবং বহিঃশত্রুর হুমকি মােকাবিলায় ইসলামী ঐক্যের বিকল্প আর কিছু নেই। ১৮৮৩ সালের দিকে তাই ক্রুটি ও বিচ্যুতি সত্ত্বেও উসমানী খেলাফতকে কেন্দ্র করে তিনি মুসলিম ঐক্যের একটা ধারণা হাজির করেন, পাশ্চাত্যের কুটনীতি ও মিডিয়ার জোরে যা প্যান ইসলামিজম হিসেবে বহুল প্রচারিত হয়। উসমানী খেলাফতকে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করে সাম্রাজ্যবাদের তােপের মুখে পূর্বীয় জনসাধারণ বিশেষ করে মুসলমানদের স্বার্থরক্ষার কথা তিনি ভাবতে থাকেন। তখনকার মতাে তাঁর মনে হয়েছিল উসমানী খেলাফতের বিপর্যয় ঘটলে মুসলিম ঐক্যের ভিত দুর্বল হয়ে পড়বে। সুতরাং এটিকে প্রাণপণে রক্ষা করা চাই।

বিভিন্ন স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রের পারস্পরিক ঐক্য প্রসঙ্গে ‘উরওয়াতুল উসকা’ পত্রিকায় তিনি লিখেছেন : ‘আমি কোন একক ব্যক্তির শাসনের পক্ষে ওকালতি করছি না, যা কার্যকর করা বেশ অনায়াসসাধ্য হয়ে উঠতে পারে। তারপরেও আমার বিশ্বাস কোরআনের নীতিসমূহ তাদের উপর কার্যকর থাকবে এবং ইসলাম ধর্মই সর্বরকমের ঐক্যের বিধায়ক হিসেবে চিহ্নিত হবে।’ আফগানী আরাে লিখেছেন প্রত্যেক শাসকের উচিত হবে তার প্রতিবেশী মুসলিম দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কেননা তাদের শক্তি ও অস্তিত্ব পরস্পরের উপর নির্ভরশীল। তিনি এ কথাও বলেন মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের একটা যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকা দরকার, যা কিনা সদস্য দেশগুলাের উপর বৈদেশীক আগ্রাসনের মুখে খলিফার অনুমােদন সাপেক্ষে কার্যকর হতে পারে।[৬] এ থেকে স্পষ্ট হয় আফগানী মুসলিম ঐক্যের কথা বলতে সর্বতােভাবে এক খলিফাকেন্দ্রিক তামাম মুসলিম দুনিয়ার শাসনই চেয়েছেন এমন নয়। এটি বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ একটা সমঝােতা বা চুক্তি হতে পারে, মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানদের পারস্পরিক অনুমোদন সাপেক্ষে একজন খলিফা নির্বাচন করা যেতে পারে অথবা পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষার মতাে জরুরী বিষয়গুলােতে মুসলিম দেশসমূহের ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত থাকতে পারে। এ ব্যাপারে হালজামানার NATO, WARSAW কিংবা ANZUS চুক্তির কথা বলা যেতে পারে। এ রকম তুলনীয় কিছু করবার জন্য মুসলিম বিশ্বকে আফগানী এক শতাব্দী আগেই স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন, যার প্রয়ােজন আজ বহুগুণে বর্ধিত হয়েছে।

রাজনৈতিক ঐক্যের পাশাপাশি আফগানী উলেমাদের ঐক্যের উপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি পরামর্শ দেন প্রত্যেক মুসলিম রাষ্ট্রের উলেমাদের একটা সংগঠন থাকা দরকার যারা সকলে মিলে একটা কেন্দ্রীয় সংগঠন গড়ে তুলবে; আফগানীর সার্বিক বিবেচনায় এর সদর দফতর পবিত্র মক্কা নগরীতে হওয়াই সমীচীন। তিনি মনে করেন বৈদেশিক হস্তক্ষেপের মুহূর্তে উলেমাদের এই সংগঠন ধর্মীয় নেতৃত্ব দেয়া ছাড়াও তাঁর ভাষায় সকল প্রকার বিদআতের মােকাবিলায় ইসলামের বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্যও সংগ্রাম করবে। আফগানী মনে করেন এই সব ধরনের ঐক্য একটি খেলাফতের কাঠামাের মধ্যে হলে ভালাে হয়। ইস্তাম্বুলকে রাজধানী করে তার প্রস্তাবিত ইসলামী ইউনিয়নের খলিফা হিসেবে যে কোন যােগ্য মুসলিমকে গ্রহণ করতে তিনি আগ্রহী ছিলেন। জানা যায়, তিনি বেশ কয়েকবার সুদানের মাহদী, শরীফ মােহাম্মদ ইবনে সউন অথবা ইয়েমেনের ইমামকে খলিফা হিসেবে গ্রহণের জন্য নিজের ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন। এটা সত্য আফগানীর এ সমস্ত পরিকল্পনা তার জীবদ্দশায় তেমন একটা কার্যকর হয়নি, কিন্তু মুসলিম ঐক্যের পথে তার উৎসাহ ও প্রচেষ্টার কোন ভাটা পড়েনি। এই ধরনের ঐক্যের প্রয়ােজনীয়তার পক্ষে সবচেয়ে বেশি কার্যকরভাবে তিনি তার বিখ্যাত পত্রিকা ‘আল উরওয়াতুল উসকা’য় প্রচারণা চালান। সকল মুসলিম শাসক, উলেমা ও সাধারণ জনগণের সমন্বয়ে এক মৈত্রী জোট গঠনের তিনি আহবান জানান। বিশেষ করে শিয়া সুন্নী বিরােধ যা মুসলিম ঐক্যের বাধা তা নিরসনে তার প্রচেষ্টা ছিল প্রশংসনীয়। তিনি আফগানিস্তান ও ইরানের মধ্যকার তুচ্ছ ধর্মীয় বিরোধ মিটিয়ে ফেলতেও পরামর্শ দেন। তিনি ইরানী আলেম ও মুজতাহিদদের বিবদমান মুসলিম পক্ষকে বিবাদ মিটিয়ে ফেলার জন্য বক্তৃতা, বিবৃতি ও লেখালেখি করবার আহ্বান জানান। এমনি পরিস্থিতিতে ১৮৯২ সালে তুর্কী সুলতান আবদুল হামিদ আফগানীকে ইস্তাম্বুলে তার পরিকল্পিত ইসলামী ইউনিয়নের বাস্তবায়নের জন্য আমন্ত্রণ জানান। তখনকার বাস্তবতাকে সামনে রেখে আফগানী সুলতানের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন এবং ইস্তাম্বুলে হাজির হন। অনেক আলােচনার পর সিদ্ধান্ত হয় উচ্চ পর্যায়ে সুলতানের সাথে ইরানের নাসিরুদ্দিন শাহ, মিসরের খেদিব, মরক্কোর সুলতান প্রমুখের মধ্যে যােগাযােগ ও সমঝােতার সূত্রপাত করা হবে।

দ্বিতীয়তঃ মুসলিম ঐক্যের প্রধান বাধা শিয়া-সুন্নী বিরােধের অবসানকল্পে ইরানের শাহর সাথে একটা আপােস রফায় আসা চাই।

তৃতীয়তঃ ইস্তাম্বুলে প্রত্যেক মুসলিম রাষ্ট্রের দু’জন প্রতিনিধির সমন্বয়ে উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। এ দু’জন সদস্যের একজন রাষ্ট্রের তরফ থেকে, অপরজন জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী একজন আলেম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এই কমিটি সকল মুসলিম রাষ্ট্রের সমস্যাদি পর্যালােচনা করবে এবং এর সিদ্ধান্ত প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্রকে নির্দ্বিধায় অনুমােদন করতে হবে। যদি কোন ইউরােপীয় শক্তি কোন মুসলিম রাষ্ট্রে হস্তক্ষেপ করে সেক্ষেত্রে এই মুসলিম রাষ্ট্র সংস্থা জিহাদ ঘােষণা করবে এবং ঐ শক্তির সাথে সকল রকমের সম্পর্ক ছিন্ন করবে। বলার অপেক্ষা রাখে না এ সংস্থার প্রাণভােমরা ছিলেন জামাল উদ্দীন আফগানী। তিনি অপরিসীম উৎসাহে মুসলিম শাসক, উলেমা ও রাজনৈতিক নেতাদের সাথে যােগাযােগ শুরু করেন এবং আশাপ্রদ সাড়া লাভে সক্ষম হন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় আফগানী তাঁর এই আজনা, লালিত সাধনার ধনকে বেশিদূর অগ্রসর করাতে পারেননি। তাঁর জীবনীকাররা জানিয়েছেন আফগানীর বিপুল জনপ্রিয়তা, প্রতিহিংসাপরায়ণ সুলতানের স্তাবকবৃন্দ তার কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ান ও সুলতানকেও সন্দেহপরায়ণ করে তােলেন। এইভাবে মুসলিম ঐক্যের গৌরবময় প্রচেষ্টা চক্রান্তের অপঘাতে হারিয়ে যায় ।

এটা সত্য সুলতানের সাথে আফগানীর সম্পর্কটা কখনােই পারস্পরিক বিশ্বাসের মধ্যে লালিত হয়নি। আর তাছাড়া মুসলিম ঐক্যের ব্যাপারে দু’জনের চিন্তাভাবনায়ও মৌলিক তফাৎ ছিল। আফগানী ছিলেন যথার্থ মুজাহিদ। তিনি সর্বান্তঃকরণে চেয়েছিলেন মুসলমানদের ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের প্রধান বাধক অনৈক্য ও সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তকে নির্মূল করতে। অন্যদিকে সুলতান এই প্যান ইসলামিজমের ধারণায় সমর্থন দেন পতনােন্মুখ ও দুর্নীতিগ্রস্ত খেলাফতকে টিকিয়ে রেখে নিজের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে।

এছাড়া আফগানী আজীবন একটি নিয়মতান্ত্রিক ও জনতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার পক্ষপাতী ছিলেন এবং জনতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে স্বৈরতান্ত্রিকতার স্বার্থে সমর্পণ করতে রাজি ছিলেন । সুতরাং সুলতানের সাথে তাঁর বিরােধটা অনিবার্য ছিল।

অন্যদিকে এ রকম একটা বিশ্ব মুসলিম ঐক্য সংস্থা গড়ে উঠুক এটা সাম্রাজ্যবাদীরা কখনােই চায়নি। সুতরাং এ পরিকল্পনা ভন্ডুল হয়ে যাওয়ার পিছনে সাম্রাজ্যবাদীদের কোন ভূমিকা থাকাটাও অস্বাভাবিক কিছু নয়।

 

চার

আফগানীর রাজনৈতিক চিন্তার অন্য একটি দিক বিশেষভাবে আলােচনার দাবি রাখে। সাম্রাজ্যবাদের মতােই মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের দুর্ভোগ ও দুর্দশার জন্য তিনি এখানকার দুর্নীতিগ্রস্ত, জুলুমবাজ স্বৈরশাসক ও অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছিলেন। জনগণের অনুমােদনহীন ও জনগণের কল্যাণে অসমর্থ এসব ক্ষয়িষ্ণু সরকারগুলাের উৎখাতের ঘােষণাও তিনি দিয়েছিলেন। ইসলামী নীতির বিশ্লেষণ করে তিনি দেখিয়েছেন। শরীয়াহর আলােকে খলিফা হবেন সেই ব্যক্তি, যিনি শরীয়াহর আইনে পারদর্শী, একই সাথে সেগুলাের প্রয়ােগেও দক্ষ ও কুশলী এবং জনগণের সমর্থনপুষ্ট । খেলাফতের মর্যাদা কখনাে, উত্তরাধিকার সূত্র, বর্ণ ও গােত্রীয় আধিপত্য, শারীরিক ক্ষমতা কিংবা ধনের প্রাচুর্যে অর্জনযােগ্য নয়।

১৮৭১ সালের ১ জানুয়ারি ইস্তাম্বুলে তুর্কী বিধায়কদের এক সমাবেশে তিনি ঘােষণা করেনঃ ‘ইসলামী নীতি অনুসারে খলিফা হবেন মুসলমান জনসাধারণের সত্যিকারের প্রতিনিধি। তার এই প্রতিনিধিত্বের অধিকার কেবলমাত্র সকল মুসলমানের অনুমোদন সাপেক্ষেই সম্ভব এবং একজন ব্যক্তি মাত্র কেবলমাত্র রাজরক্ত ধমনীতে ধারণ করার কারণে কোটি কোটি মুসলমানের ভাগ্যনিয়ন্তা হয়ে বসতে পারেন না। খলিফা একটি সাধারণ ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্বাচিত হবেন এবং তাকে চালনার জন্য ইসলামের প্রথম যুগের খলিফাদের মতাে একটা পরামর্শ সভা থাকতে হবে। এ পরামর্শ সভা একালের পার্লামেন্টের অনুরূপ হতে পারে।[৭]

আফগানীর ব্যাখ্যাত এই জনতান্ত্রিক খেলাফতের অস্তিত্ব তাঁর জীবদ্দশায় আদৌ ছিল না এবং এ কারণেই মুসলিম দেশগুলাের স্বৈরশাসকদের সাথে তাঁর বিরােধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। এসব স্বৈরশাসকরা জনগণের কল্যাণের পরিবর্তে সাম্রাজ্যবাদের পদলেহী হয়ে উঠেছিল। আফগানী মনে করেন এ কারণেই মুসলিম সমাজের সংহতি বিপন্ন ও দুর্বল হয়ে পড়ে, যাবতীয় উন্নয়নের সূচকগুলাে নামতে থাকে, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ স্তিমিত হয়ে যায়। আফগানী মুসলিম রাষ্ট্রগুলাের এ অবস্থার পরিবর্তনে কয়েকটি শর্ত দেনঃ

১. স্বৈরাচারী শাসকের পরিবর্তে ধর্মীয় গণতন্ত্রের (Democratic theocracy) প্রতিষ্ঠা;

২. পূর্ণ গণতন্ত্রায়নের জন্য শাসনতান্ত্রিক সরকারের প্রবর্তন; এবং

৩. খেলাফতের সংরক্ষণ।

 

পাঁচ

রাজনীতির মতই ধর্মীয় জগতেও আফগানী এক ধরনের রিফরমেশনের কথা বলেছিলেন। খ্রিস্টান জগতে মার্টিন লুথারের চেষ্টায় যে রিফরমেশনের আন্দোলন গড়ে ওঠে তার প্রভাব হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। পুরাে ইউরােপ সেদিন শত বছরের জড়তা, ক্লেদ আর প্রাচীনতা ভেঙ্গে জেগে ওঠে এবং লুথারের চেষ্টায় যাজকতন্ত্রের আধিপত্য ভেঙ্গে যায়, যুক্তি ও বুদ্ধির আলােকে খ্রিস্টধর্মের পুনঃবিচার শুরু হয়। এইভাবেই আসে রেঁনেসা, শিল্প বিপ্লব এবং সবশেষে পুরাে বিশ্বকে ইউরোপের শাসন করবার অধিকার । জামাল উদ্দীন আফগানী লুথারের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন এবং বলেছেন মুসলিম বিশ্বেও চাই রিফরমেশন।

তিনি আরাে বলেছেন খ্রিস্ট জগতে যে অধিকার আদায়ের জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম করতে হয়েছিল সে রকম অবস্থা ইসলামে এখনও অনুপস্থিত। কারণ ইসলাম কুসংস্কার নির্মূলকারী, তকলিদ অগ্রাহ্যকারী এবং যুক্তিবাদের সহায়ক। তাই তিনি পূর্বতন উলেমা ও ফকীহদের সিদ্ধান্তকে বর্তমানে অনুপযােগী হিসেবে বিবেচনা করেছেন এবং বলেছেন, ইসলামী আইন কোন মৃত জিনিস নয়, সময়ের পরিবর্তন ও চাহিদার আলােকে এটিও পরিবর্তনযােগ্য। মৌলিক বিষয়কে অবিকৃত ও অক্ষত রেখে যুক্তি ও বুদ্ধির আলােকে ইসলামী আইনের সংস্কারের উপর তিনি তাই জোর দিয়েছেন। ইজতিহাদ সম্পর্কে বলতে গিয়ে আফগানী মন্তব্য করেনঃ

‘The miseries of Islam are due to the despotic Muslim rulers and the Ulama who interpreted Islam to suit their own purposes .. Instead of adapting faith to reason and logic, they wish that reason and logic should be adapted to faith as conceived by them ………….. They should realize that unless they clothe religion in the knowledge they would not be included among civilized and educated peoples.’ [৮]

আফগানী সংগত কারণে তকলীদের বদলে যুক্তি ও বুদ্ধি ব্যবহারের কথা বলেছেন এবং সেই সব আলেমদের সমালােচনা করেছেন যারা মনে করে ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি মনে করতেন আইন হবে সময় ও বাস্তবতার সাথে সংগতিপূর্ণ এবং উলেমাদেরও উচিত বাস্তবের দিকেই দৃষ্টি ফিরিয়ে রাখা।

 

ছয়

উনবিংশ শতাব্দীতে এশিয়া ও আফ্রিকার নিপীড়িত মানুষের কাছে আফগানীর অভয়মন্ত্র বিপুল উৎসাহের সৃষ্টি করেছিল। মুসলমানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় জীবনে তিনি এক ধরনের প্রাণ প্রবাহের সঞ্চার করেছিলেন। বিশেষ করে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তার আন্দোলন ও সংগ্রাম রীতিমত কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছিল। জীবদ্দশায় সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালােবাসায় তিনি অভিষিক্ত হন কিন্তু স্বৈরাচারী দুঃশাসক ও প্রতিক্রিয়াশীল উলেমারা দুঃস্বপ্নের মতাে তাঁকে সবসময় তাড়িয়ে নিয়ে ফিরেছে। তাঁর চিন্তা ভাবনার ছাপ সেকালেই মুসলমান বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ ও ধর্মীয় নেতাদের উপর গভীরভাবে পড়েছিল। ভারতীয় উপমহাদেশে এর প্রভাব হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। যদিও এ অঞ্চলে আফগানীর অবস্থান ছিল স্বল্পস্থায়ী, তবুও তিনি সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের প্রণােদনা সৃষ্টি করেছিলেন। W.S. Blunt ভারতে আফগানীর জনপ্রিয়তার উল্লেখ করতে গিয়ে লিখেছেনঃ

“For Jamal-ud-Din they professed something like worship.”[৯]

ভারতে বিংশ শতাব্দীর প্রায় অধিকাংশ রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী ও উলেমা মুসলিম জাগরণে আফগানীর কীর্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। গত শতাব্দীর বিশ শতকে ভারতব্যাপী মওলানা আবুল কালাম আজাদ ও আলী ভ্রাতৃদ্বয়ের নেতৃত্বে যে খেলাফত আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তার পিছনে আফগানীর প্যান ইসলামী চিন্তার প্রভাব একটা বড় উপাদান হিসেবে কাজ করেছিল। মওলানা আবুল কালাম আজাদ এই মহানায়কের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন এমনিভাবেঃ “During the reform and resurrection in the East during the nineteenth century, there is hardly a personality which can in natural brilliance, and creative power be compared to Syed Jamal-ud-Din. It can be unhesitatingly said that he ranks very high among the makers of history and leaders of thought of modern East.” [১০]

রাজনৈতিক জগতের পাশাপাশি শিল্প, সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তির জগতে আফগানীর বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্বের চিন্তাভাবনায় সবচেয়ে বেশি উদ্বেলিত হয়েছিলেন আল্লামা ইকবাল। তিনি তাঁর কবিতায় আফগানীকে আধুনিক মুসলমানদের ত্রাতা ও প্রধান মুখপাত্র হিসেবে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। ইকবাল তার জাভিদনামায় আফগানীর চিন্তাভাবনার বিশ্লেষণ করেছেন বিস্তারিতভাবে। মুরশিদ রুমীর সাথে আসমান পরিভ্রমণের সময় তিনি ইকবালকে জামাল উদ্দীন আফগানী ও সাঈদ হালিম পাশার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। এবং বলেনঃ “প্রাচ্য এ দুই কীর্তিমান পুরুষের চেয়ে উত্তম কাউকে আজ অবধি জন্ম দিতে পারেনি। যাদের চিন্তাভাবনা আমাদের অনেক জটিল সমস্যার সমাধান দিয়েছে। মহান সৈয়দ জামাল উদ্দীন আফগানীর এতটাই উদ্যম ও প্রাণ প্রাচুর্য ছিল যে তাতে পাথর ও নুড়িও জীবন লাভ করতাে এবং কথা বলে উঠতাে।”[১১]

ইরানের বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ ও উলেমাদের উপর তার রাজনৈতিক ও ধর্মীয় চিস্তার প্রভাব এত ব্যাপক হয়েছিল যে এটি একটি গণআন্দোলনে রূপ নেয় ও সম্রাজ্যবাদের বিপক্ষে ১৯০৫-০৬ সালের গণবিপ্লবের মধ্যে তার অবসান ঘটে। অধ্যাপক Nikki R. Keddie মনে করেন সাম্প্রতিককালের ইরান বিপ্লব ও ইরানী উলেমাদের মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরােধী সম্রামে আফগানীর চিন্তাভাবনা বড় একটা ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে।[১২]

আরব জগতে আফগানীর প্রভাব বিস্তারিত হয়েছে মিসরের মধ্য দিয়ে। কারণ এখানেই আফগানী সবচেয়ে বেশি সময় কাটিয়েছিলেন। তার বিশ্ব মুসলিম ঐক্যের মিশনকে এখানে সবচেয়ে কার্যকরভাবে এগিয়ে নিয়েছিলেন তার যােগ্য শাগরিদ মুফতি আবদুহু, রশিদ রিদা এবং আল মানারের বুদ্ধিজীবীরা। সিরিয়ায় আফগানীর উল্লেখযােগ্য শিষ্য ছিলেন আবদুল রহমান আল কাওকাবী। এ ছাড়া রাশিয়ার তুর্কী নেতা ইসমাইল বে। গ্যাসপ্রিনিসকি, আজারবাইজানী নেতা রসুল জাদেহ আফগানীর চিন্তাভাবনা দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন। এটা সত্য বিশ শতকের গােড়ার দিক থেকে মুসলিম ভূখন্ডগুলােতে সাম্রাজ্যবাদ কর্তৃক সেকুলার ন্যাশনালিজমের ধারণা প্রচার পায় যা আফগানীর প্যান ইসলামী চিন্তাভাবনাকে অনেকটা দুর্বল করে ফেলে। কিন্তু তা সত্ত্বেও মুসলিম জনসাধারণের মন থেকে প্যান ইসলামী চিন্তাভাবনাকে নির্মূল করা কখনাে সম্ভব হয়নি। আশার কথা দুনিয়া জুড়ে বর্তমান মুসলিম জাগরণের যে আভাস লক্ষ্য করা যায়, বিশেষ করে বিভিন্ন ইসলামী আন্দোলনের যে সব লক্ষ্য ও কর্মসূচী রয়েছে তাতে প্যান ইসলামী মূল্যবােধ একটা শক্তিশালী উপাদান। নতুন পরিস্থিতি ও বাস্তবতার প্রেক্ষিতে এটিকে আফগানীর চিন্তাভাবনারই নব উন্মেষ বলা যেতে পারে।

 

সাত

আফগানীর বিশ্ব মুসলিম ঐক্যের আহ্বানে নিঃস্ব দীন বাঙ্গালী মুসলমানও সেদিন নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকেনি। সাম্রাজ্যবাদবিরােধী আন্দোলন ও খেলাফত আন্দোলনে বাঙ্গালী মুসলমানের ভূমিকা অপরিসীম। সেই উনিশ শতকেই টাঙ্গাইলের রিয়াজ আল দীন আহমদ মাশহাদী সমাজ ও সংস্কারক’ নামে আফগানীর এক জীবনী লিখেছিলেন। অনেকের ধারণা আফগানী প্যারিস থেকে যে প্যান ইসলামী পত্রিকা আল উরওয়াতুল উসকা বের করতেন তার কিছু ব্যয়ভার বাংলার কেউ কেউ বহন করতেন।[১৩]

আফগানী যখন কলকাতায় আসেন তখন তাকে নিয়ে বাংলার মুসলিম নেতারা সেদিন দ্বিধান্বিত হয়ে ওঠেন। নওয়াব আবদুল লতীফের মতাে মুসলিম নেতারা ব্রিটিশের সাথে কৌশলগত মিত্রতার কারণে ব্রিটিশবিরােধী আফগানীকে কলকাতা মাদ্রাসায় বক্তৃতা দিতে দেননি। জাস্টিস আমীর আলীর চেষ্টায় আলবার্ট হলে তার বক্তৃতার ব্যবস্থা হয়। এরকম দু’একটা ঘটনা ছাড়া তার প্রতি বাংলার মুসলমানদের প্রীতি ও অনুরাগের সম্পর্ক বরাবর অক্ষুণ্ণ ছিল।

মওলানা মােহাম্মদ আকরম খাঁ ও মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর মতাে রাজনীতিবিদ ও ধর্মীয় নেতারা আফগানীকে বিশেষ শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। বিশেষ করে আকরম খাঁ সম্পাদিত মাসিক মােহাম্মদী পত্রিকা সেকালে বাংলার মুসলমানদের ঘরে ঘরে আফগানীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ইসলামী ঐক্যের বাণী ছড়িয়েছে। ইসমাইল হােসেন শিরাজী, গােলাম মােস্তফা ও কাজী নজরুল ইসলামের অনেক কবিতাই প্যান ইসলামী প্রেরণা সঞ্জাত। আফগানীকে নিয়ে কাজী কবির লেখা বিখ্যাত সংগীতটিতে সুর দিয়েছিলেন শিল্পী আব্বাস উদ্দীন আহমদ। আফগানীর প্রভাব বাংলার গণজীবনে কত গভীরভাবে পৌছেছিল এসব দু’একটা ঘটনা তার প্রমাণ।

 

আট

আফগানী বহু ক্লান্ত মুহূর্তে এ কবিতাটি আবৃত্তি করতে করতে হযরতের ধ্যান মগ্ন হয়ে পড়তেন: “হযরত তােমার ধর্ম শােভা, সৌন্দর্য, ও চাকচিক্যে এমনই অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে যে, সে ধর্মকে তুমি এসে যদি আবার দেখ তুমিই তাকে চিনবে না।”[১৪]

এ ঘটনা প্রমাণ করে সমকালীন মুসলিম উম্মাহর অবস্থা সম্পর্কে আফগানীর মনঃপীড়া ও আত্মপীড়নের গভীরতা। তাঁর সমকালে মুসলিম উম্মাহর যে অবস্থা বিরাজমান ছিল, তার তুলনায় বর্তমান কালের মুসলিম রাষ্ট্রগুলাের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দৈন্যদশা আরাে গভীর ও ব্যাপক হয়ে উঠেছে বললে ভুল হবে না। এটা সত্য সাম্রাজ্যবাদের কবল থেকে ইতােমধ্যে মুসলিম রাষ্ট্রগুলাে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করেছে, কিন্তু দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ব্যতীত এই সদ্যলব্ধ রাজনৈতিক স্বাধীনতাও আজ বিপন্ন হতে চলেছে। একই সাথে সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাও হারিয়ে যাবার উপক্রম হয়েছে। আফগানীর জীবদ্দশায় নাম মাত্র হলেও মুসলিম ঐক্যের প্রতীক খেলাফত নামীয় প্রতিষ্ঠানটি টিকে ছিল। সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত ও মুসলিম নেতৃত্বের ব্যর্থতার কারণে সেটিরও অবসান ঘটেছে। সেখানে উদ্ভব হয়েছে গুটিকয়েক জাতিরাষ্ট্রের। এসব ভিন্ন নামের মুসলিম রাষ্ট্রের মধ্যে এখন পারস্পরিক সমঝােতা ও মিত্রতার চেয়ে বৈরিতার সম্পর্কই বেশি, কোন কোন ক্ষেত্রে সে সম্পর্ক সশস্ত্র ভ্রাতুঘাতী যুদ্ধে পর্যন্ত পর্যবসিত হয়। সাম্প্রতিককালের ইরান-ইরাক যুদ্ধ ও উপসাগরীয় যুদ্ধ এর বড় প্রমাণ।

এসব সমস্যা বহুগুণে বর্ধিত হয়েছে মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের স্বৈরতান্ত্রিক দুঃশাসকদের কারণে, যে সমস্যার ইংগিত আফগানী তাঁর জীবদ্দশায় দিয়ে গেছেন। আজও অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অনুপস্থিত। জনগণের অনুমােদনহীন এসব স্বৈরশাসকরা নিজেদের অব্যবস্থাগুলাে টিকিয়ে রাখার জন্য সাম্রাজ্যবাদের পদলেহন করে। অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদীরাও এসব শাসকদের তাদের নিজ জনগণের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়। আফগানীর জীবদ্দশায় কয়েকটি ইউরােপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তি মুসলিম ভূখণ্ডে হামলে পড়েছিল। এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে একক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটেছে এবং এর প্রভাববলয়ের বাইরে কোন রাষ্ট্রের পক্ষেই স্বাধীনভাবে মাথা উঁচু করে দাড়ানাে প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। বিশ্বায়নের নামে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও সাংস্কৃতিকভাবে মুসলিম দেশগুলাের আমেরিকায়ন চলছে। আরাে বিশেষভাবে বললে মুসলমান দেশগুলাে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অর্থনৈতিক, সামরিক ও সাংস্কৃতিকভাবে জিম্মি হয়ে পড়ছে। আমেরিকার দেয়া ব্যবস্থাপত্রের বাইরে কেউ চলতে চাইলে সেই মুসলিম দল বা রাষ্ট্র এই নব্য সাম্রাজ্যবাদের টার্গেট হয়ে উঠছে। এই দুঃসহ পরিস্থিতিতে মুসলিম রাষ্ট্রগুলাের করণীয় কি? এক শতাব্দী আগে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে টিকে থাকার জন্য আফগানী যে নীতিসমূহের কথা বলেছিলেন গভীরভাবে বিবেচনা করলে তাই কি বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না?

 

গ্রন্থঋণ:

 

১. Charles Adams, Islam and Modernism in Egypt, London, 1933.

২. Nikki R. Keddie, An Islamic Response to Imperialism: Political and Religious Writings of Sayyid Jamal-ud-Din ‘al-Afghani, Calfornia: University of California Press, 1983.

৩. প্রাগুক্ত।

৪. E. G. Browne, Persian Revolution, London, 1910.

৫. Anwar Moazzam, Jamal al-Din al-Afghani. New Delhi: Concept Publishing Company, 1984.

৬. প্রাগুক্ত।

৭. প্রাগুক্ত।

৮. প্রাগুক্ত।

৯. Wilfrid Scawen Blunt, India Under Ripon: A private Diary, London, 1904.

১০. So. Quoted in the Political Philosophy of Iqbal, Parveen Shawkat Ali. Lahore: Publishers United Ltd, 1978.

১১. প্রাগুক্ত।

১২. Nikki R. Keddie, An Islamic Response to Imperialism.

১৩. কাজী আবদুল ওদুদ, শাশ্বত বঙ্গ। উদ্ধৃত : কাজী আবদুল ওদুদ রচনাবলী (১ম খন্ড), সম্পাদনা, আব্দুল হক। ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ১৯৮৮।

১৪. আবু যােহা নূর আহমদ, জামালুদ্দীন আফগানী। ঢাকা : আহমদ পাবলিশিং হাউস, ১৯৬৩।

Leave a Reply