মুসলিম সমাজে ইসলামোফোবিয়া: দীন বিনির্মাণ এবং পররাষ্ট্রনীতি

শুরুতেই বুঝতে হবে, মুসলিম রাষ্ট্রে ইসলামোফোবিয়ার (Islamophobia in Muslim Majority States) যে সংজ্ঞা রয়েছে, তা প্রচলিত অর্থে বিদ্যমান ইসলামোফোবিয়ার ধারণা থেকে ভিন্ন। নয়তো এই বিশেষ প্রেক্ষাপটে যে সব ফ্যাক্টর ও বিষয় আছে তা বুঝতে পারব না। মুসলিম রাষ্ট্রে ইসলামোফোবিয়াকে সংজ্ঞায়িত করতে হলে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, এইসব রাষ্ট্রে ইসলামের শেকড় খুবই গভীর এবং আধুনিক জাতিরাষ্ট্রে ইসলামের ভূমিকা কী হবে তা নিয়ে টানাপোড়েন রয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই রাষ্ট্রগুলো উপনিবেশ-উত্তর পরিবেশে রয়েছে, যেখানে ধর্মীয় ভাবাপন্ন সমাজে সেক্যুলার সভ্য (Polity) গড়ে তোলার কোশেশ চলছে। ফলস্বরূপ, মুসলিম রাষ্ট্রে ইসলামোফবিয়া নিয়ে লেখা বেশ জটিল এবং কঠিন। কারণ তাহলে একদিকে ইসলামি উৎসসমূহের বিবিধ দার্শনিক, ধর্মতাত্ত্বিক, আইনি ও ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা করতে হয় এবং অন্যদিকে সমাজে ইসলামকে প্রবলেমেটাইজ করে ক্ষমতা দখল, ক্ষমতায় টিকে থাকা বা বহির্বিশ্বের হস্তক্ষেপকে সমর্থন দেওয়ার মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। কে ইসলামের হয়ে কথা বলবে এবং কোন ধরনের ইসলাম আধুনিক সেক্যুলার জাতি-রাষ্ট্র প্রজেক্টের সাথে সম্পৃক্ত তা-ও মুসলিম রাষ্ট্রে ইসলামোফোবিয়া নিয়ে লেখাকে আরও কঠিন করে তোলে। উত্তর-উপনিবেশ সেক্যুলার জাতি-রাষ্ট্র প্রজেক্টে ইসলাম একইসাথে মৌলিক আবার গৌণ রয়।  একটা বিষয় স্বীকার করতে চাই, যা আমার অ্যানালাইসিসের একটা সম্ভাব্য দুর্বলতা হতে পারে। তা হচ্ছে, ইসলামের বিশাল এবং জটিল ইতিহাস ও ঐতিহ্যে যে বৈচিত্র্য রয়েছে, তাকে সমুন্নত রেখে ইসলামের ঐসমস্ত বিষয় যেগুলিকে কেন্দ্র করে উপনিবেশ-উত্তর আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের পরিবেশে ইসলামকে সমস্যাসংকুল করা হচ্ছে, সেগুলো পৃথক করা অনেক সময় কনফিউশন তৈরি করতে পারে। প্রথমে এই সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করাটা হচ্ছে আসলে পাঠকদের প্রতি একটা আহবান, এই কাজের আঞ্জামে শামিল হওয়ার জন্য এবং মুসলিম রাষ্ট্রে আসলে কী হচ্ছে তার ভালো বোঝাপড়ার উপায় বাতলে দেওয়ার জন্য।

আরেকটা সাবধানতা হলো, এই কাজের পরিধি কয়েকটি রাষ্ট্র থেকে নেওয়া সিলেক্টিভ ও সীমিত সংখ্যক স্যাম্পলের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কাজেই এটা সব মুসলিম রাষ্ট্রের খুঁটিনাটি ব্যাখ্যা করতে সক্ষম নয়। কেউ যদি এই ব্যাপারটা নিয়ে ওজর-আপত্তি করেন তাহলে আমি তাদের আমন্ত্রণ জানাই প্রতিটি মুসলিম রাষ্ট্রের ওপর গবেষণা করে এই দুর্বলতা দূর করার। আমাদের কাজ হচ্ছে মুসলিম রাষ্ট্রে ইসলামোফোবিয়ার ধারণাকে তত্ত্ব আকারে পেশ করা। স্বীকার করছি এটা কোনো সরল-সহজ কাজ নয়। তত্ত্ব আকারে পেশ করার জন্য আমাদের শুরু করতে হবে মুসলিম রাষ্ট্রে ইসলামোফোবিয়ার সংজ্ঞা দিয়ে।

মুসলিম রাষ্ট্রে ইসলামোফোবিয়াকে আমি সংজ্ঞায়িত করি এভাবে : “আঠারো শতকের শেষ দিক থেকে চলতে থাকা ঔপনিবেশিক-ইউরোপকেন্দ্রিক আধিপত্যবাদী ডিসকোর্সের মধ্য থেকে জন্ম নেওয়া এবং বেড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সামরিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রক্রিয়া, যা উপনিবেশ-উত্তর এলিট ব্যক্তিবর্গ অনুকরণ প্রজেক্টের মাধ্যমে স্থাপন ও আত্মস্থ করেছেন—যার ফলে এই এলিটরা নিজেকে আধুনিক, সেক্যুলার, জাতীয়তাবাদী ও প্রগতিশীল মুসলিম জাতি-রাষ্ট্র প্রজেক্টের অভিভাবক গণ্য করেন কিংবা পশ্চিমা শক্তিসমূহ দ্বারা নিয়োগপ্রাপ্ত হন।”

এই সংজ্ঞা আধুনিক জাতি-রাষ্ট্র গঠন প্রজেক্টের ঐতিহাসিক পটভূমিকে আমলে নেয়। প্রাক-আধুনিক ইউরোপে চার্চই ছিল ক্ষমতার আসল কেন্দ্র। রাষ্ট্র ও চার্চের পৃথকীকরণের মাধ্যমে ইউরোপীয় রাষ্ট্র গঠনের যে অভিজ্ঞতা তাকে দুনিয়ার সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার চিন্তা থেকেই এই আধুনিক জাতি-রাষ্ট্র প্রজেক্ট।

মুসলিম রাষ্ট্রে ইসলামোফোবিয়ার একদম মূলে আছে উনিশ ও বিশ শতকের কিছু ঘটনা, যার ফলে মুসলিম এলিট সমাজ জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি হিসেবে ইসলামকে খারিজ করে এবং ইসলাম-বিরোধী আধুনিকতা ও সেক্যুলারিজমকে আপন করে নেয়। (Hourani, 1983, pp. 67-193; Kuryman 2002; Asad, 2003, pp. 205-256)

উসমানীয়দের যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজয় হওয়া, তাদের রাজ্য ক্রমসংকোচনশীল এবং ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ার ফলে ইউরোপীয় শক্তিসমূহের তুলনায় মুসলিম বিশ্ব কেন দ্রুত ক্ষমতাহারা হয়ে গেল তার মূল্যায়ন শুরু হয়। এ-সময় অনেকগুলো অপশনের একটি ছিল ইউরোপীয় বৈজ্ঞানিক কলাকৌশল ও সামরিক প্রযুক্তি ধার করা এবং আত্মস্থ করা। এই অপশনটাই উসমানীয়রা বেছে নেয়। তারা মনে করেছিল এটাই সবচে ভালো উপায় এবং এর ফলে সমাজের ইসলামি ভিত্তির কোনো ক্ষতি হবে না। প্রাথমিকভাবে এই প্রজেক্টের আওতায় জার্মান ও ফরাসি উপদেষ্টা নিয়ে আসা হয় উসমানীয় সেনাবাহিনীকে নয়া সামরিক প্রযুক্তি ও কৌশল শেখানোর জন্য। কিন্তু কিছুকাল পরেই দেখা যায়, এই প্রকল্প উসমানীয় শিক্ষাব্যবস্থাকেও ট্রান্সফর্ম করছে এবং ইউরোপায়নের এই প্রক্রিয়া ব্যুরোক্রেসির প্রতিটা শাখা-প্রশাখায় প্রবেশ করছে। উনিশ শতকের শেষ দিকে মুসলিম এলিটরা সেক্যুলার ইউরোসেন্ট্রিক জ্ঞানতত্ত্বের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এর ফলে ইসলামের প্রতি বিরূপ ভাবাপন্ন চিন্তাচেতনার উন্মেষ ঘটে (Provence, 2017, pp 6-48)।  ইসলামের অন্টোলজিকাল ও জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তিকে খারিজ করে ইউরোসেন্ট্রিক জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তিকে কবুল করার এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মুসলিম রাষ্ট্রে ইসলামোফোবিয়ার প্রাথমিক গঠন হয়। এর অর্থ এই নয় যে সুনির্দিষ্ট সামাজিক সমস্যা বিরাজ করত না। অবশ্যই সমস্যা ছিল এবং বর্তমানেও আছে। কিন্তু এই সমস্যাগুলার কারণ তালাশ করতে যে তত্ত্ব বের করা হয় (Theorization of the causalities) তা ছিল ভুল এবং এর ফলে যে সমাধানের পেছনে ছোটা হয়, তা সমস্যাকে আরও তীব্র করে তোলে।

মুসলিম রাষ্ট্রে ইসলামোফোবিয়াকে বোঝার জন্য দ্বিতীয় যে বিষয়টা আমলে নিতে হবে তা হচ্ছে ঔপনিবেশিক প্রকল্প। এই প্রকল্প স্থানীয় জনগোষ্ঠী (Native population) এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে অন্টোলজিকাল ও জ্ঞানতাত্ত্বিক অর্থের উৎস হিসেবে ইসলামের যে সম্পর্ক তাকে সমস্যায় ফেলে দেয়। ঔপনিবেশিক ও প্রাচ্যবাদী প্রকল্প মুসলিমদের চিত্রিত করে এভাবে—মুসলিমরা সহিংস, সন্ত্রাসী, বর্বর, অসভ্য, পশ্চাদপদ, একরোখা, নারী নিপীড়ক, অযৌক্তিক; তারা এমন এক তমুদ্দুন ও কালচার নিয়ে আছে, যা ধ্বংস দেখে উল্লাস করে; তারা মানবাধিকার, আবিষ্কার, অগ্রগতি, ভালোবাসা, দয়া ও কল্পনার অভাবে ভুগছে। উপনিবেশবাদের মূলে যে শুধু অধিকৃত রাজ্য ও এর সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তার করার মেকানিজমই ছিল, তা নয়; বরং উপনিবেশবাদ ছিল এমন একটা প্রকল্প, যার কেন্দ্রে ছিল উপনিবেশ-অধ্যুষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে হীনমন্যতার ধারণা (Internalized sense of inferiority) তৈরি করা এবং ইউরোপকেন্দ্রিক জ্ঞানতত্ত্বের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করা (Grosfoguel and Mielants, 2006)। যার ফলে বর্ণ, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয়—সকল ক্ষেত্রে উপনিবেশবাদ অধ্যুষিত জনগোষ্ঠীর নীচতা এবং উপনিবেশ স্থাপনকারীর শ্রেষ্ঠত্ব তৈরি করে।  এ প্রসঙ্গে পরে আমি আরও বিস্তারিত আলোচনা করব।

আমি বলছি না যে কলোনিয়ালিজমই একমাত্র ফ্যাক্টর। বরং এর উল্টাটাই সত্য। নানান ফ্যাক্টর মুসলিম বিশ্বের কালেক্টিভ ডিস্কোর্সে প্রভাব ফেলেছে। এই ফ্যাক্টরসমূহের প্রভাব আমরা লক্ষ করি আধুনিক উপনিবেশ-উত্তর জাতি-রাষ্ট্রে ইসলামের সাথে সম্পর্ক কী হবে সে প্রশ্নের মধ্য দিয়ে। ইসলামের সাথে সম্পর্ক কী হবে এই প্রশ্ন আধুনিক পোস্ট-কলোনিয়াল জাতি-রাষ্ট্রে সমসাময়িক যে সংঘাত চলছে তার একদম শুরুতেই অবস্থান করে। এই সমস্ত ফ্যাক্টরের তালিকা করলে তাতে স্থান পাবে ক্রুসেড, ইনকুইজিশন, ১৪৯২-র স্পেন থেকে উচ্ছেদ, কলোনাইজেশন, উনিশ এবং বিশ শতকের প্রথমে ইসলামি সংস্কার এবং সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন; জাতীয়তাবাদ এবং রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সামাজিক কাঠামোর ব্যাপারে আধুনিকতার দিকে ছোটার তাগিদ, অরিয়েন্টালিস্ট পতন তত্ত্ব (Decline thesis) এবং এই পতনকে উল্টে দিতে সামনে তৈরি করা নানান ‘তত্ত্ব’ ও প্রজেক্ট; স্নায়ুযুদ্ধ ও স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী কমিউনিজম-বিরোধী ও জাতীয়তাবাদ-বিরোধী বয়ানসমূহ, তেলের সন্ধান, বিশ্বায়ন; প্রাইভেটাইজেশন এবং প্রযুক্তি; সাব-সাহারা আফ্রিকা, ইয়েমেন, সোমালিয়া, ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশে আঞ্চলিক সংঘাত এবং পোস্ট-কলোনিয়াল বিভাজন; সভ্যতার সংঘাত (Clash of Civilizations) তত্ত্ব সমূহ, ইজরায়েলি-ফিলিস্তিনি সংঘাত, আরব বসন্ত, এবং সর্বশেষে (কিন্তু কোনোক্রমেই কম গুরুত্বপূর্ণ না) মুসলিমদের মধ্যে ফেরকাভিত্তিক বিভাজন। মুসলিম সমাজসমূহ এবং আধুনিক পোস্ট-কলোনিয়াল জাতি-রাষ্ট্র নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রতিটা সমাজের নিজস্ব ঐতিহাসিক বিশেষত্ব এবং বর্তমান ও ঘটমান বিষয়ে সেই ঐতিহাসিক বিশেষত্বের প্রভাবকে আমলে নিতে হবে। মুসলিম জাতি-রাষ্ট্রে ইসলামোফোবিয়ার কিছু আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এই বৈশিষ্ট্যসমূহের উৎস বুঝতে গেলে উপর্যুক্ত ফ্যাক্টরসমূহ মাথায় রাখতে হবে কারণ এই ফ্যাক্টরসমূহ বর্তমান ঘটনাপ্রবাহকে একটা জটিল উপায়ে প্রভাবিত করে। এইখানে ফ্যাক্টরের যে লিস্ট দেয়া হয়েছে তা কখনোই পূর্ণাঙ্গ না। এর বাইরে আরও ফ্যাক্টর থাকতে পারে। এমনকি এই লেখাতেও এই ফ্যাক্টরগুলির কোনো একটাকেও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব না। কিন্তু এই ফ্যাক্টরগুলি এখানে উল্লেখ করা হলো যাতে পোস্ট-কলোনিয়াল বিশ্বব্যবস্থায় মুসলিম রাষ্ট্রে ইসলামোফোবিয়ার সূচনা (Genesis) এবং তত্ত্বীয়করণ (Theorization) এর জটিল প্রকৃতিটার একটা চিত্র তুলে ধরা যায়।

মুসলিম রাষ্ট্রে ইসলামোফোবিয়া : ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট

মুসলিম রাষ্ট্রে ইসলামের ভূমিকার ব্যাপারে আমার আগ্রহ মূলত পণ্ডিতসুলভ ও বুদ্ধিবৃত্তিক তাড়না থেকে। আমি ৩০ বছরের অধিক সময় ধরে মুসলিম রাষ্ট্রে ইসলামের ভূমিকা নিয়ে কাজ করছি এবং স্রেফ সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার কারণে হুট করে আমি এ বিষয়ে মনোনিবেশ করেছি এমন না। অনস্বীকার্য যে ৯/১১ পরবর্তী সময়ে ইসলামের উপর যে বিশেষ নজর, ইসলামোফোবিয়াকে কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটেজি হিসেবে ব্যবহার করে ইসরায়েলি প্রপাগান্ডা মেশিনের ফিলিস্তিনীদের দানব আকারে উপস্থাপন (Bayian. 2015, pp. 1057-1065) এবং আরব বসন্তের পূর্বাপর ঘটনাসমূহ মুসলিম রাষ্ট্রে ইসলামের দানবিকরণকে নিরীক্ষণের জোরদার তাগিদ নিয়ে এসেছে। আমি ইসলামোফোবিয়ার নিরীক্ষাকে পেশ করব তিনটা ভিন্নভিন্ন উদাহরণের মাধ্যমে। এই তিনটা উদাহরণ মুসলিম রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে ইসলামোফোবিয়ার সমস্যা যে খুব ভালোভাবেই বিদ্যমান তা নিয়ে আমার ধারণাকে পাকাপোক্ত করে। প্রতিটা উদাহরণ সমস্যার প্রেক্ষাপটকে বুঝতে সহায়তা করবে। এরপর আমরা সমস্যার কারণ নিয়ে চিন্তা করব।

প্রথম ঘটনাটা হচ্ছে মারি লা পেনের আল-আজহার গমন এবং আল-আজহার কর্তৃক তাঁকে স্বাগত জানানো। মারি লা পেন ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থি দল ফ্রেঞ্চ ন্যাশনাল ফ্রন্টের নেত্রী। লা পেনের আল-আজহার গমন মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ সমস্যার সাথে বৈশ্বিক ইসলামোফোবিয়া ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে এক ধরনের সম্পর্ক এবং স্বীকৃতি উৎপাদন করে। এই ধরনের একটা ঘটনা কেনই বা ঘটল? আর কেনই বা আল-আজহার একজন সুপরিচিত এবং প্রতিষ্ঠিত ইসলামোফোবকে স্বাগত জানালো? ফ্রেঞ্চ ন্যাশনাল ফ্রন্ট এবং মারি লা পেন অন্য আর দশজন ফরাসি দর্শনার্থীর মতো না। লা পেন ইউরোপের উগ্র-ডানপন্থিদের মধ্যেও খুবই বিষাক্ত এবং বর্ণবাদী অংশটার প্রতিনিধিত্ব করেন এবং মুসলিম-বিরোধী ও অভিবাসী-বিরোধী বয়ানসমূহের একজন সামনের সারির প্রবক্তা। আল-আজহার গমনের মুহূর্তে লা পেন ফ্রান্সের মুসলিম এবং সাব-সাহারান আফ্রিকান অভিবাসীদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্য জেনোফোবিক এবং ইসলামোফোবিক আক্রমণ চালাচ্ছিলেন। লা পেনের আল-আজহার গমন এবং আল-আজহার কর্তৃক তাঁকে স্বাগত জানানো আসলে নয়া-নাৎসিবাদী উৎস থেকে উঠে আসা এবং বর্ণবাদী ও শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদী নীতির প্রবক্তা লা পেনকে গ্রহণযোগ্যতা এনে দেয় বলেই আমি মনে করি। আল-আজহার বলে ‘সকল মত ও বুদ্ধিবৃত্তিক ধারার প্রতি উদারতা ও এ সমস্ত মত ও ধারার সাথে ভালো আলোচনা এবং সমগ্র বিশ্বে মুসলিম স্বার্থকে তুলে ধরার স্বার্থে’ লা পেনের সাথে তারা বৈঠক করেছেন (Taylor, 2015)।

লা পেন নিজের দিক থেকে উক্ত বৈঠক নিয়ে টুইটারে একটা পোস্ট করেন, ‘কায়রোতে সর্বোচ্চ সুন্নি অথরিটির সাথে বৈঠক: উগ্রবাদের বিরুদ্ধে লড়তে কঠোর ঐকমত্য’। আল-আজহারের নিজস্ব প্রেস-রিলিজ বলছে বৈঠকটা ছিল ‘ইসলাম নিয়ে ভুল ধারণা ও মানসিকতা সম্পর্কিত ব্যাপারসমূহ এবং ইউরোপে কিছু মুসলিম যে চরমপন্থি আদর্শসমূহ এবং বর্ণবাদ এর কারণে ভুগছেন সেসব নিয়ে আলোচনার জন্য’। অধিকন্তু, আল-আজহারের বক্তব্য ইঙ্গিত করে যে ইসলামের ব্যাপারে লা পেনের ‘শত্রুভাবাপান্ন মতামত’ সম্পর্কেও লা পেনকে সতর্ক করেন তায়েব। তায়েবের মতে লা পেনের এরকম মতামত অবশ্যই ‘পর্যালোচনা করতে হবে এবং সংশোধন করতে হবে’ এবং এ ব্যাপারে ন্যাশনাল ফ্রন্টের যে অবস্থান তা নিয়ে আল-আজহারের ‘মারাত্মক আপত্তি’ আছে (Egyptian Streets, 2015)।

এটা স্পষ্ট যে বৈঠকের পর আল-আজহার এবং লা পেন দুইটা ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দেয়। দুই বক্তব্যই ড্যামেজ কন্ট্রোল করার কোশেশ করছিল, কেননা এই বৈঠকের প্রতিক্রিয়ায় ফ্রান্সের মুসলিম ও নাগরিক [নাকি সুশীল সমাজ?] খুবই নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে। ন্যাশনাল ফ্রন্ট নেতা-সমর্থকরা লা পেনের সফরকে নেতিবাচকভাবে নেয় এবং বৈঠকের ব্যাপারে নিন্দা জ্ঞাপন করে। অনুরূপভাবে, আরব গণমাধ্যমও এই বৈঠকের ব্যাপারে খুবই নেতিবাচক ছিল এবং একজন প্রধান ইসলামোফোবিক ব্যক্তিত্বকে স্বাগত জানানোতে আপত্তি জানায়। আল-আজহারে লা পেনকে স্বাগত জানানো মিশরে যে সমস্ত পরিবর্তন চলমান সেগুলিকে নির্দেশ করে, যার ফলে ঐতিহাসিক সুন্নি পাণ্ডিত্য ফরাসি ঘরোয়া বিতর্কে প্রবেশ করে। ফরাসি মুসলিম সম্প্রদায়সমূহ এবং তাদের স্ট্যাটাসকে ঘিরেই ফরাসি ঘরোয়া বিতর্ক। এই বিতর্কগুলি প্রকৃতিগতভাবে ভীষণ মাত্রায় ইসলামোফোবিক। নিশ্চিতভাবে, ন্যাশনাল ফ্রন্ট এবং এর নেত্রী লা পেন ফরাসি সমাজে মুসলিম এবং সাব-সাহারান আফ্রিকানদের ভূমিকা ও অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করে আসছে এবং অন্যদিকে অভিবাসীদের ওপর আরও নানান বিধিনিষেধ চাপানোর দাবি জানাচ্ছে। লা পেন তাঁর প্রেসিডেনশিয়াল ক্যাম্পেইনের সময়ে তাঁর গভীর জেনোফোবিক ইমেইজ থেকে উত্তরণের জন্যে একটা মুসলিম সমর্থন তালাশ করছিল এবং কোশেশ করছিল । এটা সে করেছিল মধ্য-ডান এবং সম্ভব হলে নিরপেক্ষ ভোটারদের মন জয় করার জন্য। মনে করা হচ্ছিল, আল-আজহার সফর লা পেনকে এই মনজিলে পৌঁছে দেবে এবং আরও একবার ফরাসি মুসলিমদের অবস্থানের ব্যাপারে যে বিতর্ক তাতে আল-আজহারকে ঢুকিয়ে দিতে সাহায্য করবে। ২০০৩ সালে আল-আজহার ফরাসি নেকাব নিষেধোজ্ঞার সাফাই গায় এবং একটা মত পেশ করে যা প্রস্তাবিত আইনকে সমর্থন করে এবং সে আইন ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। এই গুরুত্বপূর্ণ ফতোয়াটা দিয়েছিলেন আল-আজহারের তৎকালীন শায়েখ মোহাম্মদ সৈয়দ তানতাওয়ি। তৎকালীন ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিকোলাই সারকোজির মিশর সফরকালে তানতাওয়ি এই ফতোয়া পেশ করেন (Eltahawy, 2009)।

সারকোজি সে সময় রাষ্ট্রপতি হওয়ার দৌড়ে ছিলেন এবং ইসলামোফোবিয়া ও অভিবাসী-বিরোধী নীতিসমূহ ছিল তাঁর ক্যাম্পেইনের গুরুত্বপূর্ণ খুঁটি। আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় মুসলিমদের পক্ষ থেকে সারকোজিকে সমর্থন প্রদান করে এবং সারকোজিকে আরও ডানদিকে ঝুঁকতে অনুমোদন করে। আরও ডানদিকে ঝুঁকা সারকোজির রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যাতে সে ইসলামোফোবিয়া ও অভিবাসী-বিরোধী মনোভাবকে তাঁর পক্ষে ভোটে রূপান্তর করতে পারে। সারকোজির পদাঙ্কই লা পেন অনুসরণ করছিলেন। কিন্তু এই সময় বিতর্ক আরও গভীর। এবং ফ্রান্সে ফরাসি রাজনীতির একটা মূল অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসলামকে প্রবলেমেটাইজ করা। মিশরেও একই অবস্থা। মিশরের এই অবস্থা নিঃসন্দেহে আরব বসন্তের পূর্ব থেকেই জারি আছে।

Leave a Reply