আখি সিরাজুদ্দিন: ত্রয়োদশ শতকের বঙ্গীয় সুফি ও ব্যাকরণবিদ

বঙ্গদেশে ইসলামের আগমন ও প্রসারে পশ্চিমাঞ্চলীয় (আরব, পারস্য, মধ্য-এশিয়া) সুফি আলেম বা বঙ্গীয় সুফি দরবেশদের নাম যেভাবে বিবৃত হয়ে আসছে, সে অনুপাতে ইসলামি শিক্ষায়তন প্রতিষ্ঠা ও শিক্ষা প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারীদের বর্ণনা খুব একটা নেই। বিশেষত ত্রয়োদশ শতকের গোড়ায় ইখতিয়ারউদ্দিন মুহাম্মদ ইবনে বখতিয়ার খিলজি বাংলাদেশে আগমনের পর থেকে ইংরেজ-পরবর্তী সময় পর্যন্ত ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্রের খুব বেশি উপাত্ত আমাদের ইতিহাসে বর্ণিত হয়নি।

কিন্তু আবির্ভাবকাল থেকেই ইসলামের বৈশিষ্ট্য হলো, ইসলাম ও মুসলিমরা যেখানে গিয়েছে সেখানেই ব্যাপকভাবে ইসলামি শিক্ষায়তন ও জ্ঞানচর্চাকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। ইসলাম আরব থেকে পারস্য, রোম ও আফ্রিকায় ছড়িয়ে যাওয়ার পর থেকে এর একটি স্বাভাবিক প্রবণতা ছিল—প্রতিটি বিজিত জনপদে অধিক হারে জ্ঞানকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা। আরব থেকে সুদূর স্পেন পর্যন্ত এর প্রভাব লক্ষণীয়।

সে-দৃষ্টিতে দেখলে বাঙলা অঞ্চলকে খানিকটা উপেক্ষিত মনে হয়। এ দেশে শত শত সুফি আলেম ও দরবেশ এসেছেন, ইতিহাসে তাদের উল্লেখ অপ্রতুল নয়। তবে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা শিক্ষা-ব্যক্তিত্বের সন্ধান বাঙলার ইতিহাসে বিরল। রাজা-বাদশাহ আর জয়-পরাজয়ের প্রতিচ্ছবি আঁকতে গিয়ে হয়তো তারা ইতিহাস থেকে বিস্মৃত হয়ে গেছেন; নয়তো বঙ্গদেশে সুফি ও দরবেশদের অতিলৌকিক প্রাচুর্য বয়ান করতে গিয়ে আড়ালে রয়ে গেছেন। অথচ তাদের স্মরণ প্রকৃত অর্থে ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করতে পারত। শায়খ আখি সিরাজুদ্দিন উসমান র. তেমন একজন।

পরিচয়ের সন্ধান

তিনি ছিলেন তৎকালীন বাঙলার রাজধানী লাখনৌতির (লক্ষ্মণাবতী) অধিবাসী, যা বিভিন্ন সময়কালে গৌড় ও পান্ডুয়া নামে অভিহিত হতো। অনেক গ্রন্থকার তাকে বাদায়ুনের অধিবাসী বলে মনে করেছেন। এ-মতের পিছনে মির্জা মুহাম্মদ আখতার দেহলবির ‘তাজকিরায়ে আউলিয়ায়ে হিন্দ’ গ্রন্থটি প্রধানতম ভূমিকা পালন করেছে। রফিকুল আরেফিন’র সংগ্রাহকের মতে, সিরাজুদ্দিন উসমান ছিলেন অযোধ্যার অধিবাসী। কিন্তু অন্যান্য অধিকতর প্রামাণ্য গ্রন্থ থেকে জানা যায়, সিরাজুদ্দিন উসমান বাঙলার অধিবাসী ছিলেন। ‘সিয়ারুল আউলিয়া’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, সিরাজুদ্দিন উসমান ছিলেন পান্ডুয়ার অধিবাসী। ‘আখবারুল আখইয়ার’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, সিরাজুদ্দিন উসমান তার পীর নিজামুদ্দিন আউলিয়ার কাছ থেকে খেলাফত লাভ করার পর লাখনৌতি অর্থাৎ গৌড়ে ফিরে যান। ‘খাজিনাতুল আসাফিয়া’র লেখক গোলাম সারওয়ারও তাকে বাঙলার অধিবাসী বলে মত প্রকাশ করেছেন।

সাইয়েদ মুহাম্মদ ইবনে মুবারক কিরমানি রচিত ‘সিয়ারুল আউলিয়া’ গ্রন্থটি ভারতীয় উপমহাদেশের আলেম, সুফি ও ইসলামি ব্যক্তিত্বের জীবনীনির্ভর সবচে পুরোনো গ্রন্থ। গ্রন্থটিকে এ অঞ্চলের প্রথম জীবনীসমগ্রও বলা যায়। এর আগে ১৩০৭ খ্রিষ্টাব্দে (৭০৭ হিজরি) আমির হোসাইন সানজারি কর্তৃক ‘ফাওয়ায়িদুল ফাওয়াদ’ নামে আরেকটি জীবনীগ্রন্থ রচিত হয়, যেটি তৎকালীন দিল্লি’র বিখ্যাত সুফি দরবেশ খাজা নিজামুদ্দিন চিশতির র. (১২৩৬-১৩২৫ খ্রি.) জীবনীভিত্তিক প্রামাণ্যগ্রন্থ। এটি নিজামুদ্দিন চিশতির জীবদ্দশায় রচনা করা হয়। ভারতবর্ষে মুসলিম ব্যক্তিত্বের জীবনীনির্ভর এটি প্রথম জীবনীগ্রন্থ হিসেবে ধরা হয়।

‘ফাওয়ায়িদুল ফাওয়াদ’ রচয়িতা আমির হোসাইন সানজারি যেমন নিজামুদ্দিন চিশতির একান্ত শিষ্য ছিলেন তেমনি সিয়ারুল আউলিয়া রচয়িতা সাইয়েদ মুহাম্মদ ইবনে মুবারক কিরমানিও তাঁর শিষ্য ছিলেন। মুহাম্মদ কিরমানি রচিত গ্রন্থের বিশেষত্ব হলো, তিনি তাঁর সময়কাল এবং পূর্ববর্তী প্রায় শতাধিক ভারতীয় আলেম ও সুফির জীবনী এখানে সন্নিবেশিত করেছেন। বিশেষ করে, নিজামুদ্দিন চিশতির অধিকাংশ খলিফার জীবনী এ গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। যেহেতু মুহাম্মদ কিরমানি ছিলেন সিরাজুদ্দিন উসমানের সমসাময়িক এবং দুজনই নিজামুদ্দিনের শিষ্যত্ব লাভে ধন্য হয়েছিলেন, সুতরাং কিরমানির বক্তব্য অধিকতর গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়।

২০১৮ সালে ভারতের আহমেদাবাদের মাদরাসায়ে আরাবিয়া আহলে সুন্নাতের শায়খুল হাদিস মুফতি আবদুল খবির আশরাফি মিসবাহি একটি স্বতন্ত্র গবেষণাগ্রন্থ রচনা করেন সিরাজুদ্দিন উসমানের জীবন ও কর্মের ওপর। ‘আয়েনায়ে হিন্দ শায়খ আখি সিরাজুদ্দিন উসমান : আহওয়াল ও আসার’ শিরোনামের গ্রন্থটি সিরাজুদ্দিন উসমানের জীবন ও কর্মের ওপর বিশদ গবেষণালব্ধ একটি গ্রন্থ। এ গ্রন্থে লেখক জামিয়া মিল্লিয়ার গবেষক গোলাম রসুল দেহলবির গবেষণা প্রবন্ধ Chishti-Nizami Sufi Order of Bengal থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন, “Shaikh Akhi Siraj, a native of Bengal, is now deemed by some modern scholars as a native of Badaun. But some contemporary evidences prove beyond doubt that the saint belonged to Bengal.”

তবে মুফতি আবদুল খবির ‘মিরআতুল আসরার’ গ্রন্থের বরাত দিয়ে লিখেছেন, সিরাজুদ্দিন উসমানের পিতা ও পিতামহ ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের অযোধ্যা থেকে হিজরত করে বাঙলায় আসেন। পরবর্তী সময়ে এখানে তার জন্ম হয়; অথবা এমনও হতে পারে, সিরাজুদ্দিনের বাল্যকালে পিতা ও পিতামহ হিজরত করে বাঙলায় আসেন। তারা কেন অযোধ্যা থেকে বাঙলায় আসেন, এর সঠিক কোনো কারণ নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। তবে সেসময়কার দিল্লি ও বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে নজর দিলে বুঝে আসবে, তখনকার ভারতীয় মুসলিমদের এক স্থান হতে অন্য স্থানে হিজরত খুব একটা অস্বাভাবিক বিষয় ছিল না। রাজনৈতিক নানা পট পরিবর্তনের দরুন এক রাজ্যের মুসলিমগণ ভাগ্যান্বেষণে আরেক রাজ্যে পাড়ি জমাতেন। হয়তো সিরাজুদ্দিন উসমানের পরিবারও ভাগ্যান্বেষণে অযোধ্যা থেকে বাঙলায় আসেন। কারণ বাঙলা তখন ধন-ঐশ্বর্যে ভারতবর্ষের অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল বিবেচিত হতো।

শায়খ আখি সিরাজুদ্দিন উসমানের ব্যক্তিপরিচয়ের ব্যাপারে আমরা আরও কিছু তথ্য পাব Proceedings of the Indian History Congress -এর প্রকাশিত জার্নালে। ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত জার্নালের ৫৬তম সংখ্যায় মুহাম্মদ কামারুদ্দিন Shaikh Alauddin PandaviÑA sufi saint of Pandua in fourteenth century শিরোনামে লিখেছেন :

Hazrat Shaikh Alauddin bin Shaikh Asad Lahori was a disciple of and spiritual successor to Hazrat Shaikh Sirajuddin Usman, better known as Hazrat Akhi Siraj and Aina-i-Hind (or Mirror of India). He was born in 701/1301 in a rich family. His father, uncles, brothers and cousins held high ranks at the court of the Sultan of Bengal. In fact his father was the Finance Minister at the Sultan’s court.5

“শায়খ আলাউদ্দিন (আলাউল হক নামে প্রসিদ্ধ) ইবনে শায়খ আসাদ লাহোরি ছিলেন শায়খ আখি সিরাজুদ্দিন উসমানের শিষ্য এবং আধ্যাত্মিক মুরিদ। তিনি আখি সিরাজ এবং আয়নায়ে হিন্দ (ভারতবর্ষের দর্পণ) নামে অধিক পরিচিত। তিনি (আলাউল হক) ৭০১ হিজরি মোতাবেক ১৩০১ খ্রিষ্টাব্দে এক সম্ভ্রান্ত ও ধনী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা, পিতৃব্য, ভাই এবং আত্মীয়রা তদানীন্তন সুলতানের (সুলতান আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহ, শাসন ১৩০১-১৩২২) দরবারে উচ্চপদে কর্মরত ছিলেন। এমনকি তার পিতা সুলতানের দরবারে অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।

জ্ঞানার্জনের জন্য দিল্লি গমন

মুফতি আবদুল খবির ‘সিয়ারুল আউলিয়া’ গ্রন্থের সূত্রে উল্লেখ করেছেন, সিরাজুদ্দিন উসমান আধ্যাত্মিক জ্ঞানার্জনের জন্য যখন দিল্লিতে নিজামুদ্দিন চিশতির দরবারে আসেন তখন তার বয়স ১৪ বছর বা কিছু কমবেশি ছিল। এ-ও বলা হয়েছে, তখন তার মুখে দাড়ি-গোঁফ গজায়নি।

খাজা নিজামুদ্দিন চিশতির দরবারে তিনি বেশ কিছুদিন আধ্যাত্মিক জ্ঞানার্জনে ব্যাপ্ত থাকেন। দিল্লিতে চিশতিয়া খানকায় অবস্থানকালে আধ্যাত্মিক উন্নয়নে কঠোর অধ্যবসায় ও মুজাহাদা চালিয়ে যান। প্রশ্ন হয়, এত অল্প বয়সে কেন তিনি আধ্যাত্মিক দীক্ষা নিতে চিশতিয়া খানকায় গেলেন? আমরা যদ্দুর বুঝতে পারি, আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য একজন শিষ্যের ন্যূনতম তরুণ হওয়া প্রয়োজন এবং তাকে ধর্মীয় প্রাথমিক জ্ঞানে পারদর্শী হতে হয়। সুতরাং মাত্র ১৪ বছর বয়সে আধ্যাত্মিক শিক্ষার জন্য কেন তিনি খাজা নিজামুদ্দিনের দরবারে হাজির হলেন—এমন প্রশ্নের উত্তর হতে পারে, নিশ্চয় তার পিতা বা পিতামহ খাজা নিজামুদ্দিনের একান্ত অনুরক্ত ছিলেন, তাই কৈশোরেই তাকে দিল্লি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। অথবা তিনি হয়তো দিল্লিতে আগমনের পূর্বে ইসলামের প্রাথমিক জ্ঞানার্জন রপ্ত করে নিয়েছিলেন। কিন্তু ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। সিয়ারুল আউলিয়াসহ অন্যান্য ইতিহাসগ্রন্থ সিরাজুদ্দিন উসমানের জ্ঞানার্জনের ব্যাপারে চমৎকার একটি ঘটনা উল্লেখ করেছে।

সমগ্র ভারতবর্ষ থেকে যে-সকল শিষ্য নিজামুদ্দিন চিশতির দরবারে জ্ঞানার্জন ও আধ্যাত্মিক সান্নিধ্যলাভের জন্য আসতেন, তিনি জ্ঞানগত গভীরতা উপলব্ধি করে তাদের খেলাফত প্রদান করে ইসলামি দাওয়াত ও তাবলিগের কাজে ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে দিতেন। সিরাজুদ্দিন উসমান কিছুদিন খাজা নিজামুদ্দিনের খানকায় অতিবাহিত করার পর তাকেও খেলাফত প্রদানের লক্ষ্যে সুলতানুল মাশায়েখ খাজা নিজামুদ্দিনের সামনে উপস্থিত করা হয়। ‘কিছুদিন’ বলতে আসলে সিরাজুদ্দিন ঠিক কতদিন সেখানে অবস্থান করেন, তার বয়স কেমন হয়েছিল এবং কী পরিমাণ আধ্যাত্মিক জ্ঞান তিনি অর্জন করেছিলেন, সে ব্যাপারে আমরা কিছু জানতে পারি না। হতে পারে এক বছর বা দুই বছর, অথবা তারচেয়েও অধিক সময় তিনি দিল্লিতে মুর্শিদের দরবারে আধ্যাত্মিক সাধনায় ব্যাপৃত ছিলেন। মুফতি আবদুল খবির ‘লাতায়েফে আশরাফি’ গ্রন্থের সূত্র উল্লেখ করে লিখেছেন, সিরাজুদ্দিন উসমান আধ্যাত্ম-সাধনার অধিকাংশ সময় মুর্শিদ খাজা নিজামুদ্দিনের সান্নিধ্যে কাটাতেন এবং কাগজ ও কিতাব ছাড়া তার কাছে আর কোনো জরুরি আসবাবপত্র ছিল না। এ থেকে বোঝা যায়, জ্ঞান ও আধ্যাত্ম-সাধনায় সিরাজুদ্দিন উসমানের প্রচেষ্টা কেমন নিবেদিত ছিল। তার পরিবার লাখনৌতির প্রভাবশালী হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিতান্ত সাদাসিধেভাবে তার দীক্ষাকাল অতিবাহিত করেন। আধ্যাত্মিক দীক্ষার জন্য নিজের ‘আমিত্ব’কে লীন করে দেওয়ার যে আবশ্যিক অনুষঙ্গ, তিনি সেটা ভালোভাবেই রপ্ত করেছিলেন।

আধ্যাত্ম-সাধনায় ব্রতী হওয়ার কিছুদিন পর যখন অন্য শিষ্যদের সঙ্গে তার নামও খেলাফত প্রদানের লক্ষ্যে তালিকাভুক্ত করে খাজা নিজামুদ্দিনের সামনে পেশ করা হয়, তখন খাজা তালিকা থেকে তার নাম বাদ দিয়ে দেন। তিনি সিরাজুদ্দিনের সার্বিক ‘হালত’ পর্যালোচনা করে মন্তব্য করেন, “খেলাফত গ্রহণের জন্য সর্বপ্রথম ইলমের পরিপূর্ণতা আবশ্যক। সিরাজুদ্দিন উসমান এখনও সে পরিমাণ প্রয়োজনীয় ইলম অর্জন করতে পারেনি।”

মুফতি আবদুল খবির তাঁর গ্রন্থে সাইয়েদ মুহাম্মদ আশরাফির বরাত দিয়ে লিখেছেন, “আধ্যাত্মিক দীক্ষায় শায়খ সিরাজুদ্দিন উসমানের ‘ইলমে লাদুন্নি’ অর্জিত হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তিনি তখনও কোনো শিক্ষকের সামনে বসে কিতাবি বিদ্যা অর্জন করেননি।”

তারিখে দাওয়াত ওয়া আজিমাত গ্রন্থে সাইয়েদ আবুল হাসান আলি নদভি রহ. বিষয়টি আরেকটু বিশদভাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি লেখেন, “বাঙলার যোগ্যতাসম্পন্ন এক তরুণ, যিনি পরবর্তী সময়ে আখি সিরাজ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেন এবং পান্ডুয়ায় চিশতিয়া খানকার বিখ্যাত আলেম হিসেবে বরিত হন, তিনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে লাখনৌতি থেকে দিল্লি আসেন। তিনি সেখানে খাজা নিজামুদ্দিনের শিষ্যত্ব লাভ করেন। পরে খাজা নিজে মাওলানা ফখরুদ্দিন জাররাদিকে বলেন, ‘এই তরুণ অনেক গুণসম্পন্ন। ধর্মীয় জ্ঞান তার দখল থাকলে সে জগদ্বিখ্যাত দরবেশ হতে পারবে।’ মাওলানা ফখরুদ্দিন বলেন, ‘আপনি যদি অনুমতি দেন তাহলে আমি আমার সান্নিধ্যে রেখে তাকে প্রয়োজনীয় ধর্মীয় জ্ঞান শিক্ষা দিতে চাই।’ খাজা বলেন, ‘সে আপনার সান্নিধ্যের যোগ্য বটে।’ জ্ঞানসাধক শায়খ ফখরুদ্দিন জাররাদি তখন সিরাজুদ্দিন উসমানের ধর্মীয় বিদ্যা শিক্ষার দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেন এবং তিনি তার মুর্শিদের সামনে গর্ব করে বলেন, ‘আমি ছয় মাসে সিরাজুদ্দিনকে প্রয়োজনীয় সকল ধর্মীয় জ্ঞানে বিদ্বান করে তুলব।’”

সিয়ারুল আউলিয়া গ্রন্থকার মুহাম্মদ ইবনে মুবারক কিরমানিও এ সময় ফখরুদ্দিন জাররাদির কাছে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করছিলেন। মুহাম্মদ কিরমানি লেখেন, “ তিনি (ফখরুদ্দিন জাররাদি) সিরাজুদ্দিন উসমানকে আরবি ভাষার প্রাথমিক ব্যাকরণ এবং সরফ ও কাওয়ায়েদের বিভিন্ন গ্রন্থ পড়াতে শুরু করেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি সিরাজুদ্দিনের মেধার তীক্ষ্ণতা লক্ষ করে তার সহজপাঠের জন্য আরবি ব্যাকরণের একটি নতুন পুস্তক রচনা করেন। যেটির নামকরণ করেন সিরাজুদ্দিন উসমানের নামে তাসরিফে উসমানি অথবা শুধু উসমানি। অল্প দিনে আরবি ভাষার প্রাথমিক জ্ঞান রপ্ত হলে শিক্ষক ফখরুদ্দিন জাররাদি সিরাজুদ্দিনকে আরেক বিখ্যাত আলেম মাওলানা রুকনুদ্দিন আন্দরপোতির হাতে সঁপে দেন। সিরাজুদ্দিন তাঁর কাছে কাফিয়া, মুফাস্সাল, কদুরি, মাজমাউল বাহরাইন এবং মাধ্যমিক স্তরের অন্যান্য প্রয়োজনীয় কিতাবাদি পাঠ করেন।”

Leave a Reply