জামালুদ্দিন আফগানির সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী আন্দোলন

জামালুদ্দিন আফগানির (১৮৩৯-১৮৯৭) প্রতিরোধ-আন্দোলন প্রকৃত প্রস্তাবে ইসলামি বিপ্লব-ইতিহাসের এক স্বাভাবিক ক্রম-নির্মিতি। এটা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর শেকড় প্রোথিত র‌্যাডিক্যাল ইসলামি চিন্তার মৃত্তিকায়। উদ্দেশ্য অভিন্ন। কেবল বৈচিত্র্য এসেছে নবতর যুগ-জিজ্ঞাসা, পট-পরিপ্রেক্ষিত ও সংস্কারের পদ্ধতিতে। সূচনা থেকে ইসলামি আন্দোলনের ধারাটা ক্রমবিবর্তনের মধ্য দিয়ে কীভাবে এই পর্যন্ত এলো, তা আমরা এভাবে দেখতে পারি :

প্রথম যুগে ইসলামি আন্দোলনের সর্বোচ্চ প্রয়াস ছিল দাওয়াতকে পৃথিবীর দিক-দিগন্তে ছড়িয়ে দেওয়া। ইসলামের বাণী প্রান্তে প্রান্তে ছড়িয়ে যাবার পর, উমাইয়া শাসনের সমাপ্তি-পর্ব থেকে ইসলামি আন্দোলনের গতিপথ ফিরে যায় নাস্তিক-জিন্দিকদের দমন ও প্রতিরোধের দিকে, প্রাচ্যের বিভিন্ন পৌত্তলিক ধর্ম থেকে বাহ্যিকভাবে ধর্মান্তরিত হয়ে যারা ইসলামে নতুন উপদল ও ফেরকার জন্ম দিচ্ছিল। গড়ে উঠেছিল ‘ইতিযাল’ বা বুদ্ধিবাদের মতো অন্যান্য ধারা। এক্ষেত্রে ইসলামি আন্দোলনের প্রয়াস ছিল বেদআত বা নবআবিষ্কৃত ধারা-উপধারা হতে ইসলামের মৌলিকত্বের নিরাপত্তা বিধান করা।

আব্বাসি যুগে ইসলামি আন্দোলন ব্যাপকভাবে মোকাবিলা করেছে গ্রিক-দর্শনের ক্ষতিকর দিকটার। ৬৫৬ হিজরিতে বর্বর তাতার সম্প্রদায়ের হাতে বাগদাদের পতন ঘটে। এর আনুপূর্বিককালে ইসলামি আন্দোলনের মোকাবিলা পূর্বের মতো চিন্তার যুদ্ধে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তখন সশস্ত্র মোকাবিলা করতে হয়েছে একদিকে তাতারদের, অন্যদিকে ক্রুসেডারদের। এটা ছিল বহিরাগত সংঘাত। অভ্যন্তরীণ সংঘাত যে স্তিমিত হয়ে গিয়েছিল, এমনটা ভাবারও অবকাশ নেই। তাই একই সময়ে প্রতিহত করতে হয়েছে ‘বাতেনি’ সম্প্রদায়ের বিশ্বাস ও ধ্যান-ধারণার। রোধ করতে হয়েছে বেশরা পীর-ফকিরদের তাসাউফচর্চার বাড়াবাড়ি, যারা ছিল হাল্লাজ আর ইবনে আরাবির নিপুণ অনুকারক (Assimilate), যারা আল্লাহর সঙ্গে সৃষ্টির সম্পর্ক ব্যাখ্যা করত অবতারত্বের ধারণার আলোকে। এই ত্রিমুখী ইসলামি আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. (১২৬৩-১৩২৮ খ্রি.)।

পাশ্চাত্য আধুনিকতার সূচনাকালে, উসমানি খেলাফত দুর্বল হতে হতে যখন প্রায় ভেঙে পড়ছে, তখন সবচে’ সাড়াজাগানো আন্দোলন ছিল মূলধারার ইসলামে ফিরে যাওয়ার আন্দোলন। হেজাযে, নজদে ও ভারতবর্ষে যা ‘ওহাবি’ আন্দোলন নামে খ্যাতি লাভ করেছিল। পৌত্তলিকতা, কুসংস্কারের বিরাট স্তূপের উপর লৌকিক ধর্মের যে প্রাসাদ গড়ে উঠেছিল, এই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল তা গুঁড়িয়ে দেওয়া। ইউরোপ যখন একের পর এক কথিত অনুন্নত দেশগুলোতে সাম্রাজ্যবাদ কায়েম করছিল, তখন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের অগ্রজ সেনানী ছিলেন সাইয়েদ জামালুদ্দিন আফগানি। সংকটটা ছিল রাজনৈতিক। তাই রাজনৈতিক দিক থেকেই তিনি একে প্রতিহত করতে চেয়েছেন—ধর্মীয় দিক থেকে নয়। যদিও তার আন্দোলনের মূল ভিত্তি ও প্রেরণা ছিল ইসলাম।

তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি, মুতাযিলাদের সময় ইসলামি আন্দোলনটা ছিল ধর্মতাত্ত্বিক, গ্রিক-দর্শনের উত্থানকালে বুদ্ধিবৃত্তিক। ইবনে তাইমিয়ার সময় লড়াই ছিল তাতার আর ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে, মুহাম্মদ বিন আবদুল ওহাবের সময় কুসংস্কার আর অনুকরণ-সর্বস্বতার বিরুদ্ধে। আর জামালুদ্দিন আফগানির আন্দোলন ছিল পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে।

অভ্যন্তরস্থ সংস্কার

আফগানির মূল আন্দোলন যদিও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ছিল, কিন্তু তার সেই লড়াইয়ে সফল হওয়ার জন্য তৎকালীন মুসলমানদের ঘুণে খাওয়া সমাজের সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে অভ্যন্তরীণ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা ছিল অনেক বেশি। এজন্য বেশ কিছু অবস্থান গ্রহণ করতে হয় তাকে।

১. একদিকে তিনি আওয়াজ তুলেছিলেন ‘প্যান ইসলামিজম’ অর্থাৎ সামগ্রিক মুসলিম ঐক্যের, অন্যদিকে আওবান জানিয়েছিলেন মুসলিম দেশগুলোকে, পারস্পরিক মিত্রতার ভিত্তিতে শক্তি অর্জনের।

২. বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া মুসলিম জাতি পাশ্চাত্য থেকে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, সভ্যতা-সংস্কৃতি গ্রহণ করবে, এটাতে তার কোনো আপত্তি ছিল না। বরং এটাই ছিল তার দাবি। কিন্তু তার কথা ছিল, এর ভিত্তি যেন হয় ইসলাম।

৩. তিনি প্রচণ্ড সমালোচনা করতেন ইস্তাম্বুলের সুলতান, ইরানের শাহ, মিশরের খেদিবদের। কারণ, তারা প্রজাদের চিন্তা ও বাক-স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিয়ে তাদের বৈষয়িক দিক থেকে পঙ্গু বানিয়ে রাখতে চায়। শাসনের সুনির্দিষ্ট কোনো সংবিধান প্রণয়নের পক্ষপাতি ছিলেন না তারা, যা প্রজাদের শান্তি ও সংহতির নিশ্চয়তা দিতে পারে।

৪. মুসলিম দেশগুলোতে ধর্মের বিভেদহীন মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে পারস্পরিক সুদৃঢ় সম্প্রীতি গড়ে উঠুক, এমন দাবি তুলেছিলেন আফগানি। এজন্যই তার আন্দোলনকে ঐতিহাসিকদের কেউ কেউ ‘ইসলামি আন্দোলন’ না বলে পাশ্চাত্যের বিরুদ্ধে ‘প্রাচ্যদেশীয় আন্দোলন’ বা ‘জাতীয়তাবাদী আন্দোলন’ বলতে চেয়েছেন। কিন্তু তার এই পদক্ষেপ পূর্বের ইসলামি বিজয়-ইতিহাসের কর্মনীতি থেকেই গৃহীত, যা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সামগ্রিক ঐক্যের ওপর জোর দেয়।

৫. শিয়া-সুন্নির পারস্পরিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও তিনি দ্বন্দ্ব-সংঘাতকে ছুড়ে ফেলে সম্মিলিত হবার আহবান জানিয়েছিলেন। তাহলে তৎকালীন দুটি বৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র ইরান আর ইস্তাম্বুলের মধ্যে ঐক্য গড়ে উঠবে, বিশেষত, ভারতবর্ষের মুসলিম সালতানাতের বিলুপ্তির পর।

৬. বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রে বিশেষত, ভারতে ১৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে মুসলমানদের মাঝে ধর্মহীনতা ও প্রকৃতিবাদী দর্শনের (Atheism and materialism) বিস্তার তাকে ভাবিয়ে তুলেছিল। তিনি বলেছিলেন, এই মতবাদ ভারতের মুসলমানদের বড় দুটি ভাগে বিভক্ত করে দেবে—প্রাচীনপন্থি দল ও প্রগতিশীল দল। প্রথম দল সব ধরনের সংস্কার থেকে নিজেদের গুটিয়ে রাখবে। দ্বিতীয় দল নিজেদের সর্বপ্রকার আনুগত্যকে উৎসর্গ করবে সাম্রাজ্যবাদের পদতলে। সাথে সাথে এটা বিভেদ সৃষ্টি করবে উসমানি খেলাফত ও হিন্দুস্তানের মুসলমানদের মধ্যে। যদিও তার প্রবণতা ভৌগোলিক ইসলামের সংরক্ষণের দিকে বেশি, তবে এর ব্যাপক উদ্দেশ্য ইলহাদ তথা নিরীশ্বরবাদকে রোধ করা। এজন্য তিনি মানবসমাজের জন্য ধর্মকে আবশ্যকীয় মনে করেন, সেটা যেই ধর্মই হোক না কেন। (উরওয়া, পৃ. ৪৭১, ৪৭৭)

প্রকৃতি-পূজারিদের খণ্ডন

কুরআন এমন একটি গ্রন্থ, যা প্রকৃত ইসলামি ব্যক্তিত্বকে জন্ম দিতে পারে, ঐক্যবদ্ধ করতে পারে মুসলমানদেরকে অভিন্ন প্লাটফর্মে। কুরআনের এই ভূমিকাকে সংকুচিত করতে পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদ বিভিন্ন পর্যায়ে প্রয়াস চালিয়েছে। তবে সবচে মারাত্মক ছিল মুসলমানদের আকিদায় সন্দেহ সৃষ্টির প্রয়াস। বস্তুবাদকে তিনি মুসলমানদের আকিদা-বিশ্বাসের বিরুদ্ধে প্রধান অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তার মতে, ভারতে যারা বস্তুবাদের দিকে আহবান জানাচ্ছিল, তারা জন্মগতভাবে মুসলিম হলেও প্রকৃত মুসলিম নয়। (উরওয়া, পৃ. ৪৭২, ৪৭৭)

অন্যস্থানে তিনি লিখেছেন, তার মূল উদ্দেশ্য তাদের খণ্ডন বা তাদের বিরুদ্ধে বিষোদগার নয়। একমাত্র উদ্দেশ্য, সত্যকে আপন স্থানে প্রতিস্থাপন করা। (আফগানি, পৃ. ২৮-২৯)

তার বিখ্যাত গ্রন্থ আর-রদ আলাদ দাহরিয়্যিন-এ বস্তুবাদীদের যুক্তিগুলো খণ্ডাতে তিনটি মৌলিক বিষয়ে আলোচনা করেছেন। ১. সমাজের জন্য ধর্মের প্রয়োজনীয়তা, ২. বস্তুবাদী দর্শনের প্রসারে সমাজের ক্ষতি, ৩. বিশ্বাস ও জীবনব্যবস্থা হিসেবে অন্যান্য ধর্ম ও মতবাদের ওপর ইসলামের অগ্রগণ্যতা।

জামালুদ্দিন আফগানি মনে করতেন, বিশুদ্ধ ধর্মীয় বিশ্বাস সমাজের জন্য তিনটি মৌলিক বিষয়ের নিশ্চয়তা দিতে পারে। ১. সম্ভ্রান্ততা, ২. বিশ্বস্ততা, ৩. সত্যবাদিতা। এগুলোর ব্যাখ্যায় তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। প্রথমে এগুলোর নিজস্ব প্রক্রিয়া তুলে ধরেছেন। এরপর তুলে ধরেছেন, কী কারণে বস্তুবাদের সাথে এসব উচ্চাঙ্গের গুণ একত্রে সহাবস্থান করতে পারে না; এর নিশ্চয়তা দেওয়া তো দূরের কথা। তিনি বলেছেন, “প্রকৃতি-পূজারি যে সন্দেহ প্রবণতার মধ্যে ঘুরপাক খায়, তার সাথে এক হতে পারে না বিশ্বস্ততা, সত্যবাদিতা, সাহসিকতা, উচ্চ মনোবল ইত্যাদি গুণাবলি। কারণ, মানুষের চাহিদা অপ্রতুল। তা অর্জনের জন্য সে কী পন্থা অবলম্বন করবে, তা নির্ধারণ করে দিতে পারে না বস্তু বা প্রকৃতি। সে কি তার চাহিদা অর্জনে সশস্ত্র শক্তির পথ অবলম্বন করবে? তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হবে ধ্বংস ও রক্তপাত। তাহলে কি সে তা অর্জন করতে আশ্রয় নেবে আপন সম্ভ্রান্ততার? তাহলে প্রশ্ন হলো, সম্ভ্রান্ততার সংজ্ঞা কী? এর পরিচয় নির্ণীত হয় পারিপার্শ্বিকতার প্রভাবে। ফলে তা বিভিন্ন। তাহলে রাষ্ট্র কি সেক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে? সে তো আরও অসম্ভব। কোনো কিছু ঘটে গেলে রাষ্ট্র দৃষ্টি দেয়, সম্ভাব্য ক্ষতি নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই। রাষ্ট্রের কর্তৃত্বধারীরাই বেশিরভাগ সময়ে হয় অনিষ্টের জন্মদাতা। তাহলে কি আল্লাহ ও পরকালীন জীবনে বিশ্বাস তার চাহিদাকে সঠিক পথ নির্দেশ করতে পারে? হ্যাঁ, তা-ই পারে। এক্ষেত্রে তাকে ব্যর্থ হতে দেখা যায়নি।” (আফগানি, পৃ. ৭১-৮০)

তিনি আরও বলেন, “একমাত্র ধর্ম, যদিও ধর্মে ধর্মে অনেক ভেদাভেদ আছে, তবুও সকল ধর্মই বস্তুবাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ; সভ্যতা ও মানব সমাজের জন্য উত্তম। ধর্মই সামাজিক সংহতির জন্য অধিক উপযোগী। তা পার্থিব জীবনেও মানুষকে উন্নয়নের নিশ্চয়তা দিতে পারে। ব্যক্তিগত সুখ-শান্তি এনে দিতে পারে ধর্মই। আর সেই ধর্ম যদি হয় বিশুদ্ধ আকিদা ও বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত ধর্ম, তাহলে তো তা পরকালীন অনন্ত সুখেরও কারণ হবে।” (আফগানি পৃ. ৮২-৮৩)

বস্তুবাদ ও প্রকৃতিপূজা যে মানব-সমাজের জন্য হুমকিস্বরূপ, এটা স্পষ্ট করতে তিনি ইতিহাস থেকে উপমা টেনে আনেন। প্রাচীন ও আধুনিককালে বস্তুবাদ বিভিন্ন রূপে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু সমাজের জন্য তা অমঙ্গলই ডেকে এনেছে। প্রাচীন গ্রিক-সমাজে বস্তুবাদ প্রকাশিত হয়েছিল এপিকিউরাসের (Epicurus) সুখবাদ দর্শনের মধ্য দিয়ে। পারস্যে প্রকাশিত হয়েছিল জরথ্রুস্ট-বিরোধী ইরানি দার্শনিক মাজদাকের (মৃ. ৫২৮ খ্রি.) মতবাদের মধ্য দিয়ে। মধ্যযুগে ইসলামি সমাজে বস্তুবাদ প্রকাশ পেয়েছিল বাতেনি মতবাদের (Esotericism) মধ্য দিয়ে। উত্তর-যাজকীয় ফ্রান্সে ভলতেয়ার, রুশোদের হাতে। আধুনিক ইউরোপে কম্যুনিজম আর উগ্র জাতীয়তাবাদের মধ্য দিয়ে। খেলাফতি তুরস্কে ‘আল-আসরুল জাদিদ’ (নয়াযুগ) আন্দোলনে। আধুনিক আমেরিকায় মর্মনিজমের (Mormonism) মধ্য দিয়ে। ইসলামি সমাজে বাতেনি মতবাদের ক্ষতি নিয়ে তিনি বলেছেন, “মিশরে চতুর্থ শতাব্দীতে মুসলমানদের মধ্যে যখন বাতেনি মতবাদের উদ্ভব ঘটল তখন মুসলমানদের অধঃপতনের মাত্রা ত্বরান্বিত হলো। মুসলমানদের দুর্ভাগ্যের সূচনা ক্রুসেড অথবা তাতারদের বহিরাগত আক্রমণ থেকে নয়, অভ্যন্তরীণ বাতেনিদের চিন্তাগত আক্রমণ থেকে।” (আফগানি, পৃ. ৬৭)

বাতেনিদের বিধ্বংসী আকিদাগুলো থেকে একটি হলো, তারা বলে, আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টবস্তুর উপমা ও সমতা থেকে মুক্ত। যদি আল্লাহর অস্তিত্ব থাকত, তাহলে তিনি তো সৃষ্টবস্তুর উপমা থেকে মুক্ত থাকতে পারতেন না। আর যদি তার অস্তিত্ব না-ই থাকে, তাহলে তো তিনি অস্তিত্বহীন কল্পিত বস্তুর মতো হয়ে যেতেন। সে হিসেবে তিনি অস্তিত্বশীলও নয়, অনস্তিত্বশীলও নয়। (আফগানি, পৃ. ৫৯)

ফরাসি বিপ্লব সম্পর্কে তিনি বলেছেন, “অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত ফরাসিদের মাঝে ব্যাপকভাবে ধর্মীয় প্রবণতা বিদ্যমান ছিল। যদিও সে-সমাজে পোপ পুরোহিতদের বাড়াবাড়ি ছিল, তবুও ধর্মীয় অনুশাসন সকলকে নৈতিক চর্চায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। কিন্তু ভলতেয়ার ও রুশোর লেখালেখি খ্রিষ্টবাদী সমাজকে ধর্ম ও ঈশ্বর নিয়ে উপহাস শিক্ষা দিয়েছে। লাগামহীন মুক্তচিন্তা তাদের সমাজে ধর্মীয় ব্যবস্থাকে চূর্ণ করে ফেলেছে। ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তার কেতন উড়িয়ে ফরাসি বিপ্লব সংঘটিত হয়। ধ্বস নামে নৈতিকতায়। কম্যুনিজমের বিশ্বাসগত ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে রুশো-ভলতেয়ারের ধর্মহীনতার ওপর।” (আফগানি, পৃ. ৬৩-৬৫)

এরপর পাশ্চাত্য সমাজে খ্রিষ্টবাদ ফিরিয়ে আনার প্রয়াস চালিয়ে নেপোলিয়ন-১ ততটা সফল হতে পারেননি, ইসলামের অতীত গৌরব যেমন ফিরিয়ে আনতে পারেননি সালাহুদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডকে পরাস্ত করেও। নব্যআধুনিক তুর্কি শ্রেণি সম্পর্কে তিনি বলেন, “উসমানি খেলাফতের অধীন তুর্কিদের ভেতরে পতনের অন্ধকার ঘনায়মান হয়ে আসে ইউরোপ থেকে আমদানিকৃত নব্যবস্তুবাদের সামনে কিছু রাজ-রাজড়া ও নেতৃস্থানীয়দের নতি স্বীকারের কারণে। এই সম্রাটরা মুসলমানদের সাথে গাদ্দারী করে বসে ১৮৭৭-১৮৭৮ সনে সংঘটিত তুর্কি ও রুশদের মধ্যকার শেষ যুদ্ধে। ফলে বলকান ও গ্রিসে মুসলমানদের বিদায় ঘণ্টা বেজে ওঠে। তারা নিজেদের নবযুগের সন্তান বলে আখ্যায়িত করত। তারা দাহরিয়্যা বা প্রকৃতিবাদ দর্শন দ্বারা প্রভাবিত ছিল। এজন্যই আপন জাতির ইজ্জত সম্মান তারা বিক্রি করে দিতে পেরেছে। মুসলমানদের ঐক্যে ফাটল ধরিয়ে উসমানি খেলাফতের পতনকে সম্ভাব্য করে তুলেছে তারাই।” (আফগানি, পৃ. ৬৬)

রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ধর্মহীনতা সম্পর্কে তিনি বলেন, “রাশিয়ায় প্রকাশিত সমাজতন্ত্র (Socialism), সাম্যবাদ (Communism), নাস্তিবাদের (Nihilism) উদ্দেশ্য মানুষের মানবিক স্বাভাবিকত্ব ও বৈশিষ্ট্যগুলো উঠিয়ে দেওয়া, সকলের জন্য সকল বস্তুর ব্যাপক বৈধতা দিয়ে দেওয়া, সকলকে সকল বস্তুতে অংশীদার বানানো। তাদের বক্তব্য, পৃথিবীতে যা কিছু বিদ্যমান তা প্রকৃতির দান, ভ্রাতৃত্বের সাথে সমান ভাগে ভাগ করে নিতে হবে সব। ধর্ম ও রাষ্ট্র এমন দুটি দৈত্য, যা মানুষের দুটি মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে—১. বৈধতা, ২. অংশীদারিতা। সুতরাং ধর্ম ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে ভেঙে ফেলা উচিত। এর হর্তাকর্তাদের নির্বাসনে পাঠানো দরকার। এরপর দৃষ্টি দিতে হবে সামন্তবাদী (জায়গিরদার) আর পুঁজিপতিদের দিকে। যদি তারা তাদের অবস্থান ছেড়ে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি নেমে না আসে তাহলে তাদের জন্য মৃত্যু।” (আফগানি, ৬৭-৬৮)

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা

জামালুদ্দিন আফগানির পাশ্চাত্য-বিরোধী আন্দোলনের দ্বিতীয় অংশ ছিল মিশর ও হিন্দুস্তানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা। ১৮৭১ মার্চ ও ১৮৭৯ আগস্টের মধ্যবর্তী সময়ে জামালুদ্দিন আফগানি মিশরে অবস্থান করছিলেন। ১৯৭৫ সনে কেভ (Cave) মিশরে আসেন আর্থিক অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য। তিনি আর্থিক তদারকির (Financial supervision) জন্য একটা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, যা থাকবে খেদিব সরকারের তত্ত্বাবধানে। এর অধীনে ১৮৭৬ সনে একটা ‘সুন্দুকুদ দাইন’ বা ঋণ তহবিল প্রতিষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রীয় ব্যয় তদারকির জন্য দ্বিপাক্ষিক রিকাবা বা মনিটরিং বডি গঠন করা হয়; এর একজন কর্তৃপক্ষ ছিলেন ইংরেজ, আরেকজন ফ্রেঞ্চ। এর অধীনেই রেলওয়ে প্রসাশন ও আলেকজান্দ্রিয়া বন্দর পরিচালনার জন্য একটা মিশ্র মন্ত্রণালয় (Mixed Ministry) গঠন করা হয়। পরবর্তীকালে আর্মেনীয় নাওবার পাশার নেতৃত্বে দ্বিপাক্ষিক রিকাবাই উন্নীত হয় মিশ্র মন্ত্রণালয়ে। এর অধীনে ছিল অর্থ মন্ত্রণালয় আর গণপূর্ত মন্ত্রণালয় (Ministry of Public Works)। প্রথমটার দায়িত্বে ছিলেন একজন ইংরেজ মন্ত্রী, দ্বিতীয়টার অধীনে ছিলেন একজন ফরাসি মন্ত্রী। রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্রিটিশ দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় ১৮৮২ সনে। অর্থাৎ, ১৮৭৯ সালে জামালুদ্দিন আফগানির মিশর ছেড়ে যাওয়ার বছর তিনেক পরে। এই সঙ্গীন সময়ে জামালুদ্দিন আফগানি স্বেচ্ছায় মিশর ছেড়ে যাননি, বরং ইংরেজ দূত মিস্টার কেভ’র পরামর্শে মিশরের শাসক তাওফিক খেদিব তাকে নির্বাসিত করে। এর দ্বারা অনুমান করা যায় যে, মিশরে ইংরেজরা তখন কতকটা পাকাপোক্ত হয়ে গিয়েছিল। মিশর থেকে আফগানিকে সরিয়ে দেবার জন্য অভিযোগ আনা হয় যে, তিনি এমন এক যুব সংগঠন গড়ে তুলছেন যা রাষ্ট্র ও ধর্ম উভয়ের জন্য ক্ষতিকর।

শুধু মিশরেই নয় ভারতীয় উপমহাদেশেও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্য আফগানি নিজ চোখে দেখেছিলেন সেখানে তিন তিনবার সফর করে। এরও পূর্বে তিনি আফগানিস্তানে ইংরেজ সরকারের রোষানলে পড়েছিলেন এবং ভারতবর্ষে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি তার প্রিয় শিষ্য মুহাম্মদ আবদুহুকে নিয়ে ‘উরওয়াতুল উসকা’ নামে একটা পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। প্রথম সংখ্যায় তিনি তার কলমের আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলেছেন মিশরে ব্রিটিশ দখলদারিত্বের চিত্র এবং সাহসের সঙ্গে এর মোকাবিলার আহবান জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “মিশরের মাটিতে যে বিপদ নেমে এসেছে, তা মুসলমানদের ঐক্যে দৃঢ়তা এনে দিয়েছে, সাহসের বল দিয়েছে তাদের অন্তরে। এর প্রভাব পুরো মুসলিম বিশ্বে পড়েছে। মিশরের মুসলমানদের মতো অভ্যন্তরীণ সংস্কার আর বহিরাগত শত্রুদের মোকাবিলার আওয়াজ তুলেছে অন্যান্য মুসলমানও। এতে অবাক হবারও কিছু নেই। কারণ, মুসলমানদের জাতি ও মিল্লাতগত ঐক্য ভাষা ও অন্যান্য সম্পর্কের অনেক ঊর্ধ্বে। যতদিন তাদের মধ্যে কুরআন পাঠ হবে ততদিন এর আলোকোজ্জ্বল মহিমাময় আয়াতগুলো নক্ষত্রের মতো তাদের পথপ্রদর্শন করবে। অতীতের স্মারক আর বর্তমানের পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে তারা গড়ে তুলবে নিজেদের ভবিষ্যতের পৃথিবী। তাদের আন্দোলন বৃথা যাবে না। তাদের আন্দোলনে যোগ দেবে বিশ্বের সকল মুসলমান। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ছিন্ন হয়ে যাবে উপনিবেশবাদের জাল।” ব্যাপকভাবে ব্রিটিশ-অধিকৃত মুসলিম দেশগুলোর ক্ষেত্রে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সহানুভূতি জেগে উঠলেও ব্যতিক্রম রয়ে যাচ্ছিল কয়েকটি দেশ। তাদের সম্পর্কে আফগানি লিখেছেন, “ঔপনিবেশিক মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে মুসলমানদের ওপর যে দুর্ভোগ নেমে এসেছে, সে-সম্পর্কে অনেক মুসলিম উদাসীন। নিজের সমস্যা নয় মনে করে তারা চূড়ান্ত নির্লিপ্ততা প্রদর্শন করছে।” (উরওয়া, পৃ. ৭৪)

এক্ষেত্রে উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “আফগানিস্তানে ব্রিটিশদের দখলদারিত্ব নিজ চোখে দেখার পরও বেলুচিস্তানের মুসলমানরা কোনো আন্দোলন বা প্রতিবাদ করছে না। তারা দীর্ঘ নীরবতা প্রদর্শন করে যাচ্ছে। আবার আফগানরাও এর ব্যতিক্রম নয়। তারা দেখছে, ইরানে কীভাবে শাহ পরিবারকে হাত করে ব্রিটিশরা আপন সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তার করছে, তবু তারা মুখ খুলতে ভীতিপ্রদ অনিশ্চয়তায় ভুগছে। মিশরে ব্রিটিশ উপনিবেশ সম্পর্কে হেজাজ বা অন্য কারো কোনো উচ্চবাচ্য নেই। এমনকি খোদ মিশরের উচ্চবিত্ত স্তরে এর ক্ষতি সম্পর্কে সচেতনতার অভাব প্রকট। বরং এর সাথে কণ্ঠ মেলানোকেই তারা নিজেদের আখের গোছানোর উত্তম পদ্ধতি মনে করছে।” (উরওয়া, পৃ. ২৩৬)

মিশরবাসীকে সম্মোধন করে তিনি বলেন, “হে মিশরীয়গণ, এটা তোমাদের দেশ। এখানে তোমাদের সম্মান। এখানে এতদিন শান্তির নিশ্চয়তা দিয়েছে তোমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস, তোমাদের শরিয়ার বিধান, তোমাদের নৈতিক শিক্ষা। এসবে আজ উপনিবেশবাদের থাবা পড়েছে, যা তোমাদের শান্তি ক্ষুণ্ণ করবে এবং নৈতিকতা নিঃশেষ করে দেবে। দুঃখের বিষয়, এখন ব্রিটিশদের প্রভাব এতটাই বিস্তৃত যে, ওয়াকফ মন্ত্রণালয়ের (Ministry of Endowments) মতো ধর্মীয় ক্ষেত্রও তাদের অধীনে পরিচালিত হয়। (উরওয়া, পৃ. ২৪৯)

এভাবেই জামালুদ্দিন আফগানি ধর্মীয় প্রেরণা দিয়ে মুসলিমদের জাগাতে চেষ্টা করেন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। অনেক প্রবন্ধে তিনি এই পদ্ধতি অনুসরণ করেন। ‘উরওয়াতুল উসকা’ পত্রিকার প্রকাশই হয়েছে সাম্রাজ্যবাদ মোকাবিলার উদ্দেশ্যে। যতগুলো সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে, হিসাব করে দেখা যায়, আফগানির রচনা রয়েছে তাতে মোট ২৫টি। সবই ছিল উপনিবেশবাদের ক্রিটিকে লেখা। ১৭টি প্রবন্ধ ছিল কুরআনের ১৭টি আয়াতের বিশ্লেষণ, বাকি প্রবন্ধগুলো ছিল বিভিন্ন বিশুদ্ধ হাদিসের ব্যাখ্যা। এ থেকে বোঝা যায়, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান নিছক রাজনৈতিক ছিল না, যেমনটা ইদানিং কিছু গবেষক দাবি করে থাকেন, বরং এর ভিত্তি ছিল ধর্মের গভীরে প্রোথিত।

আর হিন্দুস্তানে ব্রিটিশ উপনিবেশের বিরোধিতায় প্রথমে তিনি মুসলিম জড়বাদী ও প্রগতিবাদীদের মোকাবিলা করেছেন, যার প্রধান গুরু ছিলেন সৈয়দ আহমাদ খান, যিনি ব্রিটিশ উপনিবেশবাদকে সহযোগিতা করা ইসলামি শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত মনে করতেন এবং যিনি ইসলামি সংস্কারের নামে এমন একটা প্রজন্ম গড়ে তুলছিলেন, যারা হবে সাম্রাজ্যবাদের সহযোগী। জামালুদ্দিন আফগানি উপমহাদেশে এসে প্রকাশ্যেই তুলে ধরতেন ব্রিটিশদের সাথে স্যার সৈয়দ আহমাদ খানের সম্পর্কের ইতিবৃত্ত। ফুটিয়ে তুলতেন ধর্ম, জাতীয়তা, অর্থনীতি ও সমাজের জন্য এর ক্ষতিকর দিক।

জড়বাদী মুসলিমদের প্রকৃত বাস্তবতা তুলে ধরার পাশাপাশি তিনি ব্রিটিশদের কদর্য চিত্রও তুলে ধরেন। তিনি মুসলমানদের সতর্ক করে লিখেছেন, “ইসলাম ধর্ম স্বভাবগত দিক থেকে ভিন জাতির অধীনতা মেনে নেওয়ার ঘোর বিরোধী। বরং আধিপত্যবাদিদের কর্তৃত্বকে অগ্রাহ্য করে তাদের থেকে মুসলমানদের ভূমিকে মুক্ত করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। তারা কি আল্লাহর প্রতিশ্রুতি ভুলে গিয়েছে, যিনি তার সৎ ও একনিষ্ঠ অনুগতদের পৃথিবীর মালিকানা দেবেন? তারা কি এটা জানে না যে, কাফেরদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও আল্লাহ বিজয় দান করবেন মুসলমানদের? আল্লাহ তায়ালা যে ক্রয় করে নিয়েছেন জান্নাতের বিনিময়ে তাদের ধন-প্রাণ, সে সম্পর্কে কি তারা উদাসীন? না, এটা হবার নয়। কারণ, ইসলামের প্রতি দৃঢ় আস্থা-বিশ্বাস আছে তাদের অন্তরে, যার সামনে তাদের ব্যক্তিগত কামনা-বাসনা-লিপ্সা নত হয়ে যায়।” (উরওয়া, পৃ. ১৩৩)

Leave a Reply