অসহিষ্ণুতার যুগে দক্ষিণ এশিয়া

আজকের আলোচনার বিষয় দক্ষিণ এশিয়া বিশেষত ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি দ্বারাই চিত্রিত হয়েছে। সহিংসতা, চরমপন্থা, গৃহযুদ্ধ এবং বিচ্ছিন্নতাবাদ—এই অঞ্চলের জন্য নতুন কিছু নয়। তবুও সাম্প্রতিক সময়ে মনে হচ্ছে এই অঞ্চলটি অসহিষ্ণুতার এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। নিজের চেয়ে ভিন্ন কোনো ব্যক্তির বিশ্বাস, মতামত, আচরণ এবং অভ্যাসকে মেনে নেবার অনাগ্রহ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এই বৈশিষ্ট্য যে সমাজের বিচ্ছিন্ন কোনো অংশের মধ্যে প্রকট হয়ে উঠছে তা নয়; বরং ধীরে ধীরে এটি সমাজ ও রাজনীতির মূলধারার অংশ হয়ে উঠছে।

অসহিষ্ণুতা নিয়ে কথা বলা একটি দুরূহ ব্যাপার। কেননা, এটি আবেগের উত্থান ঘটায় এবং ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হবার ঝুঁকি সৃষ্টি করে। এই প্রেক্ষিতে তাই অসহিষ্ণুতাকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে, কিংবা অসহিষ্ণুতা কাদের দ্বারা এবং কাদের বিপক্ষে, এই প্রশ্নগুলো করা জরুরি। আমাদের বোঝার সুবিধার্থে অসহিষ্ণুতাকে আমি একেবারেই আড়ম্বরহীনভাবে সংজ্ঞায়িত করব, সেটি হচ্ছে—বিপরীত মতের চিন্তা বা দলের সাথে সহাবস্থানে অনাগ্রহ। এই অসহিষ্ণুতা কেন টিকে আছে এবং কেন সাম্প্রতিক সময়ে তা অতিমাত্রায় বেড়ে গিয়েছে আমরা সবাই তা বুঝতে ব্যাকুল, কিন্তু এর কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর আমি দিতে পারব না এবং দিতে চাইবও না। আমি বরঞ্চ দেখাতে চাই যে, এই বিষয়টি কী পরিমাণ জটিল আকার ধারণ করেছে।

মহামারি আকারে অসহিষ্ণুতা

ভারতের ‘সাম্প্রদায়িক’ সম্পর্কের ক্ষেত্রে ২০১৫ সালটি ছিল খুবই উদ্বেগজনক। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পত্রিকার কাছে যে তথ্য দিয়েছে সে অনুসারে দেশটিতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার হার বৃদ্ধি পেয়েছে ২৫%, অথবা ইন্ডিয়া টুডে’র রিপোর্ট অনুসারে, “বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে সাম্প্রদায়িক ভাবসম্পন্ন ঘটনার বৃদ্ধি ঘটেছে।” ভারতীয় পত্রিকায় আমরা সত্যিই দেখেছি দেশটির নাগরিকদের গণপিটুনি, নৃশংস গোলাগুলি, নির্দয় অগ্নিসংযোগ এবং বেপরোয়া হত্যাকাণ্ডের খবর।

২০১৫ সাল এবং এর আগে ভারতজুড়ে তিন ধরনের ঘটনা ঘটতে দেখা যায়, যা দেশটিতে সহিষ্ণুতার যে সংস্কৃতি তার ক্রমাবনতির একটি প্যাটার্ন নির্দেশ করে। এর প্রথমটিকে বলা যায় “গরুর গোশত বিতর্ক”। এর সূত্রপাত হয় ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে জৈন ধর্মাবলম্বীদের পর্যুশন উৎসবে গোশত বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে। এর পরেই ঘটে দাদরিতে গরুর গোশত খাওয়ার সন্দেহের জেরে মোহাম্মদ আখলাক নামক একজন মুসলমানকে হিন্দু জনতার গণপিটুনি। এর পর দেখা যায়, জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যের বিধানসভার একজন মুসলিম সদস্য তার অনুষ্ঠানে গরুর গোশত পরিবেশন করার কারণে ক্ষমতাসীন দলের সদস্যদের আক্রমণ এবং হাতাহাতি।

দ্বিতীয় ধরনের সহিংসতা দেখা গিয়েছিল ভিন্নমতের বিরুদ্ধে। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুম্বাইয়ের কাছে কম্যুনিস্ট নেতা গোবিন্দ পানসারে খুন হন। আগস্ট মাসে ৭৭ বছর বয়সী বুদ্ধিজীবী এম এম কালবুর্গি, যিনি হিন্দু প্রতিমাপূজার বিরুদ্ধে সরব ছিলেন, তার নিজের দরজায় আততায়ীর হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। সেপ্টেম্বরে চরমপন্থি হিন্দু সংস্থা ‘শ্রী রাম সেনা’র নেতা সিদ্ধলিঙ্গা স্বামী কর্ণাটকে সাংবাদিকদের জানান, “প্রফেসর কেএস ভগবান ও চন্দ্রশেখর পাতিলের (যাদের বিরুদ্ধে হিন্দু মহাকাব্য রামায়ণ ও মহাভারত নিয়ে সমালোচনার অভিযোগ আনা হয়েছে) লেখায় হিন্দুদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত লেগেছে।” তিনি আরও বলেন, “এই মহাকাব্যগুলো কোটি কোটি হিন্দু পবিত্র বাণী হিসেবে গণ্য করে থাকেন। রামায়ণের যে সকল চরিত্র পূজিত হয়ে থাকে, তাদের অবমাননা তারা সহ্য করবে না। যদি সেই লেখকেরা হিন্দু দেবতাদের অপমান করা বন্ধ না করেন, তাহলে সেসব মানুষেরা প্রয়োজনে ঐ লেখকদের জিহ্বা কেটে নেবে।” কেএস ভগবান, যিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং বর্ণপ্রথার এক সোচ্চার সমালোচক, তাকে টুইটারে হুমকি দেওয়া হয় যে, তিনিই হবেন পরবর্তী শিকার। বছর দুই আগে ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রচারণার চালাবার কারণে নরেন্দ্র দাভোলকর নামক একজন অ্যাকটিভিস্ট খুন হন। আরএসএস-এর মুখপত্র ‘পঞ্চাজন্য’তে উপরাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারির প্রতি অভিযোগের তীরছোড়া হয় যে, তিনি ‘সাম্প্রদায়িক মুসলিম নেতা’দের মতো কথা বলেন। যদিও মুসলমানদের পরিচয় ও নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলবার সময় হামিদ আনসারি বহুমাত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক চিন্তা ধারণ করবার জন্য মুসলমানদেরও আহবান জানান।

তৃতীয় ধরনের সহিংসতা হচ্ছে, শক্তিশালী রাজনৈতিক ধারার সাথে ঐকমত্য পোষণের জন্য জবরদস্তি। ২০১৫ সালের অক্টোবরে শিবসেনার চাপে মুম্বাই ও পুনেতে অনুষ্ঠিতব্য পাকিস্তানি গায়ক গুলাম আলীর কনসার্ট বাতিল করা হয়। এই সংস্থার সদস্যরা ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সাবেক তাত্ত্বিক সুধীন্দ্র কুলকার্নিকে হয়রানি করে। কারণ তিনি মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত হওয়া সাবেক পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী খুরশিদ মাহমুদ কাসুরির বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে যোগদান করেছিলেন। এমনকি যখন লেখক, শিল্পী, বিজ্ঞানীদের একটি বড় অংশ এই ধরনের আচরণের নিন্দা করেন, তাদেরও আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করে তোলা হয়। ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতার পরিবেশ নিয়ে মন্তব্য করবার জের ধরে বিখ্যাত চিত্রতারকা আমির খানকে ভারতবিরোধী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় এবং সরকারি ক্যাম্পেইন ‘ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়া’র ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর পদ থেকে তাকে ছাটাই করা হয়।

Leave a Reply