সুফিদের নিগূঢ় কথা, কুরআনে সামগ্রিক সত্য এবং বহু অর্থ প্রসঙ্গ

কুরআনের তফসির আসলে কী? তা হলো, অহির মাধ্যমে প্রকাশিত গুপ্ত জ্ঞান বিশদভাবে অনুসন্ধান করা। কুরআন মানুষের জন্যে আল্লাহর দেওয়া পথের দিশা, যে-দিশা গভীর অর্থপূর্ণ। এই চিন্তার দিক থেকে দেখা যাচ্ছে, তফসির হলো, সুফিবাদের ফার্মেসি—যেখানে দরকারি ওষুধ পাওয়া যায়। সুফিবাদের লক্ষ্য হলো, মানুষের মনোদেশ বিশুদ্ধ করা এবং পূর্ণতা দেওয়া। কুরআনের তফসির এ লক্ষ্যে পৌঁছতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপত্র ও ওষুধ সরবরাহ করে। তাই এটা পরিষ্কার যে, সুফিবাদ বা ইসলামি মিস্টিসিজম মূলত কুরআন-নির্ভর।

জীবনের সকল বিষয়ে শিক্ষাদান করে কুরআন মানুষকে অনন্ত অসীম প্রেমময় আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে নিয়ে যায়। মানুষ যাতে যথাযথভাবে জীবনের স্বাদ পায়, যাতে এমন এক অনুভব তাদের মাঝে থাকে যে, আল্লাহর সামনে সার্বক্ষণিক দায়িত্বশীল তারা, এই পাঠ কুরআন তাদেরকে দিচ্ছে। মানুষের দ্বারা সম্ভব খুব আন্তরিক নিয়মিত এবাদত ও দরদভরা সুন্দর জীবনযাপন করার মধ্য দিয়ে দয়াময় আল্লাহকে অবিরাম স্মরণ করা। এসব সমানভাবে সুফি পথের কেন্দ্রীয় বিবেচনার বিষয়।

ইতিপূর্বে আমরা জোর দিয়ে বলেছি, সুফির প্রধান লক্ষ্য অন্তর দিয়ে আল্লাহর নৈকট্য পাওয়া। আর বিশুদ্ধ সুফি মতাদর্শ মানব জীবনের কষ্টিপাথর কুরআনকে গ্রহণ করে। সকল প্রকার চিন্তার গভীরতম তাৎপর্যের দিকে কুরআনের আয়াত ডাকে মানুষকে। এই কিতাবের বিশেষ অর্থ মানুষকে আল্লাহ বুঝবার দিকে নিয়ে যায়। সুফির জীবনাচরণে কুরআন তিলাওয়াত অপরিহার্য। দিবস শুরুর প্রথমভাগে তাকে অভিনিবিষ্ট হয়ে পড়তে হয় কুরআন। আর কুরআনের আয়াতের নিগূঢ় অর্থ ধরতে হলে পরিচ্ছন্ন অন্তর থাকা দরকার।

রাসুল সা. তাঁর নৈতিক আচরণের মাধ্যমে কুরআনকে মূর্ত করেছেন। সত্যিকারের দরবেশগণ নৈতিক পরিপূর্ণতা অর্জনের জন্যে তাদের জীবনের প্রতিটি বিষয় নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেন রাসুলের সা. আদর্শে। এভাবে দরবেশগণও জীবনের সকল ক্ষেত্রে কুরআনের জ্ঞানের চর্চা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে হয়ে ওঠেন জীবন্ত কুরআন।

কুরআনই সুফিদের আশীর্বাদ ও প্রেরণা হওয়ার কারণে, তাঁরা কুরআনের তফসির সাহিত্যে গভীরভাবে ও যথাযথভাবে অবদান রেখেছেন। তাঁদের এ কাজগুলো বেশ সমৃদ্ধ, রূপকার্থক ও মানুষের জন্যে উপকারী। কুরআনের কথার সূক্ষ্ম অর্থ প্রকাশ করার জন্যে সুফি ভাষ্যকারগণ নিখুঁতভাবে কাজ করেছেন। তার মানে আবার এ নয় যে তাঁরা অপরিমেয় খোদায়ি কালামকে সীমিত মানবীয় মতপ্রকাশের সীমানার ভিতর বন্দি করেছেন। তাঁদের উদ্দেশ্য কখনো এমন হয় না। সুফিরা কখনো কুরআনের মূল্যাতীত কালামের মর্যাদা হ্রাস করেন না। এছাড়া সুফিদের রচনাপদ্ধতিতে (Methodology) স্বেচ্ছাচারপ্রসূত ভিত্তিহীন ব্যাখ্যা করার সুযোগ নাই। যথাযথ আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যার মূলনীতি সুফি উস্তাদগণ স্থির করেছেন এরকম:

এক. কুরআনের আয়াতের ভিতরের অর্থ, যা সঠিক বলে ধরা হবে তা আয়াতটির বাইরের অর্থের সাথে সাংঘর্ষিক হবে না।

দুই. প্রস্তাবিত অর্থ কুরআন ও সুন্নাহর বিষয়বস্তুর গণ্ডির ভেতরের হতে হবে।

তিন. কুরআনের আয়াতে বিন্যস্ত কথা ও পূর্বাপর সম্বন্ধের সাথে প্রস্তাবিত রূপক অর্থ মানানসই হতে হবে।

উদাহরণ আকারে আমরা কুরআনের কিছু সুফি তফসিরের (ব্যাখ্যা) উল্লেখ করতে পারি। যেমন—

আবু আবদুর রহমান আস-সুলামি’র ‘হাকায়িকুত তাফসির’, কুশায়েরি’র ‘লাতায়েফুল ইশারাত’ এবং আনাতোলিয়ার বুরসা শহরের ইসমাইল হাক্কি’র ‘রুহুল বায়ান’। পবিত্র কুরআনের এসব সম্পূর্ণ সুফি তফসিরের পাশাপাশি আরও অনেক কাজ রয়েছে, যেগুলোতে মহিউদ্দিন ইবনে আরাবি ও জালালউদ্দিন রুমি কুরআনের নির্দিষ্ট আয়াতের রূপক ব্যাখ্যা করেছেন। সন্দেহ নেই, কুরআন হলো সর্বশক্তিমানের অতুলনীয় অননুকরণীয় বাণী। অতএব, এটাও স্মরণে রাখতে হয় যে, কোনো তফসির যথার্থ হতে পারে বটে কিন্তু চূড়ান্ত বিবেচনায় তা মানুষের ভাষায় করা তফসির মাত্র। মানুষের ভাষায় আল্লাহর কালামের সামগ্রিক শব্দার্থগত (Semantic) সম্পূর্ণতা ধরা যায় না।

মানুষ আমরা। আমাদের পক্ষে আল্লাহর বাস্তব সত্তা (Essence) ও গুণাবলি (Attributes) পুরোপুরি বুঝতে পারা সম্ভব না। একইভাবে কুরআনও পুরোপুরি বুঝতে পারা সম্ভব না। যত বড় মেধাবী হোন বা যত বড় আলেম হোন, আল্লাহর কালাম তিনি বুঝবেন খুব সামান্য। আমরা কুরআনের আসল অর্থ যেটুকু জানি তা এভাবে তুলনীয় যে, বিশাল মহাসমুদ্র থেকে এক ফোঁটা নিয়েছি কেবল। আল্লাহ বলেন, “এবং পৃথিবীতে যত বৃক্ষ আছে, সবই যদি কলম হয় এবং সমুদ্রের সাথে আরও সাত সমুদ্র যুক্ত হয়ে কালি হয়, তবুও তাঁর কথাসমূহ লিখে শেষ করা যাবে না। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।”

আমরা এ রকম বিবেচনা রাখতে পারি যে, আল্লাহ তায়ালা বেশ উঁচু লেভেলের গভীর অর্থসমৃদ্ধ ভাষায় কথা বলেছেন আল-কুরআন নামের কিতাবের মাধ্যমে। মানুষের বুদ্ধির মামুলি লেভেলের দ্বারা বোধগম্য ভাষা কুরআনের না। কেননা, মানুষের জীবনের মামুলি স্তরের জায়গা থেকে কথা না বলে আল্লাহ দয়াময় চেয়েছেন, মানুষ যাতে মনোনিবেশ করে খোদায়ি দৃষ্টিকোণের প্রতি; যার বুদ্ধিতে যা কুলায়, মানে সামর্থ্য অনুযায়ী। কুরআনের ভাষার এ-বিশিষ্টতা সম্পর্কে রাসুল সা. বলেছেন, “কুরআনের ভাষা অশেষ অর্থসমৃদ্ধ।” জালালউদ্দিন রুমি রহ. একই ধরনের কথা বলেছেন, কেউ কুরআনের প্রতিলিপি করতে পারেন সামান্য কালি ব্যবহার করে, কিন্তু কুরআনের নিগূঢ় অর্থ যা এতে গ্রন্থিত, তা কূলকিনারাহীন দরিয়ার কালিতেও কুলাবে না। পৃথিবীর সব গাছ দিয়ে কলম বানিয়ে লিখে শেষ করা যাবে না।

উল্লিখিত আল্লাহর কথা ও রাসুলের কথা থেকে ইঙ্গিত এই যে, কুরআন সামগ্রিক সত্য ও বাস্তবতার এক নিউক্লিয়াস সমতুল্য কিতাব। এই যে ভিতরের তাৎপর্য, মানে এই যে সামগ্রিক সত্যের আধার কুরআন, এই মর্মার্থ যদি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হতো, তাহলে এর মাহাত্ম্য সব সীমা অতিক্রম করে যেত। কেবল যারা অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন জ্ঞান হাসিল করতে সুদৃঢ় থাকেন, তারা এই গূঢ় সত্য আবিষ্কার করতে পারেন।

কুরআন তফসিরের নিয়ম-বিষয়ক বিদ্যার ব্যাপারে আলেমগণ পাণ্ডিত্যপূর্ণ যোগ্যতার কথা বলেছেন। মানে, সেই বিদ্বান ব্যক্তির কাছে আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান (অহি) থাকে। এ যোগ্যতা হাসিল করতে আল্লাহর ব্যতিক্রমী বান্দা হতে হয়। এই বিশেষত্ব অর্জন করতে বিনয়ী হতে হয়, ধার্মিক হতে হয়, আত্মত্যাগী হতে হয়, বিশেষত: অহংকারের বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্ন  যুদ্ধে থাকার মাধ্যমেই অর্জন করতে হয়। একটি হাদিসে ইঙ্গিত করা হয়েছে, “যে ব্যক্তি যা জানে তার ওপর আমল করে, সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাকে তা শিখান যা তিনি জানেন না।” অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, কুরআনের নিগূঢ় অর্থ বুঝতে হলে নিজের অন্তর পরিশুদ্ধ করতে হবে। অহমিকা ও হিংসামুক্ত হতে হবে। দুনিয়ার মোহমুক্ত হতে হবে। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, “আমি আমার নিদর্শনসমূহ হতে তাদের ফিরিয়ে রাখি, যারা পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে গর্ব করে।”

Leave a Reply