পুনর্পাঠের পুনর্মূল্যায়ন: একটি বিক্ষিপ্ত বয়ান

১.০

এগারোটি রচনা-সম্ভারে সমৃদ্ধ ‘পুনর্পাঠ’। লিটলম্যাগ বলা যাবে না। ১২৮টি রুপালি পৃষ্ঠার গবেষণাধর্মী পত্রিকা। নতুন ভাবনা, তত্ত্ব ও তথ্যের সমন্বিত সমাহার। প্রত্যেকটি রচনার বিস্তৃতি অনতিদীর্ঘ। সেই সাথে তা অন্তহীন প্রশ্নচিহ্নের গভীরতা রেখে যায়। উসকে দেয় আমার মতো নির্মোহ পাঠকের উচ্ছলতা ও চিন্তার স্বচ্ছতার এক একটি দিগন্তকে।

বক্তব্যের বিষয় কভার-পেজে উৎকীর্ণ : শিক্ষা, দর্শন ও রাজনীতি। এদের সাথে অনিবার্যভাবে জড়িয়ে যায় সংস্কৃতি-ধর্ম-শিল্প-সাহিত্য-ইতিহাস-ঐতিহ্য। কোনোটিকেই বাদ দেওয়া যায় না। চিন্তা, বুদ্ধি ও কর্মযোগে এসব বিষয়ে আমরা হয়েছি অন্যের দাস। হয়েছি পরনির্ভর। আপন ঘরে আমরা রাজা হতে পারিনি। দিনে দিনে বিকিয়ে দিয়েছি স্বকীয়-সত্তা, মনন ও আত্মনির্মিত ভাব-সম্পদের বর্ণিল ভুবনকে। আমরা সেখানে আবার ফিরে যেতে চাই। স্ব-মহিমায়, সগৌরবে। সেই আত্ম-অনুসন্ধানের কথাই সম্পাদকীয়তে উচ্চকিত:

‘ছোট হোক, হোক বাবুই-ঘর; আমার ঘরে আমিই ছিলাম রাজা—কেনা দাস হলাম কেন? নিজ ঘরটি খুঁজে না-পেলে দাসত্ব কিন্তু ঘুচবে না। আপন ইতিহাস, ঐতিহ্য, চিন্তা ও দর্শনের জমিনে দাঁড়িয়ে সাহসে স্পর্ধায় ভর করে নিজের কথাটি বলতে না-পারলে পরাভূত থাকব চিরকাল, নিভু নিভু দেউটি নিভে যাবে চিরজনমের মতো। সেই জমিনটা খুঁজে পাবার জন্যেই ‘পুনর্পাঠ’।

১.১

‘পুনর্পাঠে’র প্রথম নিবন্ধটি আব্বাস ইসলাম খানের। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে লেখা: ‘বাংলাদেশ হোক ‘সবার জন্য’’। তথ্য-সমৃদ্ধ লেখাটির বক্তব্য বেশ পরিষ্কার, স্বচ্ছ।  সমস্যা নানাবিধ, এর উত্তরণের উপায় হলো : সরকারের পাশে সবাইকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। যেসব কারণে উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে তার দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। চিহ্নিত করেছেন ভিন্ন ভিন্ন বিষয়কে, যা সমস্যায় আক্রান্ত। প্রতিবন্ধী, মাদ্রাসা- পড়ুয়া ও পথশিশু, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা-ব্যবস্থা, নারীশিক্ষা ও কর্মসংস্থান, পরিবহন ও যোগাযোগ-ব্যবস্থা, গৃহকর্মী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও হিজড়াদের প্রসঙ্গ এসেছে। সব শ্রেণির সমস্যা ও সংকট থেকে মুক্ত করার মধ্য দিয়ে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে উঠতে পারে। তাঁর সর্বজনীন ও নিরপেক্ষ-ভাবনা হলো :

“বিভিন্ন গোষ্ঠীকে যদি সমান অধিকার নিশ্চিত করতে পারি, তাহলেই আমরা একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে পারব। দলীয় বিভাজন থাকতেই পারে, মতের অমিল থাকতে পারে, আদর্শের ভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে ‘সবাইকে’ নিয়ে ‘সবার জন্য’ বাংলাদেশ গড়ার জন্য কাজ করতে হবে।”১

১.২

গৌতম দাসের রাজনৈতিক প্রবন্ধ: ‘মনিপুরের স্বাধীনতা ও ভারত রাষ্ট্রচিন্তার ঘাটতি।’ ভারতের উত্তর-পূর্ব দিক জুড়ে মনিপুর রাজ্য। পাহাড়ি জনপদ। তাদের স্বাধীনতার ঘোষণাকে (২৯ অক্টোবর, ২০১৯) অস্বীকার করেছে ভারত সরকার। ঔপনিবেশিক আমল থেকে নেহেরু-প্যাটেলের প্রিয় হাতিয়ার ‘একসেশন চুক্তি’ চলে আসছে, যার উত্তরাধিকার পেয়েছে মোদি-অমিতরা। তা কী? তা হলো “কোনো রাজার ওপর বল বা চাপ প্রয়োগ করে লিখিয়ে নেওয়া হয় যে, ঐ রাজ্য স্বাধীন ভারতে যোগ দিয়েছে, বা নিজেকে বিলীন করে দিয়েছে।”২ যার ফাঁদে আটকা পড়েছে মনিপুরীরা। এমনকি কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামী জনগণও। আটলান্টিক চুক্তি অনুযায়ী, “যেকোনো ভূখণ্ড কার দ্বারা শাসিত হবে তা নির্ধারণে একমাত্র নির্ধারক হবে ঐ ভূখণ্ডের বাসিন্দাদের ইচ্ছা বা সম্মতি।”৩ কিন্তু এ চুক্তি ভারত মানতে চায় না। প্রবন্ধে এ বিষয়টি পরিষ্কারভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।

১.৩

পরের রচনাটি ফাহমিদ-উর-রহমানের। শিরোনাম: ‘আশরাফ আলী থানভির আধ্যাত্মিক রাজনৈতিক চিন্তাধারা’। তথ্যসমৃদ্ধ মননশীল প্রবন্ধ। হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভির জীবন-চিন্তা ও কর্মের ওপর লেখা। শিক্ষক, সংস্কারক, শাস্ত্রবিদ, মুফতি, তাসাউফ চর্চাকারী দরবেশ, লেখক—এসব নানা অভিধায় উজ্জ্বল তাঁর জীবন-সরণি। দেওবন্দ মাদরাসা-কেন্দ্রিক বিপ্লবী ছাত্র, প্রখ্যাত সুফিসাধক হাজি ইমদাদুল্লাহর (রহ.) কামালিয়াত-প্রাপ্ত শিষ্য, হাদিসের শিক্ষক, কুরআনের তাফসিরকারক (তাফসিরে আশরাফী), বাগ্মী ও ৩৪৫টি বই-পুস্তকের সুলেখক— এসব তাঁকে মহীয়ান করে তুলেছে। এ প্রবন্ধে লেখক থানভির অবদানের ভিন্ন ভিন্ন দিক ও প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন। তার মধ্যে দুটো বিষয়ের দিকে তাকানো যায়।

ক. সংসারবৃত্তে নারী-পুরুষ একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। পরিপূরক। সৃষ্টির আদি লগ্ন থেকে চলছে এ নিয়ম। উভয়ের স্বভাবজাত প্রবৃত্তি ও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য শ্লীল-শোভন-পরিচ্ছন্নতায় শুরু হয় দাম্পত্যজীবন । নৃবিজ্ঞান বলছে, নারীর সুন্দর-শোভন রূপের পাশে তার একটা প্রাকৃতিক স্বভাব রয়েছে। সে প্রকৃতির সেরা সদস্যকে নিজের শরীরে ধারণ করে মাতৃত্ব অর্জন করে। বিবাহ-মাতৃত্ব ও ঘরকন্না , যা তার সত্তার সাথে জড়িয়ে থাকে। সে প্রকৃতির সবচেয়ে কাছাকাছি। আর পুরুষ বহির্মুখী সামাজিক ঘরনায় বিকশিত হয়। আর্টনার বুভোয়ারের ভাষায় : নারী প্রকৃতির সাথে সংশ্লিষ্ট, পক্ষান্তরে পুরুষ সংস্কৃতি, সভ্যতা এবং প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণের সাথে।৪ তাই বলতে পারি, নারী প্রাকৃতিক ও পুরুষ সাংস্কৃতিক।৫

থানভির মতে, নারীকে রাখা হয়েছে সংক্ষিপ্ত বৃত্তের ভেতর। সে শোষণ ও অত্যাচারের প্রতীক। নারী-পুরুষ মৌলিকভাবে সমান। তিনি ‘বেহেশতি জেওরে’ উভয়ের স্থানকে সামানুপাতিকভাবে তুলে ধরেন। পরিবার ও সমাজ গঠনের জন্য তাদের নৈতিক শিক্ষায় আলোকিত করা জরুরি। সামাজিক কুসংস্কার নারীকে তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। তার মর্যাদাকে করেছে নিম্নগামী। অথচ জীবনযাপনে উভয়ের অর্জন সমান। কুরআনে তার স্পষ্ট উচ্চারণ শোনা যায় :

… ‘পুরুষ যা অর্জন করে তা তার প্রাপ্য অংশ এবং নারী যা অর্জন করে তা তার প্রাপ্য অংশ। আল্লাহর কাছে তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বজ্ঞ।’ (নিসা:৪)

রাসুলের (সা.) বিদায় হজের বাণীও  নারী-পুরুষের অধিকার সম্বন্ধে সচেতন করে দেয়।৬ থানভির যুক্তিনিষ্ঠ বর্ণনা শরিয়তের ভেতর থেকে নারীর সাংস্কৃতিক ক্ষমতায়নের কথাটি উচ্চারিত হয়েছে। লেখকের ভাষায় :

এর ফলে মুসলিম নারীদের একধরনের সাংস্কৃতিক ক্ষমতায়ন হয়েছে, যা ইসলামি শরিয়তের মধ্যে নারীদের আইনগত ও অর্থনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে।৭

খ. ইসলামের ইতিহাসে তাসাউফের পথ গৌরবদীপ্ত, হিরণ্ময়। সোহবত, আদব ও মহব্বতের প্রশিক্ষণ হয় এখানে। সুফির খানকায় এক ভালোবাসা-ভরা নির্ভার আশ্রমে। এ পথের চর্চা-প্রশিক্ষণ মানুষকে স্বচ্ছ-সুন্দর-সোনালি সোপানে তুলে দেয়। প্রভুপ্রেম, রাসুলের (সা.) ইত্তেবা ও সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসার সেতুবন্ধন তৈরি করে। আত্মনিয়ন্ত্রণ, কলবের জাগরণ ও দিব্যদৃষ্টির মধ্য দিয়েই সুফি কামালিয়াত-প্রাপ্ত হন। তবে থানভির মতে, পুরোপুরি শরিয়তের অনুশাসন মেনেই এই দুর্গম পথে এগিয়ে যেতে হয়। কেননা, আত্মশুদ্ধির জন্য শরিয়া নিতান্তই জরুরি। এতে বোঝা  যায়, এই উপমহাদেশে তাসাউফ চর্চার বিকৃতি থেকে মৌলিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি চেষ্টা করেছিলেন। ইলমের পাশে আমল এবং ওই আমলের পরিশুদ্ধতা (তাজকিয়া)। এই পরিশুদ্ধতার কথা তো কুরআনে সরাসরি এসেছে।৮

বায়াত, সোহবত, মোরাকাবা, মোশাহিদার পথ-পরিক্রমায় কলব সালিম হয়। পরে হয় মুতমাইন্না।৯ স্বচ্ছ-পরিশুদ্ধ মানুষ তৈরি হয়। ভেতরের আলো-ঝলমল সত্যের উপলব্ধি বিকশিত হয় বাইরেও। এ পথে থানভির মুরিদ ও খলিফার সংখ্যা অনেক। তাঁদের মধ্যে মুফতি মোহাম্মদ শফি (মৃ. ১৯৭৬) , জাফর আহমদ উসমানি (মৃ. ১৯৭৪), মোহাম্মদ তাকি উসমানি এবং বাংলাদেশের শামসুল হক ফরিদপুরি (মৃ. ১৯৬৯)।১০

১.৪

ফরিদ আহমদ রেজার প্রবন্ধ ‘মুসলিম বিশ্বে সেক্যুলারিজমের বিভিন্ন বয়ান : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ একটি স্পর্শকাতর বিষয়কে তত্ত্ব ও তথ্যের আবির মিশিয়ে নতুন ভাবনার দিকে মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভাবতেই পারিনি এমন রচনা হাতে আসবে। ‘সেক্যুলারিজম’ (নন-রিলিজিয়াস) শব্দটির বাংলা পারিভাষিক অর্থ জেনে এসেছি ‘ধর্ম নিরপেক্ষবাদ’। এ দেশে যারা ইসলাম নিয়ে চর্চা ও গবেষণা করেন, তারা বলেন, ‘ধর্মহীনতা’ বা এই জাতীয় না-ধর্মী অপবচন। যা দিনে দিনে ভাবনায় রপ্ত হয়ে গেছে। কেউ কেউ ইহলোকিকতাকে বুঝিয়েছেন।১১

শব্দের অর্থ যেভাবেই আসুক তত্ত্ব, বোধ ও চেতনাই আসল। যে ‘ধর্মহীনতার’ কথা আজীবন জেনে আসছি এ-প্রবন্ধ পড়ে এখন বুঝতে পারছি তা তো সঠিক নয়। ‘সেক্যুলারিজমের’ মৌলিক বিষয়টি আমাদের এক বিপ্রতীপ ধারণা বাতলে দেয়। কেবল ইবাদত দিয়েই তো ইসলাম নয়, তার আরেক অংশ হল ‘মুয়ামালাত’। যা জাগতিক ও জৈবিক। এবং তা কেবল মুসলমানের নয়, ধার্মিক-অধার্মিক, বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী সবার। পৃথিবী-বসবাসরত সব মানুষের। রাষ্ট্রের দায়িত্ব সব মানুষের বিশ্বাস ও চিন্তার স্বাধীনতাকে হেফাজত করা। তার সুষ্ঠু ব্যবস্থা নেওয়া। সরকার কোনো ধর্মের পক্ষপাতিত্ব করবে না। এককথায় সেক্যুলারিজম হল সকল ধর্মের লোককে তাদের অধিকার দেওয়া, সকল ধর্মের মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়া।১২

এ প্রবন্ধে লেখক ইসলামের ইতিহাসের নানা প্রান্ত থেকে সেক্যুলারিজমের উদাহরণ টেনেছেন। এতে বিষয়টি আরও মজবুত ও দৃঢ়তা পেয়েছে। দু-তিনটির কথা বলি :

১. ‘হিলফুল ফুজুলে’ ইসলামের কোনো উল্লেখ ছিল না। এর সাথে জড়িত কেউ মুসলমানও ছিলেন না। কিন্তু সেখানে মহানবি (সা.) অংশ নিয়েছেন এবং নবুয়তি জীবনেও এ-রকম কাজকে অনুমোদন দিয়েছেন।’ পৃ. ৬০

২. ‘হুদায়বিয়ার সন্ধিপত্র সম্পাদনার সময় কুরায়েশ প্রতিনিধি সুহাইল বিন আমর গোঁ ধরে যে চুক্তিপত্রে ‘মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ এবং ‘বিসমিল্লাহ’ লেখা যাবে না। সাহাবিরা এতে ব্যথিত বা ক্ষুব্ধ হলেও মহানবি (সা.) ‘আল্লাহর নামে শুরু করছি’ এবং ‘মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসুল’ –- ইসলামের এই দুটো বুনিয়াদি বিষয় বাদ দিয়ে শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।’ পৃ. ৫৯

৩. ‘মক্কা বিজয়ের পর হুনায়নের যুদ্ধে যাওয়ার সময় মহানবি (সা.) সাফওয়ান বিন উমাইয়ার নিকট থেকে যুদ্ধাস্ত্রসহ ১০০টি লৌহবর্ম কর্জ হিসেবে নিয়েছিলেন। সাফওয়ান বিন উমাইয়া তখনও ইসলাম কবুল করেননি। পৃ. ৬০

বলা যায়, এ লেখা পড়ে আমরা সেক্যুলারিজমের বোধ বা ধারণাকে ‘না’ থেকে ‘হ্যাঁ’-এর দিকে যেন উত্তরিত করতে পারি। তাতে দেশ দেশে ধর্মের বিপরীতমুখী ও সহিংস মনোভাব মুছে যাবে। হানাহানি-রক্তারক্তি বন্ধ হবে। এ দেশে মানবতা, নৈতিকতা এবং যে-যার ধর্ম পালনে নিরাপত্তা পাবে।

‘রাষ্ট্র এর নাগরিকদের নামাজ ও পূজা করার অধিকার সংরক্ষণ করবে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এবং ধর্মীয় কাজকর্ম সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করতে সহযোগিতা প্রদান করবে। ব্রিটেন, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও তুরস্কের সরকার যেভাবে করেছে।’১৩

চিন্তার আবিলতা-মুক্ত এই আশাবাদকে আমরাও স্বাগত জানাই।

১.৫

ওভামির আঞ্জুমের ‘ইসলামপন্থিদের কি বুদ্ধিবৃত্তিক দীনতা রয়েছে?’ শীর্ষক রচনাটি বাংলা অনুবাদ করেছেন মো. আশরাফ আজীজ ইশরাক ফাহিম।

নিঃসন্দেহে রচনাটি আবেগ ও উত্তাপহীন নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা। বস্তুগত প্রবন্ধের এক নিরেট বুদ্ধি ও জ্ঞানভিত্তিক নিরীক্ষাধর্মী সংক্ষিপ্ত বিবরণী। একেবারে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত ইসলামের ইতিহাস-রাজনীতি-ধর্মতত্ত্ব-নৈতিকতার চালচিত্র উপস্থাপিত হয়েছে। পাকিস্তান-মিশর-মরোক্কো ও অন্যান্য মুসলিম দেশের আন্দোলন, সাময়িক-সফলতা, ও বিস্তৃত-ব্যর্থতার ধারাবাহিক বিষয়কে তুলে ধরা হয়েছে। এবং নেতৃবৃন্দের বুদ্ধিবৃত্তিক দীনতা কতটা প্রভাব বিস্তার করেছে তার সুদূরপ্রসারী ইঙ্গিত পাওয়া যায়। হাসান আল বান্না, সাইয়েদ কুতুব, আবদেস সালাম,  ইয়াসিন-এর পাশাপাশি শাহওয়ালীউল্লাহ, আল গাজালি, সালিম আল আওয়া, মোহাম্মদ ইমারা, ফাহমি হুওয়াইদির মতো বুদ্ধিজীবীদের কথা এসেছে। সব মিলিয়ে এক তাত্ত্বিক সৌন্দর্যে উত্তীর্ণ হয়েছে রচনাটি।

১.৬

শাকিব আরসালানের ‘ইবনে খালদুন কেন প্লেটো, এরিস্টটল ও আল-ফারাবির থেকে ভিন্ন?’ প্রবন্ধটির অনুবাদক আবদুল্লাহিল বাকি।

লেখাটি অনুবাদমূলক হলেও পড়তে গিয়ে অনুবাদ মনে হয়নি। মৌলিক রচনার আদলে গদ্যের শিল্প-বিন্যাসে নির্মিত। সমাজতত্ত্বের ইতিহাসের জনক আবদুর রহমান ইবনে খালদুনের কর্ম ও নতুন চিন্তাকে পর্যায়ক্রমে বর্ণনা করা হয়েছে। ‘আল মুকাদ্দিমা’য় ইতিহাসের উপাদানকে একটি দার্শনিক প্লাটফরমে দাঁড় করানো হয়েছে। যা তাঁর আগে এভাবে কেউ পরিপূর্ণতা দিতে পারেননি। ইবনে খালদুন মানুষের জীবনে বিচ্ছিন্নতা পছন্দ করেননি। একাকী জীবন মানুষকে পূর্ণতা দিতে পারে না। বাধা আসে প্রকৃতি থেকে। অনিশ্চিত হয়ে পড়ে জীবনযাপন। মৌমাছি, পিঁপড়া, পঙ্গপালের সমাজ জীবনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তারা কাউকে রাজা বানায়। এবং সবাই তা মেনে নেয়। মানুষও কর্তৃত্ব স্বীকার করে তবে অনেক ভাবনা-চিন্তা করে। লেখকের ভাষায় :

‘মানুষ ও অন্যান্য জীবের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার ক্ষেত্র হলো, অন্যান্য জীব তার স্বভাব প্রকৃতিতে বিদ্যমান ঝোঁকের দরুনই একটা কেন্দ্রীয় চরিত্রের অধীনতা ও বশ্যতা স্বীকার করে নেয়। আর মানুষ শাসকের অধীনতা মেনে নেয় চিন্তাভাবনার পর।’ (পৃ. পুনর্পাঠ – ৭৭)

১.৭

‘ইসলামি দর্শনের ভাগ্য-বিপর্যয় : গাজ্জালি ও ইবন রুশদ পুনর্পাঠ’-এর লেখক মুহাম্মাদ ইউসুফ মুসা, অনুবাদক :  খালিদ মুহাম্মাদ সাইফুল্লাহ।

তুলনামূলক পদ্ধতিতে লেখা। গাজালির সাথে ইবনে সিনা ও আল ফারাবির ভিন্নতা ও সমতাকে তুলে আনা হয়েছে রচনায়। সেই সাথে গ্রিক দার্শনিকদের কথাও এসেছে। মোটা দাগে গাজ্জালির সাথে অন্যান্য দার্শনিকদের বিভেদের সার-সংক্ষেপ নির্দেশ করেন এভাবে –

ক) জগতের আদিত্ব ও অনাদিত্ব ;

খ) আল্লাহ থেকে জগতের সৃষ্টি ;

গ) সত্তা ও জগৎ সম্পর্কে আল্লাহর জ্ঞান ;

ঘ) কার্য-কারণ নিয়ে সমস্যা ;

ঙ) পুনরুত্থান ও পরকালীন প্রতিদান ;

দর্শন চর্চার ধারায় রচনাটি তাত্ত্বিক ও প্রাণবন্ত। ভাষার ঋজুতা নেই। একেবারে সাবলীল গতিতে দুরূহ বিষয়ের বিশ্লেষণ স্বচ্ছন্দে এগিয়ে গেছে।

১.৮

ইতিহাসবিদ, দার্শনিক, সুফি ড. মুঈনুদ্দিন আহমদ খানের রচনার (বইয়ের নাম: ‘অরিজিন এন্ড ডেভেলপমেন্ট অব এক্সপেরিমেন্টাল সায়েন্স: এ চ্যালেঞ্জিং এনকাউন্টার উইদ দ্য ওয়েস্ট’) ওপর একটি নাতিদীর্ঘ আলোচনা করেছেন মানোয়ার শামসী সাখাওয়াত। পরের রচনাটি (ফ্রিডম অব চয়েস এন্ড ডিটারমিনিজম) একটি সাক্ষাৎকার। পরেরটিও আহমদ ছফার বইয়ের আলোচনা (সাম্প্রতিক বিবেচনা: বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস)।

১.৯

একেবারে ‘পুনর্পাঠে’র প্রান্তিক প্রবন্ধটি চমকে দেয় পাঠককে। শিরোনাম : ‘অ-ইউরোপীয়রা কি চিন্তা করতে পারে?’ হামিদ দাবাশির রচনা। অনুবাদক: মামুন আবদুল্লাহহিল।

প্রবন্ধটি পড়ে যুগপৎ বিস্মিত ও আশান্বিত হয়েছি। যেসব ভাবুক ইউরোপীয় নন, যাদের চিন্তার পোশাকে দার্শনিকের তকমা নেই তাঁরা কি ‘ফিলোসফার’ নন? এ প্রশ্নের জবাব পাওয়া বেশ মুশকিল। ভারত, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, চীন এসব অঞ্চলের চিন্তক কি দার্শনিকের স্বর্ণখচিত তালিকা থেকে বাদ পড়ে যাবে? আসলে ইউরোপীয়রা শত শত বছর ধরে উপনিবেশ গড়ে তুলে শাসন-শোষণ-অত্যাচার করেছে। লেখকের এই নীরব প্রতিবাদের সাথে আমরাও একমত হয়ে যাই। সহমর্মিতায় বুকটা ভরে উঠে।

১.১০

‘পুনর্পাঠে’র প্রবন্ধগুলো ইতিহাস, দর্শন, ধর্ম ও রাজনীতি বিষয় নিয়ে লেখা। যা আবরিত হয়েছে শব্দ-পদ ও বাক্য-বিন্যাসে। তত্ত্ব, তথ্য ও ভাবনাগুলো প্রবন্ধ পদবাচ্যকে আশ্রয় করে নির্মিত। আমরা জানি দার্শনিকতা প্রবন্ধের প্রাণ। তথ্য থেকে তত্ত্বে, বর্ণনা থেকে বিশ্লেষণে, ভাবনা-ভাষ্য থেকে মৌলিক চিন্তার উত্তরণের মধ্য দিয়েই প্রবন্ধ পুষ্ট হয়। বাংলা সাহিত্যে সত্যিকার বস্তুগত প্রবন্ধ (objective article) নিতান্তই কম এবং এটা সবচেয়ে নাবালক শাখা। বর্ণনার আধিক্য, যুক্তিহীনতা ও বুদ্ধির নিষ্প্রভতা এই শাখাকে দুর্বল করে দিয়েছে। বাঙালি দার্শনিকের সংখ্যা সুলভ নয়। ইংরেজিতে কীটস, ডিকেন্সের পাশে হিউম, স্মিথ ও রাসেল; জার্মানে গেটে, রিলকে ও টমাস ম্যানের পাশে কান্ট, মার্ক্স ও হেবার রয়েছে। বাংলা রস সাহিত্যের পাশে তেমন মননশীল সাহিত্যের বিকাশ কতটা হয়েছে? সেদিক দিয়ে ‘পুনর্পাঠে’র সাহসী উদ্যোগ পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বিশেষ করে মুসলিম দর্শনের সুবর্ণ অতীতের মৌলিক ভাবনা, তত্ত্ব ও তথ্যকে পাঠকের সমীপে উপস্থাপন করা হয়েছে। সাধুবাদ ‘পুনর্পাঠে’র সংশ্লিষ্ট সবাইকে।

১.১১

ভাষা-ভাবনার দিকটাও উল্লেখ্য :

প্রত্যেক জীবন্ত ভাষাই গতিশীল চলে, ক্ষণে ক্ষণে পালটায়। বদল হয় শব্দ। তা আমরা উচ্চারণে বুঝি। তারপর বুঝি বানান-বিপর্যয়ে, তারতম্যে। একেবারে শেষে অনুভব করি অর্থের রূপান্তর। তখন চেতনা ধাক্কা খায়। অলংকার শাস্ত্রে একে বলে রূপক, মেটাফর। গদ্যেও তেমনি হয়। শব্দ প্রতিস্থাপিত হয়, ভাব বদলের জন্য। যাকে বলা যায় ভাবশব্দ। উদাহরণ দেই:

  • ছোট হোক, হোক বাবুইঘর; আমার ঘরে আমিই ছিলাম রাজা—কেনা দাস হলাম কেন? (সম্পাদকীয়)
  • এ কাজে নেহরুর প্রিয় হাতিয়ার ও পদ্ধতি ছিল “একসেশন চুক্তি”। পৃ. ১৮
  • আশরাফ আলী থানভি ছিলেন এই মাদ্রাসার ছাত্র এবং এই সিলসিলার সার্থক ওয়ারিশ। পৃ.২৪
  • যুদ্ধে জার্মানি পরাজিত হলে মিত্রশক্তি ওসমানী খিলাফতকে টুকরো টুকরো করার সিদ্ধান্ত নেন। পৃ.২৯
  • তুরস্কের মোস্তফা কামাল মুসলিম বিশ্বে সর্বপ্রথম সেক্যুলারিজমকে আমদানি করেন…। পৃ. ৪৮
  • ইসলামের এ ধরনের কূপমণ্ডুতার স্থান নেই। পৃ. ৫২
  • …রাজনৈতিক বিরোধিতাকে তখন ধর্মীয় মোড়কে ঢেকে প্রচারণা চালানো হয়। পৃ. ৫৪
  • কিন্তু এই ফন্দিফিকিরের বড়শিতে তিনি ইবনে খালদুনের লাগাম টানতে পারেননি। পৃ.৭৪
  • ইতিহাসের উপাদানে উত্তাপে জমে উঠেছে কত সাহিত্যের জলসা। পৃ. ৭৬

চিহ্নিত শব্দগুলো আগেকার ভাবকে নিয়ে নতুনভাবে সেজে বসেছে। জায়গা করে দিয়েছে নতুন বক্তব্যকে। যদিও এই মেটাফরের অধিক ব্যবহারে প্রবন্ধের স্বাস্থ্যহানি ঘটে। তাছাড়া প্রবন্ধের বাক্যকে সংহত ও ঋজু করার জন্য শৈলী হবে স্বচ্ছ, সরল, পরিমিত ও নাগরিক । এসব দিক কোনো কোনো প্রবন্ধকে ঋদ্ধ করে তুলেছে। তাই আরও অনেক প্রাপ্তির প্রত্যাশায় ‘পুনর্পাঠে’র পরবর্তী সংখ্যা হাতে পেতে অধীর আগ্রহে থাকব।

 

উল্লেখপঞ্জি :

১. আব্বাস ইসলাম খান, বাংলাদেশ হোক সবার জন্য, পৃ. ১৪

২. গৌতম দাস, মনিপুরের স্বাধীনতা ও ভারত রাষ্ট্রচিন্তায় ঘাটতি, পৃ. ১৮

৩. পূর্বোক্ত, পৃ.২২

৪. রেহেনুমা আহমদ ও মানস চৌধুরী, নৃবিজ্ঞানের সহজ পাঠ, পৃ. ১৪৮

৫. এস.এম.হারুন-উর-রশীদ, মুমিনের যৌন জীবন, পৃ. ১৮

৬. ‘তোমাদের স্ত্রীদের ওপর যেমন তোমাদের অধিকার আছে, তাদেরও তেমন তোমাদের অধিকার আছে। তাদের ওপর তোমাদের অধিকার তারা তোমাদের শয্যা কলুষিত করবে না এবং প্রকাশ্যে অশালীন আচরণ করবে না।’ সিরাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইবনে ইসহাক, অনুবাদ : শহীদ আখন্দ, পৃ. ৬৯২

৭. ফাহমিদ-উর-রহমান, আশরাফ আলী থানভির আধ্যাত্মিক রাজনৈতিক চিন্তাধারা, পৃ. ৩৭

৮. সুরা শুয়ারা (আয়াত : ৮৮-৮৯) ও সুরা শামস (আয়াত :৯-১০)

৯. সুরা ফাজর (আয়াত : ২৭-২৮-২৯-৩০)

১০. ফাহমিদ-উর-রহমান, পৃ. ২৯

১১. ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ব্যবহৃত প্রতিশব্দ, পৃ. ৪৬ (মূল প্রবন্ধ)

১২. ফরীদ আহমদ রেজা,মুসলিমবিশ্বে সেক্যুলারিজমের বিভিন্ন বয়ান : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ,  পৃ. ৫৩

১৩. পূর্বোক্ত,পৃ. ৬২

Leave a Reply