‘আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র মানেই সেক্যুলার রাষ্ট্র’

পুনর্পাঠ: উপমহাদেশের সেক্যুলারদের সাথে পশ্চিমা সেক্যুলারদের পার্থক্য কী কী? সেক্যুলারিজমের উৎপত্তি কি ধর্মবিদ্বেষ থেকে হয়েছে?

ফরহাদ মজহার: ভালো প্রশ্ন। কারণ ‘সেক্যুলার’ কথাটাকে আপনি সার্বজনীন গণ্য করেননি। অবশ্যই তার দেশ-কাল-পাত্র ভেদ আছে। যদিও ‘উপমহাদেশের সেক্যুলার’ কিংবা ‘পশ্চিমা সেক্যুলার’ বলতে আপনি ঠিক কী বোঝাচ্ছেন, সেটা আরও কংক্রিট হলে বলতে সুবিধা হতো। আমরা না হয় মুখস্থই বললাম যে, সেক্যুলারিজমের মানে ধর্ম থেকে রাষ্ট্রের আলাদা হয়ে যাওয়া, কিন্তু এর মানে কী? কে কার থেকে আলাদা হলো?

শুরুতেই এটা পরিষ্কার থাকা দরকার যে ‘সেক্যুলার’, ‘সেক্যুলারিজম’, ‘সেকুলেরাইজেশান’ ইত্যাদি ধারণার উদ্ভব ও বিবর্তন প্রধানত খ্রিষ্টীয় পাশ্চাত্যে, ইউরোপ ও আমেরিকায়। এক দিক থেকে খ্রিষ্টধর্মের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থেকে নানান মজহাব বা ফেরকা মীমাংসার তাগিদ থেকে তাদের উৎপত্তি ঘটেছে। দ্বিতীয়ত: পাশ্চাত্যের আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস, বিশেষত আধুনিক জাতি-রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়ার পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে আমরা এসবের মর্ম বুঝতে পারব। অর্থাৎ বিচ্ছিন্নভাবে চার্চ, রাজনীতি বা রাষ্ট্রের খবর নিলে হবে না, পাশ্চাত্যের বৈষয়িক জীবন বা আর্থ-সামাজিক সম্পর্কের বদল ও বিবর্তনের খবরও নিতে হবে।

সেক্যুলারিজম-সংক্রান্ত আলোচনার একটা জ্ঞানতাত্ত্বিক দিকও আছে। যেমন, যেকোনও ক্রিটিকাল বা জ্ঞানতাত্ত্বিক আলোচনা কি আসলে সেক্যুলার? অর্থাৎ চিন্তা কি ধর্মের ইতিহাস কিম্বা ধর্মতত্ত্ব থেকে মুক্ত? যেমন, আধুনিক সেক্যুলার চিন্তা কি খ্রিষ্টীয় চিন্তা থেকে বিযুক্ত? কিম্বা ধরুন, কেন আমরা ইউরোপের ইতিহাস এবং ইউরোপীয় চিন্তাকে সার্বজনীন মানবেতিহাস গণ্য করি, ইউরোপে গড়ে ওঠা ধ্যান-ধারণাকে সার্বজনীন গণ্য করি? আমেরিকা বা ইউরোপ কি আদতে রোমান-গ্রিক-খ্রিষ্টীয় ইতিহাস না? তাই সেক্যুলারিজম বিষয়টাকে আমরা যত সরল মনে করি, অত সিধা না। খ্রিষ্টীয় পাশ্চাত্যে গির্জার বিরুদ্ধে জনগণের, বিশেষত কৃষকদের জমির মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব এই ক্ষেত্রে নির্ধারক ভূমিকা রেখেছে। জার্মানির কৃষকদের লড়াইয়ের (১৫২৪-১৫২৫) কথা আমরা জানি। মার্টিন লুথার (১৪৮৩-১৫৪৬) কিম্বা টমাস মুনৎজের (১৪৮৯-১৫২৫) ইতিহাস পড়লে সেটা বুঝব। ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের লেখা ‘জর্মনির কৃষক যুদ্ধ’ নামক কেতাবে কৃষকযুদ্ধের আলোচনা আছে। তাহলে পাশ্চাত্য সেক্যুলারিজমের সঙ্গে উপমহাদেশীয় সেক্যুলারিজমের পার্থক্য বুঝতে হলে ভূমি মালিকানা ব্যবস্থা রূপান্তরের তর্কও চলে আসবে। পাশ্চাত্যে গির্জার বিরুদ্ধে লড়াই হলো, গির্জার হাতে কেন্দ্রীভূত রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিনিয়ে নেওয়া জরুরি হয়ে পড়ল। কিন্তু আমাদের এখানে মন্দির বা মসজিদের ইতিহাস ভিন্ন। ইউরোপের আর্থ-সামাজিক সম্পর্কের রূপান্তরের জন্য সাধারণ মানুষ, বিশেষত কৃষক গির্জার বিরুদ্ধে লড়েছে, সেক্যুলারিজম নিয়ে আলোচনা করতে হলে এই তথ্যগুলো মনে রাখতে হবে। এটা স্রেফ ধর্ম বনাম আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব না। কিংবা রাষ্ট্র আর ধর্মের আলাদা হয়ে যাবার মতো সিম্পল ব্যাপারও না।

ফরাসি বিপ্লবের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে চার্চের ভূ-সম্পত্তিকে ‘ইহলৌকিক’ সম্পত্তিতে পরিণত করা। এটাও ‘সেক্যুলারাইজেশান’ (Secularization) বা পারলৌকিকতাকে ইহলোকিকতায় রূপান্তর। কার্যত চার্চের জমি বাজেয়াপ্ত করে তাকে জনগণের সম্পত্তিতে পরিণত করা হয়েছে। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবে জনগণের বিজয়ী অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গির্জার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার অর্থ ছিল সামন্ত শক্তির বিরুদ্ধে শোষিত নিপীড়িত জনগণের বিজয়। ফলে সেক্যুলারিজম বা সেকুলেরাইজেশানের ইতিবাচক মর্ম আছে। যেমন, সামন্ত ব্যবস্থার উৎখাত, স্বাধীন ব্যক্তির আবির্ভাব।

জনগণের বিজয় বেশি দিন টিকল না। ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হলো বুর্জোয়া শ্রেণির হাতে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বুর্জোয়া শ্রেণি গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছিল। সেই জনগণই বুর্জোয়া শ্রেণির শত্রুতে পরিণত হোল। ইসলামের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং শিক্ষণীয় দিক হলো, গির্জার সার্বভৌম ক্ষমতাই মূলত আধুনিক রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতায় রূপান্তরিত হয়েছে। আগে গির্জা রাজার মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের সার্বভৌম ক্ষমতা চর্চা করত। সেই সার্বভৌম ক্ষমতা চর্চা হতো ঈশ্বরের নামে। বুর্জোয়া শ্রেণি ঈশ্বরের জায়গায় ‘জনগণ’কে বসালো। খেয়াল করুন, আধুনিক রাষ্ট্র সার্বভৌম ক্ষমতা তৈয়ার ও প্রয়োগ করে ‘জনগণ’ নামক মিস্টেরিয়াস আধিদৈবিক শক্তির নামে। আধুনিক রাষ্ট্র আসলে খ্রিষ্টীয় ধর্মতাত্ত্বিক রাষ্ট্রেরই ধারাবাহিকতা। সার্বভৌম ক্ষমতা কাগজে কলমে তথাকথিত ‘গণতান্ত্রিক’ রাষ্ট্রের হাতে। আসলে ক্ষমতা কিন্তু বুর্জোয়া শ্রেণির হাতেই কেন্দ্রীভূত।

এভাবে ভাবলে আমরা কী শিখি? ভূমি মালিকানা, শ্রেণি, সার্বভৌমত্ব ইত্যাদির প্রশ্ন বাদ দিয়ে ইসলামের সঙ্গে সেক্যুলারিজমের বোঝাপড়া অসম্ভব। এটা নিছকই রাষ্ট্র আর ধর্মের আলাদা হবার ব্যাপার না। ইসলামের দিক থেকে সেক্যুলারিজমের সঙ্গে বোঝাবুঝি করতে হলে পাশ্চাত্য ইতিহাস ঘনিষ্ঠভাবে পর্যালোচনা করা দরকার। জিজ্ঞাসা হলো, পাশ্চাত্য হয়ে ওঠা কিংবা পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণ আদৌ আমাদের পথ কি না। এরপর রয়েছে তুলনা। যেমন, আমাদের দেশে মসজিদ, মন্দির বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কি বিশাল ভূসম্পত্তির মালিক? যদি না হয় তাহলে ধর্মের সঙ্গে আমাদের অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতির দ্বন্দ্বটা ঠিক কোথায়? কেন আমরা রাষ্ট্র আর ধর্মকে আলাদা করব? পাশ্চাত্যে ঘটেছে বলেই কি আমাদের একই কাণ্ড ঘটাতে হবে? পাশ্চাত্যের অনুকরণে আধুনিক সেক্যুলার রাষ্ট্র বানাতে হবে তার কী যুক্তি আছে?

পণ্ডিত মহলে কে কীভাবে শব্দটি কোন পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবহার করছে তা নিয়েও বিস্তর বিতর্ক আছে। যেমন ধরুন, সেক্যুলারিজম কি জ্ঞানচর্চার একটি ধরন? আমি যদি দর্শনচর্চা করি বা জ্ঞানতাত্ত্বিক বিচারে রত হই, তাহলে সত্য-মিথ্যা নির্ণয়ের সময় নিজের যুক্তি ও বুদ্ধিকে মানব? নাকি কুরআন-হাদিসে যা আছে নির্বিচার বিশ্বাস গণ্য করে তা-ই মানবো? সীমা অতিক্রম করব না। বুদ্ধির ব্যবহার কোরআন-হাদিস ব্যাখ্যার ক্ষেত্রেও আমরা করি। কিন্তু ততটুকুই যতটুকু বুদ্ধি ধর্মতত্ত্বের বা বদ্ধমূল বিশ্বাসের সীমানার মধ্যে ব্যবহৃত হয়। তারপরও প্রশ্ন আছে। ধর্মীয় মতাদর্শের পর্যালোচনার মধ্য দিয়েই পাশ্চাত্যে আধুনিক দর্শন গড়ে উঠেছে। তাকে এখন আর ধর্মতত্ত্ব না বললেও তার খ্রিষ্টীয় ভিত্তি অস্বীকার করার কোনো যুক্তি নাই। ইসলামি ধর্মতত্ত্বের পর্যালোচনাও নতুন দর্শনের কিম্বা দর্শনের নতুন দিগন্তের জন্ম দিতে পারে। হয়তো পাশ্চাত্য দর্শন মানুষ, সমাজ ও ইতিহাস-সংক্রান্ত যে সকল দার্শনিক মীমাংসা দিতে অক্ষম, ইসলামের পর্যালোচনা নতুন দার্শনিক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে এবং পাশ্চাত্যের অমীমাংসিত বিষয়ের মীমাংসা দিতে পারে। এ ছাড়া ধর্ম বনাম সেক্যুলার ভাগ করে চিন্তা করাটাও তো সমস্যার। দার্শনিক পর্যালোচনা মাত্রই কি সেক্যুলার? একালে এই তর্কগুলো আছে। দর্শন, নৃতত্ত্ব, ইতিহাস, যার যার জায়গা (সমাজতত্ত্ব) থেকেই তর্ক করছে।

জ্ঞানতাত্ত্বিক (Epistemic) আলোচনা-পর্যালোচনার বাইরে সেক্যুলারিজম নিয়ে তর্ক-বিতর্কের প্রধান ক্ষেত্র রাজনৈতিক। এই উপমহাদেশের সেক্যুলারদের সাথে পশ্চিমা সেক্যুলারদের প্রধান পার্থক্য হচ্ছে, উপমহাদেশে জ্ঞানতাত্ত্বিক বিতর্কের তুলনামূলক অভাব। আর জ্ঞানতাত্ত্বিক বিচার বাদ দিলে সেক্যুলারিজম বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতা একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ। সম্ভবত আপনার আগ্রহ সেই দিকেই। এই ক্ষেত্রে একটা সাধারণ অভিমত হচ্ছে, রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসেবে সেক্যুলারিজমের আবির্ভাব ঘটেছে পাশ্চাত্যে—ইউরো-মার্কিন সমাজ ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে। এই মতাদর্শের সারকথা হচ্ছে, আধুনিক রাষ্ট্র গঠন ও শাসনব্যবস্থা পরিচালনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র এবং ধর্মকে আলাদা হতে হবে। কিন্তু ব্যাপারটা অত সোজাও না। মধ্য যুগের খ্রিষ্টীয় রাজ্যে কিংবা ইসলামি খেলাফতেরও একটা পর্যায়ে এই ফারাক মেনে চলা হতো। এখানে সেটা ব্যাখ্যা করে বলার সুযোগ নাই। তবে একালে গুরুতর পরিবর্তন হচ্ছে এই যে, খোঁজ নিলেই আমরা বুঝব ‘সমাজ’, ‘ধর্ম’, ‘আত্মপরিচয়’, ‘জাতীয়তা’, ‘নীতিনৈতিকতা’, ‘শাসন পদ্ধতি’ ইত্যাদি সম্পর্কে আমরা এখন যে ধারণা পোষণ করি, সেইসব একান্তই আধুনিক কালের পাশ্চাত্য ধারণা—সার্বজনীন নয়। এই দিকটার ওপর আমি বিশেষভাবে জোর দিতে চাই। কারণ সেক্যুলারিজমের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বিরোধিতার চরিত্র স্রেফ মৌলবাদ বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। উচিতও নয়। ইসলামপন্থা বা ইসলাম অনুপ্রাণিত রাজনীতি বিভিন্ন মুসলিম প্রধান দেশে পাশ্চাত্য মতাদর্শ ও শাসনব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়াকে সন্দেহের চোখে দেখে। অনেকে এর কঠোর বিরোধিতা করে। এই বিরোধিতাকে প্রাচ্যের ওপর পাশ্চাত্যের আধিপত্য বিস্তারের বিরুদ্ধে অনিবার্য প্রতিরোধ হিসেবে দেখাই এই ক্ষেত্রে সঙ্গত।

Leave a Reply