ইসলাম ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ

ইসলাম, মুসলিম সমাজ ও ইসলামি রাষ্ট্রগুলো সূচনাকাল হতে আজ অবধি নানাবিধ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আসছে। চ্যালেঞ্জগুলোর কিছু এসেছে বহিঃশত্রুদের কাছ থেকে আর বাকিগুলো তাদের মদদপুষ্ট অভ্যন্তরীণ শত্রুদের পক্ষ হতে।

প্রাথমিকভাবে দাওয়াত দেওয়ার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ থেকে শুরু করে পরবর্তীকালে হেলেনিজম, নস্টিসিজম, নাস্তিক্যবাদ, জাতীয়তাবাদ ও অক্ষরবাদের মতো বিভিন্ন ইসলামবিরোধী চেতনাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে তাদের। ক্রুসেডার নাইটদের পরিচালিত বিভিন্ন যুদ্ধ, মামলুক ও উসমানি আমলের অনুন্নতি এবং নব্য উপনিবেশবাদের থাবা পর্যন্ত এই চ্যালেঞ্জের বিস্তৃতি। এই উপনিবেশ সময়ের ব্যাপ্তিও প্রায় দুই শতাব্দী হতে চলল, যা ইসলামি ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ ও ভয়ংকরতম চ্যালেঞ্জ ‘ক্রুসেড যুদ্ধে’র ব্যাপ্তিকাল বরাবর।

১৭৯৮ খ্রিষ্টাব্দে নেপোলিয়নের হামলার মাধ্যমে যে নব্য উপনিবেশের সূচনা হয়েছিল, তা ছিল অত্যন্ত ভয়ংকর ও বিপজ্জনক। এর পিছনে ইউরোপের উচ্চাভিলাষ শুধু লুঠতরাজ, জবরদখল, বাজার নিয়ন্ত্রণ, কাঁচামাল ও সস্তা শ্রমমূল্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। কেননা, ইসলামি বিশ্বের সাথে দীর্ঘকাল লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা থেকে তারা এই উপলব্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল যে, জনতা কোনো একসময় অবশ্যই বিদ্রোহী হয়ে উঠবে এবং দেশ ছাড়তে তাদের বাধ্য করবে। কিন্তু তাদের তো লুটপাট ও দখলবাজির এই অধ্যায় স্থায়ী রাখতে হবে। তাই তারা এমন পদক্ষেপ হাতে নিল, যা ইসলামি বিশ্বকে পরিণত করবে পশ্চিমা সভ্যতার অনুগামী, আর এর ফলেই স্থায়ী হবে অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ।

নেপোলিয়ন (১৭৬৯-১৮২১ খ্রি.) শুধু কামান নিয়ে হামলা করতে আসেননি, সঙ্গে এনেছিলেন বই-পুস্তক, মুদ্রণ যন্ত্র এবং পশ্চিমা সভ্যতার বয়ান। সে-সময় থেকেই শুরু হয় পশ্চিমাকরণের অধ্যায়; যা এই যুগে ইসলামের দিকে ছুড়ে দেওয়া সবচেয়ে ভয়ংকর চ্যালেঞ্জ। যদি আমরা পূর্বের ক্রুসেড যুদ্ধ ও আধুনিককালের যুদ্ধগুলোর তুলনা করি, তাহলে উভয়ের মধ্যকার পার্থক্য দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হবে। বুঝতে পারব এর ক্ষতিকর দিকটি আসলে কী?

১০৯৬ থেকে ১২৯১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত চলা ক্রুসেড যুদ্ধের সময়ে ইউরোপ ছিল অত্যন্ত অনগ্রসর ও অন্ধকারাচ্ছন্ন। বুদ্ধিবৃত্তির জগতে তাদের এমন কিছু ছিল না, যা আরব ও মুসলিমদের আকর্ষণ করবে। উল্টো তারা ইসলামি সভ্যতায় প্রভাবিত হয়ে পড়ে, যার দরুন এই যুদ্ধে তাদের পরাজয় বরণ করতে হয়। পরবর্তীকালে দেশে ফিরে তারা মনোযোগ দেয় উন্নতি ও উত্থানের দিকে। খ্যাতিমান ঐতিহাসিক উসামা বিন মুনকিয (১০৯৫ – ১১৮৮ খ্রি.)—যিনি অশ্বারোহী যোদ্ধা হিসেবেও খ্যাত ছিলেন—এ-ব্যাপারে সুন্দর বলেছেন: “তারা পশুর ন্যায় এদিকে ধেয়ে এসেছিল। যাদের যুদ্ধে পারঙ্গমতা ছাড়া আর কোনো বৈশিষ্ট্যই ছিল না। তারপর তারা তাদের দেশে ফিরে গেল। ইসলামি সভ্যতাকে নতুনভাবে জানল। বরং বলা যায়, তারা ইসলামি সভ্যতার শিক্ষা নিয়েই নিজেদের গ্রিক ঐতিহ্যকে আবিষ্কার করেছিল।”

তবে সম্পূর্ণ বিপরীত পরিস্থিতির দেখা মেলে ইউরোপের নব্য উপনিবেশবাদের যুদ্ধে। কেননা, এর পূর্বে ইসলামি দেশগুলো মামলুক-উসমানীয় শাসনের অন্ধকারাচ্ছন্ন এক ঘন কালো অধ্যায় অতিবাহিত করেছিল। ফলে মুসলিমগণ এমন এক সময়ে এসে পিছিয়ে পড়ল যে-সময়ে ইউরোপ উন্নতির উচ্চ শিখরে পৌঁছে যাচ্ছিল। এ কারণে উনিশ শতকজুড়ে ইউরোপ ও ইসলামের দ্বন্দ্ব যখন আরম্ভ হলো তখন পার্থক্য খুব প্রকট আকারে দৃষ্টিগোচর হলো। আর এর মাধ্যমে পশ্চিমা চিন্তাধারা ইসলামি সভ্যতা, মূল্যবোধ, জীবনাচার ও চিন্তায় প্রভাব ফেলার বড়সড় সুযোগ পেয়ে গেল।

তাদের এই সুযোগের দ্বার আরও প্রশস্ত হলো যখন মুসলিম জাতি তার উন্নত সভ্যতা ও প্রাচ্যের ঐতিহ্যের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে পশ্চিমায়নের স্রোতে নিজেদের ভাসিয়ে দিল। ফলে মুসলিমদের নিকট ইউরোপকে কাউন্টার করার মতো তখন কিছুই বাকি রইলো না। একময় খুবই বিদঘুটে পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো, যখন অশিক্ষিত ও অনুন্নত উসমানীয়দের অধীন মামলুক শাসনামলকে তুলনা করা হতে লাগলো পশ্চিমা সভ্যতার সাথে, যার রয়েছে চোখ ধাঁধানো উন্নয়ন ও অকল্পনীয় সব আবিষ্কার। এ কারণে প্রগতিশীল অনেকেই পশ্চিমা সভ্যতার অন্য কোনও বিকল্প কল্পনাই করতে পারেনি। অনেকে এটিকেই একমাত্র সভ্যতা হিসেবে বিশ্বাস করতে শুরু করে। তার নাম দেওয়া হলো ‘মানবিক সভ্যতা’, এ ছাড়া অন্য সকল সভ্যতা তাদের নিকট পরিণত হলো ‘সাময়িক ঐতিহ্য’ কিংবা ‘নামসর্বস্ব ইতিহাসে’।

নিঃসন্দেহে পশ্চিমায়নের এই ধারা ইসলাম, মুসলিম ও প্রাচ্যের অনন্য সভ্যতার জন্যে সবচেয়ে বড় ও ভয়ংকর চ্যালেঞ্জ। আর ইসলামের বিরুদ্ধে পশ্চিমায়নের এই যুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষতা হলো সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র।

এক.

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের আনাগোনা যখন প্রথম প্রথম শুরু হলো তখন অনেকেই শুধু এই কারণে প্রত্যাখ্যান করছিলেন যে, তা অন্য সভ্যতা হতে আমদানিকৃত। কেননা, তারা ‘এক সভ্যতা অন্য সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত হওয়া’র সম্ভাবনাকে অস্বীকার করেন। কিন্তু আমরা প্রত্যাখ্যান করেছিলাম ‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’ বেড়ে ওঠার প্রকৃত পরিবেশ, তার বাস্তবতা ও কারণের দিকে লক্ষ রেখে। আমরা তা আমাদের ধর্মের আলোকে বিশ্লেষণ করলাম, আমাদের ইতিহাসের সাথেও তা মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম—আসলেই কি আমাদের এই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের কোনও প্রয়োজনীয়তা আছে? ইউরোপকে এটি যেভাবে উন্নয়নের উচ্চশিখরে পৌঁছিয়েছে আমাদের ক্ষেত্রেও কি এমনটা ঘটবে? নাকি এর ফলাফল উল্টো হয়ে এটি ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে?

এ সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে আমাদের উচিত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নামক পরিভাষা নিয়ে সামান্য আলোচনা করা।

পবিত্র (Sacred), অতিপ্রাকৃত (Miracles), গির্জার অন্ধ অনুকরণ (Imitation) ইত্যাদির কাউন্টারেই মূলত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের (Secularism) উৎপত্তি। মোটকথা, মধ্যযুগের অন্ধকার অধ্যায়ে ক্যাথলিক ইউরোপে যে যাজকতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থার (Theocracy) প্রচলন ছিল তার বিরোধিতায় যে মতবাদের সৃষ্টি হয় তা-ই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। এই মতবাদে বিশ্বাসীগণ ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র, পবিত্র সমাজ ও সরকারব্যবস্থায় গির্জার প্রভাবকে অস্বীকার করে। উৎপত্তির পর থেকে তা অনুন্নত ও অন্ধকারাচ্ছন্ন ইউরোপীয় সমাজকে আলোকিত ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা রাখে। যারা ইউরোপে সেক্যুলারিজমের উৎপত্তি, মূলভাব ও ক্রমবিকাশ সম্পর্কে ধারণা রাখেন তারা জানেন যে, এর সত্যিকার কন্সেপ্ট ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে একেক চিন্তাবিদ একেক মত পোষণ করেন। কিন্তু এতসব মতানৈক্যের মধ্যেও ইউরোপীয় চিন্তায় সেক্যুলারিজমকে দুই স্তরে ভাগ করার ব্যাপারে তারা প্রায় সকলেই একমত।

প্রথম স্তর : এই স্তরে সেক্যুলারিজমের মূল উদ্দেশ্য হলো, বুর্জোয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্টার উদ্দেশ্যে রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থা থেকে ধর্ম ও গির্জাকে বিচ্ছিন্ন করা, ত্রিত্ববাদ এবং ঈসার জন্যে ঐশ্বরিক গুণ সাব্যস্তকরণের (Divine Nature) মতো অযৌক্তিক খ্রিষ্টীয় ধর্মতত্ত্বের মূলোৎপাটন করা, শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ধর্মকে ঝেটিয়ে বিদায় করে বিপরীতে স্বাধীনভাবে মানবীয় চাহিদা পূরণের সক্ষমতা প্রদান করা। ইউরোপে এর প্রতিষ্ঠাকালে বিভিন্ন দার্শনিক ও চিন্তাবিদগণ এই উদ্দেশ্যকেই সামনে রেখেছিলেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন: হোবস (১৫৮৮-১৬৭৯ খ্রি.), লুক (১৬৩২-১৭১৬ খ্রি.), লাইবনিৎস (১৬৪২-১৭১৬ খ্রি.), রুশো (১৭১২-১৭৭৮ খ্রি.), লেসিং (১৭৬৯-১৮৭১ খ্রি.)।

দ্বিতীয় স্তর : একে সংক্ষেপে ‘বিপ্লব নির্ভর সেক্যুলারিজম’ আখ্যা দেওয়া যায়। এর নেতৃত্বে ছিল ফয়েরবাখ (১৮০৪-১৮৭২ খ্রি.), মার্ক্স (১৮১৮-১৮৮৩ খ্রি.) ও লেনিনের (১৮৭০-১৯২৪ খ্রি.) মতো বিপ্লবী দার্শনিকগণ। এই স্তরে এসে সেক্যুলারিজমের মূল উদ্দেশ্যে পরিণত হলো, ধর্মের বিনাশ সাধন ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে ধর্মের প্রভাবমুক্তকরণ। প্রথমে সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিকতা ও পরবর্তীকালে কম্যুনিজম প্রতিষ্ঠা। এভাবে ধীরে ধীরে ধর্ম ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিশ্চিহ্ন করা। মোটকথা, এখানে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে পৃথক করাই একমাত্র উদ্দেশ্য নয় বরং মূল লক্ষ্য হলো, ধীরে ধীরে প্রতিটি ব্যক্তি পরিসর হতেই ধর্মকে নির্মূল করা।

এভাবেই ইউরোপে সেক্যুলারিজমের বীজ বপন করা হয়েছিল আর এভাবেই তা বিকাশ লাভ করে—অন্তত একটি চিন্তাধারা হিসেবে। অবশ্য কোথাও এর পরিপূর্ণ প্রয়োগ হয়নি। কেননা, আজও ধর্মনিরপেক্ষ ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলো ইসলামি বিশ্বের প্রতি চরম ধর্মান্ধতার আশ্রয় নেয়, তারা আমাদের দিকে ক্রুসেড যুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে তাকায়, উপনিবেশ স্থাপনের উদ্দেশ্যে খ্রিষ্টান মিশনারীদের জন্য অজস্র সম্পদ ব্যয় করে। ঠিক একইভাবে দেখা যায় কখনো কখনো ‘বিপ্লব নির্ভর সেক্যুলারিজম’ও তাদের প্রচণ্ড ধর্মবিদ্বেষী চেতনা থেকে ফিরে আসে।

দুই.

এখন ক্যাথলিক ইউরোপে প্রচলিত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের পরিভাষা সম্পর্কে কিছু আলোচনা করা যাক। যাতে সংক্ষেপে আমরা জানতে পারি ইসলাম ও মুসলিম সমাজে আদৌ এর কোনো প্রয়োজনীয়তা আছে কি না। এই ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনার আগে সংক্ষেপে কিছু বলে নিই। সেক্যুলার দার্শনিক হাওয়ার্ড বেকার (Howard Baker) ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে, “ধর্মনিরপেক্ষ (Secular) হলো পবিত্রর (Sacred) বিপরীত, এভাবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হলো ধর্মভিত্তিক বা যাজক নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রর (Theocratic State) বিপরীত, ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ হলো পবিত্র সমাজের (Sacred Society) বিপরীত।” (খ্রিষ্টান ধর্মে যাদের মূল নিয়ন্তা ধরা হতো, তাদের ‘পবিত্র সমাজ’ নামে অভিহিত করা হয়।)

কিন্তু মজার বিষয় হলো, ধর্মের যে সমস্ত টার্মের কাউন্টারে সেক্যুলারিজমের সৃষ্টি তার কোনোটিই ইসলাম ধর্মে পাওয়া যায় না। এতে যেভাবে যাজক নিয়ন্ত্রিত বা ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র নেই, তেমনিভাবে ‘পবিত্র সমাজ’ও নেই। ইসলামে ‘যাজক’ ও ‘ধর্মনিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠী’র কোনও অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। কারণ এ সব কিছুর মাধ্যমে ধর্মকে যুগোপযোগী করার প্রয়োজন ইসলামের হয় না। এই ধর্মে বান্দা ও তার প্রভুর মাঝে সম্পর্ক তৈরিতে অন্য কারও মধ্যস্থতার প্রয়োজন পড়ে না। তাই বলা যায়, ইসলামে এই পরিভাষাগুলো মোকাবিলা করতে সেক্যুলারিজমের আশ্রয় নেওয়ার কোনও প্রয়োজনীয়তা নেই। কেননা, ইসলাম ক্যাথলিক ইউরোপের ন্যায় সেই দ্বৈতবাদের সম্মুখীন হয়নি, যা ইউরোপকে বাধ্য করেছে সেক্যুলারিজমকে বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করতে।

সেক্যুলার ইউরোপীয় চিন্তাধারায় সেক্যুলারিজমের বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা আমরা আমাদের ইসলামের সাথে তুলনা করব :

প্রথমত : সুবিধাবাদ গ্রহণের ক্ষেত্রে সেক্যুলার সমাজ অন্যদের চেয়ে আলাদা। অর্থাৎ, তা সমাজের মূল্যবোধকে সম্মান জানিয়ে কল্যাণের ক্ষেত্রে বেশি মনোযোগ দেয়।

এই ক্ষেত্রে আমাদের ইসলামে কী আছে?

ইসলাম হলো সে ধর্ম (দীন) যেটি সমাজ-ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ‘নুসুস’র (কুরআন ও হাদিস) ওপর ‘মাসলাহা’কে (কল্যাণ) প্রাধান্য দেয়। এখানে বলা আছে যে, শরিয়া হলো মাকাসেদ, অর্থাৎ কল্যাণই হলো শরিয়া’র উদ্দেশ্য। একমাত্র এই ধর্মেই ভালো ও মন্দের চাবি ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে উম্মাহর হাতে। যার মাধ্যমে উম্মাহ নিজেই নির্ধারণ করবে নিজের কল্যাণ। আর আল্লাহ তায়ালা, যিনি বিধান প্রণেতা, দুনিয়া ও সামাজিক বিষয়ে উম্মাহর মতামতের ওপর বরকত দান করবেন। ইসলামের একটি প্রসিদ্ধ মূলনীতি হলো, মুসলিমগণ যেটাকে উত্তম মনে করে তা আল্লাহর নিকটও উত্তম।

দ্বিতীয়ত : সেক্যুলারিজম পরিবর্তনকে প্রমোট করে, প্রগতিশীলতাকে সাপোর্ট করে।

এই ব্যাপারে তাহলে ইসলামের অবস্থান কী?

প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলাম যেভাবে প্রগতির কথা বলে, নতুনত্বের ডাক দেয়, তা সংখ্যায় এত অধিক যে, তা ইহকালীন বিষয়কে অতিক্রম করে পরকালীন বিষয় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। আল্লাহর রাসুল সা. বলেন, “আল্লাহ তায়ালা প্রতি শতাব্দীতে এমন একজনকে পাঠাবেন যিনি তার দীনকে সংস্কার করবেন।” এই হাদিসের পর প্রগতি ও নতুনত্বের প্রতি ইসলামের অবস্থান সম্পর্কে জানতে আর কোনও কিছুরই প্রয়োজন হয় না। শিক্ষা-দীক্ষা কেন্দ্রিক ওমর ইবনে খাত্তাবের রা. একটি বক্তব্য এমন, “তোমরা তোমাদের সন্তানদের নিজেদের জ্ঞানের ওপর সীমাবদ্ধ রেখো না। কেননা, এমন যুগের জন্যে তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে যা তোমাদের যুগ হতে ব্যতিক্রম।” এই ধরনের বক্তব্য শোনার পরও কারা নতুনত্ব ও উন্নয়নের বয়ান ইসলামে খুঁজে না পাওয়ার শোকে প্রলাপ বকে!

তৃতীয়ত : সেক্যুলার সমাজ অলৌকিক ও অযৌক্তিক বিষয়-আশয় এড়িয়ে চলে।

এই ক্ষেত্রে ইসলামের কী অবস্থান?

যৌক্তিকতার পক্ষে ইসলামের অবস্থান সকলেরই জানা। এই ব্যাপারে বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা অগণিত। বরঞ্চ ইসলামে কুরআনই হলো একমাত্র অলৌকিক, অতিপ্রাকৃত, মোজেযা ও নিদর্শন; যার মাধ্যমে রাসুল সা. তাঁর জাতির উদ্দেশ্যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। কিন্তু এটি মূলত অবতীর্ণ হয়েছে, যাতে মানুষ তার মস্তিষ্ক খাটায়, এমনকি ধর্মীয় ও ইলাহী বিষয়েও এর মাধ্যমে সে সঠিক পথ খুঁজে নেয়। এমনকি নুসুসের ক্ষেত্রেও ইসলামে যৌক্তিকতার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে ও কুরআনের আয়াত একে ঘিরেই অবতীর্ণ হয়েছে।

চতুর্থত : সেক্যুলার সমাজ অন্ধ অনুকরণ, ঐতিহ্যপ্রবণতা ও রক্ষণশীলতা থেকে মুক্ত।

এই ব্যাপারে ইসলামে কী আছে?

এই পর্যায়ে গিয়ে ইসলাম সেক্যুলার সমাজ থেকে পৃথক হয়ে পড়ে এবং সেটাই হওয়া উচিত। এখন আমরা দুটি মূল্যবোধের পার্থক্য লক্ষ করি, একটি উন্নয়নশীলতাকে বাধা দেয়, এককথায় ‘পশ্চাদ্গামী’; আর অন্যটি ঐতিহ্যপ্রবণ হওয়া সত্ত্বেও ব্যক্তিপর্যায় ও সমাজব্যবস্থায় ইতিবাচক প্রভাব রাখছে। নিশ্চয় প্রথম প্রকারের মূল্যবোধকে বর্জন করা হবে তার ক্ষতিকর দিকের কারণে, এই কারণে বর্জন করা হবে না যে তা ‘ঐতিহ্যপ্রবণ’। বুঝা গেল, যদি নির্ধারণ করেই বলতে হয় তাহলে বর্জনের মানদণ্ড হলো ‘কল্যাণ’—রক্ষণশীলতা নয়। এবার বলুন, ইউরোপের সেক্যুলারগণ কি তাদের ঐতিহ্যকে এই কারণেই বর্জন করেছিল যে তা রক্ষণশীল ও ঐতিহ্যপ্রবণ? না। বরঞ্চ তারা তাদের গ্রিক ঐতিহ্যকে নবজীবন দান করেছিল, এটিকে তাদের সভ্যতার অংশে পরিণত করেছিল—যা দেখে সহজেই অনুমেয় যে তারা তাদের সমস্ত ঐতিহ্য ও রক্ষণশীলতাকে একেবারে ছুড়ে ফেলে দেয়নি।

Leave a Reply