ইসলামি জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে নারীর সক্রিয়তা ও উত্তরাধিকার

নারীশিক্ষা নিয়ে এদেশের মুসলিম সমাজে এখনও বিতর্ক চলছে। একদিকে সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীরা পশ্চিমের মতো করে তৃতীয় বিশ্বের সকল সমস্যার টোটকা হিসেবে নারীশিক্ষার কথা বলছেন, দোষ চাপাচ্ছেন ধর্ম ও ধর্মপ্রাণ সমাজের ঘাড়ে। অন্যদিকে এর প্রতিক্রিয়ায় নারীশিক্ষার ব্যাপারে রক্ষণশীল হয়ে উঠেছেন ঐতিহ্যবাদী মুসলিম সমাজের বড় একটি অংশ। অবশ্য তাদেরও এই শিক্ষার উপায়, প্রক্রিয়া, কারিকুলাম বা ব্যবহারিকতা সম্পর্কে পষ্ট কোনও ধারণা বা পরিকল্পনা আছে বলে মনে হয় না। পশ্চিমের ‘নারীশিক্ষা’ বিষয়ক প্রচারণা এবং মুসলিম সমাজে এর প্রতিক্রিয়ার আড়ালে, ইসলামি জ্ঞানচর্চায় নারীদের অংশগ্রহণ ও অবদানের ধারাবাহিক ইতিহাস চাপা পড়ে গেছে। এমনকি তাদের কোনও অবদান বা অবস্থান আদৌ ছিল কি না, থাকলে সেটা কেমন ছিল—এসবের একটি সাধারণ চিত্রও আমাদের ইতিহাসচর্চায় অসহনীয় মাত্রায় অনুপস্থিত। ঐতিহ্যবাদী মুসলিম সমাজে সে-ইতিহাসের খোঁজাখুঁজিও চোখে পড়ার মতো না।

এই অনুপস্থিতির কারণ কী? ভুলে গেলে চলবে না—ঠিক কোন রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষিতে ভারতবর্ষে নারীশিক্ষা-বিষয়ক তর্কগুলো শুরু হয়েছিল এবং ধীরে ধীরে বর্তমান পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। মাথায় রাখতে হবে খোদ ‘নারীশিক্ষা’ প্রপঞ্চটির সাংস্কৃতিক রাজনীতির দিকটিও। আমরা এই নিবন্ধে নারীশিক্ষা বিষয়ে উপনিবেশিক শাসনের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা, পশ্চিমের সাংস্কৃতিক রাজনীতি, ঐতিহ্যবাদী মুসলিম সমাজের অবস্থান, ইসলামে নারীর অথরিটি ও এজেন্সি, ইসলামি জ্ঞানচর্চায় নারী স্কলারদের বহুমুখী অংশগ্রহণ ও সক্রিয়তা এবং ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম নারীদের শিক্ষার বিস্মৃত ইতিহাস সংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত কয়েকটি দিক নিয়ে আলোচনা করব, যেন সামান্য হলেও ইসলামি জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে নারীর অবস্থান সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা অন্তত লাভ করা যায়।

উপনিবেশকালের অভিজ্ঞতা এবং ঐতিহ্যবাদী মুসলিম সমাজ

‘ইসলামে নারীর অবস্থান’-বিষয়ক আলোচনার মূল সমস্যাগুলোর একটি হলো, একে ইসলামি সমাজগুলোর সাম্প্রতিক উত্থান-পতন থেকে আলাদা করে চিহ্নিত করা। প্রফেসর তাজ হাশমি (জ. ১৯৪৮) ‘ইসলামে নারীর অবস্থান’র একটি সামগ্রিক মূল্যায়ন তৈরির সমস্যা নির্দেশ করতে গিয়ে লিখেছেন, “..[এক্ষেত্রে] কেবলমাত্র নারী-বিষয়ক ইসলামি আইন ও রীতিনীতির মূল্যায়নই [যথেষ্ট না]; ইসলামি ভূখণ্ডে পশ্চিমা উপনিবেশের শুরু থেকেই, মডার্নিজম ও বৈশ্বিক পুঁজিবাদের সাথে এঁটে উঠতে মুসলিম সমাজগুলোর যে অবিরাম সংগ্রাম, এবং তার ফলে সৃষ্ট উত্থান-পতন, সেগুলোর বোঝাবুঝিও [সমান জরুরি]।” ফলে ইসলামে নারীর অধিকার বা নারীশিক্ষা-বিষয়ক আলোচনায় উপনিবেশের অভিজ্ঞতা এবং উপনিবেশোত্তর মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরীণ ভাঙন ও টানাপড়েনগুলো বোঝা জরুরি।

বিখ্যাত সাইকিয়াট্রিস্ট ও উত্তর-উপনিবেশিক ভাবুক ইবরাহিম ফ্রানৎস ফাঁনো’র (মৃ. ১৯৬১) A Dying Colonialism বইটি ছাপা হয় ১৯৫৯ সালে। এই বইতে ফাঁনো দেখাতে চেয়েছিলেন, কীভাবে ঔপনিবেশিক শক্তি উপনিবেশিত সমাজের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগতি নষ্ট করার জন্য তাদের বিভিন্ন চিহ্ন ও প্রাক্টিসকে টার্গেট করে, সেগুলো বর্বর ও অনাধুনিক হিসেবে চিহ্নিত করে এবং সেসবের ঐতিহাসিক অর্জন ও ধারাবাহিকতা মুছে ফেলে নিজেদের সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়, আর এভাবে ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত পোক্ত করে। ফাঁনো এ-ও দেখিয়েছেন যে, এই কাজটি করার জন্য ঔপনিবেশিক প্রভুদের প্রধান টার্গেট হয় উপনিবেশিত সমাজের নারী। ফাঁনো মূলত ফ্রান্সের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে আলজেরিয়ার মানুষের পোশাক, বিশেষত নারীর ‘নেকাব’ নিয়ে আলোচনা করেছেন ওই বইতে। তবে পর্দা আমাদের এই লেখার আলোচ্য বিষয় না। কিন্তু অন্যান্য কথার ফাঁকে ফাঁকে বেশ কিছু গুরুতর আলাপও তুলেছেন ফাঁনো, যা এই লেখার ভূমিকার পক্ষে প্রাসঙ্গিক। আলজেরিয়ায় ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক শাসনের কৌশল চিহ্নিত করতে গিয়ে ফাঁনো বলছেন, “প্রাথমিকভাবে, উপনিবেশের সেই চিরচেনা ফর্মুলাই প্রয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, ‘আগে নারীদের জয় করো, বাকি কাজ হয়ে যাবে’।”

আলজেরিয়ান ‘নারীদের জয় করা’র জন্য মাঠে নেমেছিল তৎকালীন ফ্রান্সের বড় বড় সমাজবিজ্ঞানী আর অ্যানথ্রোপলজিস্টরা। তারা আলজেরিয়ান সমাজে মা, দাদি এবং অন্যান্য নারীদের ভূমিকার তালিকা তৈরি করে সে অনুযায়ী রণকৌশল গ্রহণ করেছিল। এবং ফাঁনো আমাদের জানাচ্ছেন, গবেষণার নামে চালানো এসব সমীক্ষা মোটেই নিরীহ কিছু ছিল না, এগুলো ছিল উপনিবেশের পলিসি, যেগুলো সমাজতাত্ত্বিক গবেষণার ছদ্মবিজ্ঞানে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল।

ফাঁনো আরও জানাচ্ছেন, এসব গবেষণার ওপর দাঁড়িয়ে ঔপনিবেশিক শক্তির প্রধান রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল: ‘আলজেরীয় সমাজের কাঠামো ভেঙে ফেলতে চাইলে এবং এর প্রতিরোধের ক্ষমতাকে গুঁড়িয়ে দিতে চাইলে প্রথমেই আমাদের জয় করতে হবে নারীদের…।’ মুসলিম নারীর শিক্ষা নিয়ে ব্রিটিশ ভারতে নানারকম বিতর্ক ও তার ফলাফল বুঝতে ফাঁনোর এই চোখা বিশ্লেষণ আমাদের কাজে লাগবে।

শিক্ষার উপনিবেশায়ন ধারণাটির সাথে এখন কমবেশি সবাই পরিচিত। ১৮৩৫ সালের ০২ ফেব্রুয়ারি, লর্ড ম্যাকলে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ভারতবর্ষের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, ইতিহাস যার গালভরা নাম দিয়েছে Minute On Education, সেই ভাষণটি উপনিবেশিত জাতির ভাষা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতি ঔপনিবেশিক শাসকের, প্রাচ্যের প্রতি পশ্চিমের, প্রভুসুলভ মানসিকতার একটি সরল উদাহরণ। পার্লামেন্টের সেই ভাষণে লর্ড ম্যাকলে বলেছিলেন: ‘আরব ও ইন্ডিয়ার সব সাহিত্যকর্ম এক করলেও ইউরোপের কোনও উন্নত লাইব্রেরির একটা শেলফের সমানও হবে না।’ ম্যাকলে আরও বলেছিলেন : “আমাদের এখন সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে এমন একটা শ্রেণি তৈরি করার জন্য, যারা আমাদের ও প্রজাদের মাঝে যোগসূত্রের কাজ করবে; এমন একটা শ্রেণি যারা রক্তে ও বর্ণে ইন্ডিয়ান হলেও রুচি, চিন্তা ও নৈতিক বুদ্ধিতে হবে ইংলিশ।”

ভাষা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ওপর উপনিবেশের এই পরিকল্পিত আগ্রাসনের ভিত্তিতেই পরবর্তীকালে এ-অঞ্চলের শিক্ষাবিষয়ক বিতর্ক ও ধারাগুলি তৈরি হয়েছিল। এই বিতর্কের ভিত্তিতেই ‘ইংরেজি শিক্ষা হারাম’ ফতোয়া দিয়েছিলেন সেইসব আলেমদের কেউ কেউ, যারা গোড়া থেকেই ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। উপমহাদেশ এবং অন্যান্য মুসলিম সমাজের মাদরাসা শিক্ষার ধারাগুলিও পশ্চিমের এই বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়ায় তৈরি হয়েছিল।

‘নারীশিক্ষা’ বা ‘নারীমুক্তি’র ইস্যুটিও একই প্রেক্ষাপটে বিবেচিত হয়েছিল সে-সময়। নারীকে জয় করার মাধ্যমে উপনিবেশিত সমাজের স্থিতি নষ্ট করে তাকে শাসনের উপযোগী করে তোলা যে ঔপনিবেশিক প্রভুদের বিশেষ এজেন্ডার অন্তর্ভুক্ত ছিল—সে ব্যাপারে উপনিবেশিত ভারতের, এমনকি আধুনিক মুসলমান চিন্তকরাও বেখবর ছিলেন না। ফলে আমরা দেখি যে, বেগম রোকেয়া (মৃ. ১৯৩২ খ্রি.) ‘উচ্চশিক্ষিত ভগ্নি’দের কটাক্ষ করে কলম ধরছেন পর্দার সংস্কৃতির পক্ষে; আলীগড় আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা স্যার সৈয়দ আহমেদ খান (মৃ. ১৮৯৮ খ্রি.) পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থার একান্ত অনুরক্ত হওয়া সত্ত্বেও নারীর শিক্ষা ও অধিকারের প্রশ্নে ঔপনিবেশিক শক্তির চিন্তাভাবনার নানারকম ক্রিটিক করছেন, নারীর শিক্ষাকে সীমিত রাখার পক্ষে মতামত দিচ্ছেন।

ব্রিটিশ আমলের পূর্বে সম্ভ্রান্ত মুসলিম নারীদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অথরিটি ও এজেন্সির ক্ষেত্রগুলি উপনিবেশকালে কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছিল এবং নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হয়েছিল তা মাথায় রাখা দরকার। মুঘল আমলে ‘আশরাফ’ মুসলমানদের ‘শরাফতি’র প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল বংশমর্যাদা। কিন্তু ব্রিটিশ পিরিয়ডে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে এই পুরাতন আশরাফদের পতন ঘটে। উত্থান হয় ‘নতুন আশরাফ’দের। এই সময়ে আশরাফ হওয়ার জন্য কোনও উচ্চবংশীয় প্রথা বা কালচারের সাথে সংযুক্ত থাকার দরকার ছিল না। বরং “সামাজিক রীতিনীতি পালন, ধর্মীয় জীবনযাপন ও আত্মনিয়ন্ত্রণ”ই ছিল এই সময়ের মুসলিম সমাজে শরাফতের লক্ষণ।

এ-সময় প্রশাসন ও জনপরিসরের কর্তৃত্ব মুসলিম আশরাফদের হাত থেকে ধীরে ধীরে ব্রিটিশদের হাতে চলে যায়। ধর্মের ‘প্রাইভেটাইজেশন’র ফলে, উলামারাও তাদের সামাজিক নেতৃত্ব হারাতে থাকেন। সামাজিকভাবে ক্ষমতাহীন ও রাজনৈতিকভাবে পরাজিত মুসলিমদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতাচর্চার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে তাদের ঘর। এবং এই প্রেক্ষিতেই “নারীর ভাষা, ধর্মপালন, শিক্ষা, সমলিঙ্গ ও বিপরীত লিঙ্গের সাথে সম্পর্ক, চলাফেরার সীমানা এবং অর্থনৈতিক কাজের সাথে সম্পৃক্ততার বিষয়গুলোর ওপর কড়া সেন্সর আরোপ করা হয়। নারীর জীবন শক্ত নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির আওতায় এসে পড়ে।” মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরীণ সংগতি ও সংহতি ধরে রাখার এবং ব্রিটিশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার জন্য নারীর নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এই প্রেক্ষিতেই মাওলানা আশরাফ আলি থানভি (মৃ. ১৯৪৩ খ্রি.) তার বেহেশতি জেওর লিখেছিলেন।

পূর্বে অভিজাত নারী পরিবার, সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে যেসব বিশেষ ভূমিকা পালন করত, এই নতুন অবস্থার প্রভাবে তাদের সেই ভূমিকায় পরিবর্তন আসে। খোজা মোলজি দেখাচ্ছেন, পূর্বে মুসলিম নারী পরিবারের শৃঙ্খলা ও শরাফতি রক্ষায় বিশেষ দায়িত্ব পালন করত। স্ত্রীর ওপর স্বামী নয়, শাশুড়ির কর্তৃত্ব ছিল বেশি। নারীর অর্থনৈতিক স্বাধিকার ও রাজনৈতিক সক্রিয়তা ছিল। অভিজাত পরিবারগুলোতে নারীদের আলাদা পরিসর ছিল; যেখানে নারীই ছিল সর্বেসর্বা—পুরুষের কোনও প্রবেশাধিকার ছিল না। সেই প্রাইভেট পরিসরে, এমনকি নিজেদের জন্য আলাদা ভাষাও তৈরি করেছিলেন নারীরা, যার নাম ‘বেগমাতি’। কিন্তু এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নারীশিক্ষা-বিষয়ক তর্ক ওঠে কলোনিয়াল ইন্ডিয়ায়। সেই তর্ককে নারীর প্রতি ঔপনিবেশিক শাসকদের বিশেষ আগ্রহ থেকে আলাদা করে দেখা হয়নি সেসময়। শিক্ষার উদ্দেশ্য, পদ্ধতি ও কারিকুলাম নিয়ে এ-সময় জোর তর্ক চলে মুসলিম সমাজে। শিক্ষার সিলেবাস ও পদ্ধতি দীনি ও দুনিয়াবি—এই দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়; এবং স্বাধীন হওয়ার পরেও আজও বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ অনেক মুসলিম রাষ্ট্রে এই সমস্যা রয়ে গেছে। ঐতিহ্যবাদী মুসলিম সমাজে পশ্চিমের ‘নারীশিক্ষা’ প্রপঞ্চটিকে কখনও স্বস্তির চোখে দেখা হয়নি। তাই এর সাংস্কৃতিক রাজনীতিটাও বোঝা দরকার।

বোডোইন কলেজের জেন্ডার, সেক্সুয়ালিটি অ্যান্ড উইমেন ডিপার্টমেন্টের সহকারী অধ্যাপক শেনিলা খোজা মোলজি তার সাম্প্রতিক বই Forging the Ideal Educated Girl: The Production of Desirable Subjects In Muslim South Asia–তে দেখিয়েছেন, ‘নারীশিক্ষা’ প্রপঞ্চটি কেবল নারীর শিক্ষা বা অধিকার প্রতিষ্ঠার মতো নিরীহ কোনও বিষয় না, বরং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি, শ্রেণি-দ্বন্দ্ব, নিওলিবারেল অর্থনীতির ভিত টিকিয়ে রাখা এবং চাহিদামাফিক প্রজা তৈরির প্রজেক্টের সাথে নারীশিক্ষার ধারণাটি অন্তরঙ্গভাবে জড়িত। পাকিস্তানে মালালা ইউসুফজাইয়ের উপরে হামলা, নাইজেরিয়ায় বোকো হারাম কর্তৃক ৩০০ স্কুলছাত্রীকে কিডন্যাপ ইত্যাদি ঘটনা এবং এসব ঘটনায় পশ্চিমা নেতা ও সংস্থাগুলির প্রতিক্রিয়া তুলে ধরে খোজা মোলজি দেখিয়েছেন—কীভাবে দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার মুসলিম সমাজের সবরকম রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাকে একসাথে গুলিয়ে একটিমাত্র সমস্যায় (নারীশিক্ষার অভাব) পরিণত করা হচ্ছে : “…আলাদা আলাদা ভিকটিম ও ঘটনা মুছে ফেলে একটিমাত্র বিমূর্ত ও সমগোত্রীয় ছবি নির্মাণ করা হচ্ছে: অধিকার, বিশেষত শিক্ষার অধিকারের জন্য লড়াইরত ‘নারী’।” তিনি আরও দেখাচ্ছেন, কীভাবে মুসলিম সমাজে নারীর প্রতি অন্যায়ের আলাদা আলাদা ঘটনাকে এর ভিন্ন ভিন্ন কনটেক্সট থেকে আলাদা করে, একটা পূর্বানুমানের ছাঁচে ফেলা হচ্ছে, যেখানে “বাদামি বা কালো মেয়েরা তাদের সমাজের পুরুষ ও পিছিয়ে পড়া সংস্কৃতি ও প্রথার বলি হচ্ছে”। আর এভাবে “…জাতি, বর্ণ বা শ্রেণির ভিন্নতা মুছে একটিমাত্র মহৎ সংকটের চিত্র আঁকা হচ্ছে—‘নারীর সংকট’।”

তাঁর গবেষণায় উঠে এসেছে, ‘সংকটাপন্ন নারী’র এই ছাঁচেফেলা গল্প এখন কাজে লাগানো হচ্ছে মুসলিম সমাজের বিরুদ্ধে, ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধ’ প্রকল্পে। ২০০১ সালে আফগানিস্তানে মার্কিন হামলার সময় তৎকালীন ফার্স্ট লেডি লরা বুশ বলেছিলেন: “সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নারীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষারও যুদ্ধ।” গালফ ওয়ারের সময়ও ইরাকে হামলার ছুঁতা হিসেবে, মুসলিম সমাজের ‘ নৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব’ প্রমাণ করতে, ‘নারীর উপর অত্যাচার’ ছিল আমেরিকান সরকার ও মিডিয়ার অন্যতম প্রধান অস্ত্র। তালেবান শাসিত সমাজে থেকেও সুলতানার মতো কোনও মেয়ের শিক্ষিত হওয়া বা গণধর্ষণের শিকার হওয়ার পরেও পাকিস্তানের মুখতার মেই’র ঘুরে দাঁড়ানো পশ্চিমা ন্যারেটিভে এসে একটা ‘অনুমেয় গল্পে’ রূপ নিচ্ছে: “মালালা, সুলতানা বা মুখতার মেই মুসলিম সমাজে নারীর প্রতি অত্যাচার এবং স্থানীয় সমাজ ও সংস্কৃতি থেকে মুক্তির প্রতীক, আর এই মুক্তির উপায় হলো নারীশিক্ষা।” এই প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত রূপটা খোজা মোলজি তুলে ধরছেন এভাবে : “তাহলে শেষমেশ বাইনারি চিত্রটা দাঁড়াচ্ছে এমন, কূপমণ্ডুক মুসলিম মেয়ে’ বনাম ‘ক্ষমতাসম্পন্ন মেয়ে’; ডেভেলপমেন্ট ও হিউম্যান স্টাডিজ থেকে সাহিত্য ও মিডিয়া—বিচিত্র সব ডিসকার্সিভ শাখার মাধ্যমে এই বাইনারিটাকে শক্তিশালী করা হয়েছে।”

পশ্চিমের নারীশিক্ষা-বিষয়ক প্রচারণার আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নারীর শিক্ষাকে নিওলিবারেল অর্থনীতির সাপেক্ষে ব্যাখ্যা করা। মোলজির ভাষায়, ‘নিও লিবারেলাইজেশন অব এডুকেশন’। বর্তমানে নারীশিক্ষা-বিষয়ক পশ্চিমা ক্যাম্পেইনগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পশ্চিমের কাছে তৃতীয় বিশ্বের নারীশিক্ষা কেবল নারীর শ্রমিক ও ভোক্তা হওয়ার সাপেক্ষেই অর্থপূর্ণ; এই ক্যাম্পেইনগুলো নারীর শিক্ষাকে বাজারচালিত অর্থনীতিতে সস্তা শ্রম উৎপাদনের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছে।

নারীশিক্ষা নামের নিরীহ এই প্রপঞ্চটি আদতে অনেক মতাদর্শিক লড়াইয়ের ক্ষেত্র। এবং বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বের নারীশিক্ষা-বিষয়ক ক্যাম্পেইনের পেছনে যে গুরুতর সাংস্কৃতিক আধিপত্যের রাজনীতি ক্রিয়াশীল, নজর চোখা করলে দেখা যাবে তা ফাঁনো’র বলা ঔপনিবেশিক প্রভুদের ‘নারীপলিসি’র চাইতে খুব আলাদা কিছু না। নারীশিক্ষা যেহেতু একদিকে জাতীয় বা আন্তর্জাতিক রাজনীতি, এমনকি পশ্চিমের ‘ওয়ার অন টেরর’ প্রকল্পেরও একটি বিনিয়োগক্ষেত্র; অন্যদিকে উপনিবেশের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে নানাভাবে জর্জরিত, ফলে এই আলাপগুলো সেরে নেওয়া দরকার ছিল। কিন্তু এটা সমস্যার একটিমাত্র দিক। সমস্যার অন্য দিকটি হলো, এই প্রশ্ন এখনও প্রবলভাবেই প্রাসঙ্গিক : মুসলিম নারীর শিক্ষার অধিকার আছে কি? থাকলে সেটি কেমন? ইসলামের মৌলিক আদর্শ কি নারীর শিক্ষার এজেন্সিকে সমর্থন করে? কতটুকু করে?

প্রশ্নগুলো প্রাসঙ্গিক, কারণ উপনিবেশ অবসানের পরে আজও নারীশিক্ষা নিয়ে মুসলিম সমাজে বিতর্ক চলমান। ব্রিটিশ আমলে ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থাকে যারা চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, সেই উলামারাও নারীশিক্ষার পন্থা ও পদ্ধতি নিয়ে কোনও ফলপ্রসূ সমাধান দিতে পারেননি৷ সেসব প্রশ্ন এখনও প্রাসঙ্গিক যেগুলো উঠেছিল উনিশ শতকের ভারতে—নারীর পড়াশোনার উদ্দেশ্য, উপায়, সিলেবাস আর কর্মক্ষেত্র কী হবে? ইসলামি শিক্ষা ও জ্ঞানের জগতে অন্তত দেশের মহিলা মাদরাসাগুলো কতটুকু অবদান রাখছে, সে প্রশ্ন তো আছেই। প্রশ্ন আছে তাদের সিলেবাস, পাঠ ও আবাসন-ব্যবস্থা নিয়েও। আর তাদের ‘দুনিয়াবি’ শিক্ষার ব্যাপারে তো আলাপ তোলাও কঠিন। এসব আমলে নিয়ে বলা যায় যে, ব্রিটিশ আমলে গড়ে ওঠা দেওবন্দসহ অন্যান্য বিকল্প ধারাগুলি পুরুষদের শিক্ষার প্রশ্নে মোটাদাগে অনেকটা সফল হলেও, মুসলিম নারীদের শিক্ষার ব্যাপারটি যথাযথ সুরাহা করতে পারেনি। এজন্যেই দক্ষিণ এশিয়ায় নারীশিক্ষার প্রশ্নটি সামাজিকভাবে মোকাবিলা করতে তারা ব্যর্থ হয়েছে।

ইসলামের শুরু থেকে আজ অবধি নারীর বিচিত্র রকম সক্রিয়তার ইতিহাস এখন আর বিশেষ চর্চিত হয় না ইসলামি মহলে। নারী-বিষয়ক বই খুঁজলে কেবল পর্দার সীমারেখা বা নারীবাদের কবল থেকে নারীকে বাঁচানোর চেষ্টা-সংবলিত বই-পুস্তক পাওয়া যায়। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, ট্রাডিশনাল মুসলিম সমাজের অনেকেই এখনও মনে করেন, নারীদের অত পড়ালেখা করা ভালো না। কেবল ‘অশিক্ষিত গ্রামের মানুষ’ই না, শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত আলেমদের অনেকেই এরকম মন্তব্য করে থাকেন। মহিলা মাদরাসার ছাত্রীদের জ্ঞানচর্চা নিয়েও সময়ে সময়ে নানা ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে, যার গোড়ার প্রশ্নটা ছিল—নারী কতটুকু শিখবে?

এই প্রবণতা ও বিতর্কের ঔপনিবেশিক গোড়া আছে, যার দিকে আমরা একটু আগেই ইঙ্গিত করেছি। কিন্তু ট্রাডিশনাল মুসলিম সমাজে এই দৃষ্টিভঙ্গি এখনও বেশ শক্তিশালী। এবং পশ্চিমের নারীশিক্ষা ধারণার বিপরীতে কার্যকরী কোনও সুরাহায় ব্যর্থ হয়ে, আলেমসমাজ বা ঐতিহ্যবাদী মুসলিম সমাজের অনেকে কিছুটা ‘নারীশিক্ষাবিরোধী’ মানসিকতায়ও বরং অভ্যস্ত হয়ে আছেন। সুতরাং আমাদের ইতিহাসের পুনর্পাঠ দরকার। তলিয়ে দেখা দরকার, নারীশিক্ষা নিয়ে ইসলামের মৌলিক প্রস্তাবনা কী? ইসলামের ইতিহাসে নারীর শিক্ষাসহ অন্যান্য অধিকারকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে? একটা মুসলিম সমাজে নারী কি উচ্চতর শিক্ষা অর্জন করতে পারে? যে-কোনও বিষয়ে পাবলিক অথরিটি হয়ে উঠতে পারে?

Leave a Reply