আমরা কি নিশ্চিত সত্য অর্জন করতে পারি?

আজকের সময়ের মানুষেরা যেই সকল বিষয়ে বিস্ময়বোধ করেন, বিশেষত, যারা বুদ্ধিবৃত্তি, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান ও বিভিন্ন ধর্মের ইতিহাস সম্পর্কে পড়াশোনা করেন, তারা দেখতে পান সবাই দাবি করছে যে, তারা সত্যের সন্ধান পেয়েছে। পৃথিবীটা এমন সব মানুষে ভরা, যাদের সবার দাবি—তার ভাবনাটাই সঠিক। এবং এর ভিত্তিতে গড়ে ওঠা মতবিরাধ ও বিতর্কে আসলে কোনও পক্ষের ক্ষেত্রেই অপরাপর পক্ষের চেয়ে পৃথক কোনও বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায় না।

আমি মনে করি, এই বিস্ময় বৈধ ও বোধগম্য। কিন্তু এর মানে এ-নয় যে, তা ‘নিশ্চিত সত্য রয়েছে’—এই ভাবনার সত্যতায় কোনও প্রভাব ফেলে। কেননা, আমাদের আপত্তি হয়তো আদৌ কোনও নিশ্চিত সত্য আছে কি না তা নিয়ে হবে, নয়তো সেই নিশ্চিত সত্য জানা সম্ভব কি না সে-বিষয়ে হবে। দ্বিতীয়টার মানে হলো : নিশ্চিত সত্য রয়েছে বটে, কিন্তু অবজেক্টিভলি তার মর্মজ্ঞান হাসিল করা সম্ভব নয়।

প্রথম বক্তব্য : “নিশ্চিত সত্য বলে কিছু নেই”—খোদ এই বক্তব্যের মধ্যে স্ববিরোধিতা আছে। কেননা, ‘নিশ্চিত সত্য নেই’—এই দাবিকেই তো এখানে নিশ্চিত সত্য বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, বক্তা বলতে চাচ্ছেন : কোনও বিষয়ের কোনও নিশ্চিত সত্য নেই; অথচ তিনি দাঁড়িয়েই আছেন নিজের তৈরি একটি নিশ্চিত সত্য ধারণার ওপরে যে, কোনও বিষয়ে নিশ্চিত সত্য নেই। (এ-ধরনের অজ্ঞেয়বাদীর স্ববিরোধিতায় কিছু আসে যায় না। তাদের উদ্দেশ্য, নিশ্চিত সত্যের নিশ্চিত না-থাকাকে লাজেম করা)।

দ্বিতীয় বক্তব্য : মানুষের মধ্যকার ব্যাপক মতবিরোধিতার কারণে কখনও নিশ্চিত সত্য সম্পর্কে জ্ঞান হাসিল করা সম্ভব না। বিভিন্ন ধর্মের পরিমণ্ডলে দেখা যায়, মুসলিম বিশ্বাস করেন, তিনি সত্যের ওপর আছেন, অন্যরা ভ্রান্ত পথে। খ্রিষ্টান বিশ্বাস করেন, তিনি-ই সঠিক, অন্যরা নয়। ইহুদিরও বিশ্বাস, তিনি ছাড়া অন্য কেউ সত্যের পথে নেই…ইত্যাদি। সমাজবিজ্ঞানে দেখা যায়, মার্ক্সবাদী বিশ্বাস করেন, তিনি ঠিক আছেন এবং অন্য সবাই ভুল (অবশ্য আধুনিক অনেক মার্ক্সবাদীই তাদের এভাবে সরলীকরণের বিরোধিতা করেন। মূলত তারা কোনও একটি চিন্তাগত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে অপরপক্ষের যেই সংকট তুলে ধরেন—এখানে সেই ‘অপরপক্ষের সংকট’ ও নিজপক্ষের ‘চিন্তাগত ভিত্তি’টাই সঠিক কি না তা নির্ণয়ের বিষয়টাই জরুরি)। একই কথা আধুনিক উদারপন্থিরও, এবং বাস্তববাদীরও (Realist)। পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানেও তেমন। বিদ্যালয়গুলোতেও আমরা দেখব, প্রতিটি বিদ্যালয় দাবি করছে যে, তারা যেসব টপিক অধ্যয়ন করাচ্ছে, ব্যাখ্যা-বিচারের দিক থেকে সেগুলোই সঠিক। শিক্ষার্থীরা সেগুলো ‘বিদ্যালয়ের শেখানো বিষয়’ হিসেবে অকাট্য জ্ঞান করছে। এই জায়গায় এসে একজন অনুসন্ধানকারীও একটি বিভ্রান্ত ব্যক্তির অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছেন—যিনি পরস্পরবিরোধী দলগুলোর সবার স্বপক্ষের প্রমাণগুলো দেখছেন, এবং কোনও পক্ষের প্রমাণাদির মধ্যে পৃথক কোনও প্রামাণিক বিশেষত্ব দেখছেন না। এই হয়রানিই অনুসন্ধানকারীকে বিভ্রান্ত করে দেয়। এবং একটা সময় তিনি এমন সিদ্ধান্তে আসতেই প্রশান্তি বোধ করেন যে, এই হাজার হাজার মতবিরোধের মধ্যে নিশ্চিত সত্য কোনটা তা জানাই সম্ভব না।

অনুসন্ধানকারীদের এই বিভ্রান্তি আমার সামনে দুটি কারণ স্পষ্ট করে দেয়—

প্রথমত : কোন যুক্তিটি অকাট্য (Definitive)  এবং কোন যুক্তিটি প্রত্যক্ষ প্রমাণহীন (Presumptive), তার বাছবিচার না করা।

দ্বিতীয়ত : এমন মানদণ্ড না থাকা, যার দ্বারা সঠিক চিন্তাকে ভুল থেকে আলাদা করা যায়।

বোঝা গেল, কিছু বিষয় আছে অকাট্য এবং কিছু বিষয় আনুমানিক বা প্রমাণের মুখাপেক্ষী। যেমন ধরা যাক, অর্থনৈতিক কাঠামোর আলাপ। অর্থনীতির ক্ষেত্রে যে-সকল ঘরানা আমরা দেখি এবং তাদের প্রস্তাবনা দেখি, তা সবই প্রমাণশীল; অর্থাৎ, বিভিন্ন দিক থেকে তার সঠিকতার জন্য আলাদাভাবে প্রমাণ প্রয়োজন। ঠিক তেমনই এলিয়েন কিংবা জিনের অস্তিত্ব ইত্যাদির মতো বিষয়গুলি।

অন্যদিকে কিছু বিষয় রয়েছে যা ‘একিনি’ বা অকাট্য। যেমন, ২ এর অর্ধেক ১। সমান একটি জিনিস তা অপর সমান জিনিসের বরাবর হবে। যেমন, আমি বললাম: মুহাম্মাদ সারার সমান লম্বা, আর সারা আয়েশার সমান লম্বা। সুতরাং আমরা আবশ্যিকভাবে এই নতিজায় পৌঁছবো যে, মুহাম্মদ আয়েশার সমান লম্বা। এটাই হচ্ছে একটি অকাট্য ফলাফলে পৌঁছানোর উদাহরণ, যা সেই ফলাফলের দুটি পূর্বানুমানের সত্যতার ওপর নির্ভরশীল। ফলে পূর্বানুমান দুটি যদি অকাট্যভাবে সঠিক হয়, তাহলে ফলাফলও অকাট্যভাবে সঠিক হবে বা নিশ্চিত সত্য আকারে হাজির হবে।

যুক্তিবিদ্যার সংজ্ঞায় বলা হয় যে, তা এমন উপকরণ যার সঠিক প্রয়োগ চিন্তাকে ভুলে নিপতিত হওয়া থেকে মুক্ত রাখে। এখানে একটি বিষয় খেয়াল করা জরুরি যে, সংজ্ঞায় বলা হচ্ছে, চিন্তাকে বিশুদ্ধ রাখে উপকরণটির ‘সঠিক প্রয়োগ’—খোদ উপকরণ নয়। সুতরাং হতে পারে যে, কেউ যুক্তিবিদ্যা পড়েছে বটে, কিন্তু তার প্রয়োগ করেনি কিংবা করলেও সঠিকভাবে করেনি। তাহলে সে সেই ব্যক্তির মতো হলো, যে অস্ত্রধারণ করেছে কিন্তু তা সঠিকভাবে ব্যবহার করে নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি। অতএব, যে-সকল বিষয় পৃথকভাবে প্রমাণশীল সেক্ষেত্রে মতবিরোধ সম্ভব—একিনি বিষয়ে নয়।

তো এই এইসকল অকাট্য বিষয়ের কিছু নীতি ও পদ্ধতিগত ব্যবহারিকতা পাই আমরা যুক্তিবিদ্যা থেকে, যা ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা অকাট্য বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে প্রমাণশীল বিষয়কে সঠিকভাবে জানতে পারব। বুদ্ধিবৃত্তি এক্ষেত্রে মানডণ্ড হিসেবে ভূমিকা পালন করবে যে, সিদ্ধান্তগত প্রক্রিয়ায় যুক্তির ব্যবহার সঠিকভাবে হচ্ছে কি না।

সুতরাং কোনও বিষয়ে নিশ্চিত সত্যে পৌঁছানোর সিদ্ধান্তগণ প্রক্রিয়ার জন্য দুটি শর্ত—

প্রথমত : যুক্তির বস্তুগণ দিক। সেটা হচ্ছে, একটি নিশ্চিত অকাট্য ফলাফলের জন্য তার পূর্বানুমানগুলো অকাট্য হতে হবে। কেননা, অকাট্য নয় এমন পূর্বানুমানের ফলাফল কখনও অকাট্য হতে পারে না।

দ্বিতীয়ত : যুক্তির কাঠামোগত দিক। তা হলো, পূর্বানুমানগুলো এমন শৃঙ্খলায় আবদ্ধ করা, যা সেগুলোকে ফলাফলের দিকে সঠিকভাবে পৌঁছে দেবে।

তাহলে জরুরি বিষয় হচ্ছে, যুক্তি গঠিত হবে অকাট্য পূর্বানুমান সহকারে সঠিক কাঠামোর ভেতরে, যা ফলাফলকে নিশ্চিত সত্যরূপে বাস্তবায়িত করবে।

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে আমরা জানতে পারলাম, মানুষের মধ্যে যে মতবিরোধ তৈরি হয়, তার কারণ, হয়তো কিছু সম্প্রদায় তাদের বিশ্বাস প্রমাণ করতে গিয়ে যেসব পূর্বানুমান ও প্রিমিজ সামনে রাখে সেগুলো অকাট্যভাবে সত্য নয়; নয়তো পূর্বানুমানগুলো একত্র করে সঠিক কাঠামো ও পদ্ধতিতে ব্যবহারের মাধ্যমে তারা ফলাফলে পৌঁছাতে পারেনি। তাই অনুসন্ধারকারীর জন্য জরুরি হলো, প্রত্যেক ঘরানার দাবিকৃত সত্যের অবস্থানকে জানার জন্য তাদের দাবির অভ্যন্তরে প্রবেশ করে যুক্তির বস্তুগত ও কাঠামোগত সঠিকতা যাচাই করা।

Leave a Reply