জিডিপি প্রবৃদ্ধির ফাঁক-ফোকর

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে ভালো অবস্থানে রয়েছে। করোনার প্রাদুর্ভাবে যদিও এ-বছর ৫.২% প্রবৃদ্ধি অর্জন হয়েছে। কিন্তু গত অর্থবছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৮.১৫%১, বিগত অর্ধদশক ধরে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭% এরও উপরে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমীক্ষায় অর্থনীতিকে যে ১৫টি খাতে বিভক্ত করা হয়েছে, তার সবগুলোর অবস্থানই ভালো। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, অথচ সাধারণ মানুষের জীবন মান বাড়ছে না। সমাজে বৈষম্য বাড়ছে। কর্মক্ষম যুবকদের একটা বিশাল অংশ বেকারত্বের কারণে জর্জরিত। তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কি আমাদের জীবনের গুণগতমান বজায় রাখতে পেরেছে? না আদৌ কোনো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে? ইতোমধ্যে আমাদের প্রতিবেশী দেশেও ঠিক একই চিত্র দেখা গেছে। এ প্রেক্ষিতে ভারতের সাবেক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. অরবিন্দ সুব্রামানিয়া বলেছেন, “অর্থনীতির ভিত্তিবছর পরিবর্তন করার মাধ্যমে ভারত কমপক্ষে অতিরিক্ত ২.৫% প্রবৃদ্ধি বাড়িয়েছে।” তিনি তার পরিসংখ্যানে আরও বলেছেন, “শুধু ভারত নয় যুক্তরাজ্য ১.৬% ও জার্মানি ১% প্রবৃদ্ধি অতিরিক্ত দেখিয়েছে।”

সাধারণত বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের সরকারগুলো বলে— কৃষি, নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও সম্পদের সমবণ্টনে গুরুত্ব প্রদানের কারণে প্রবৃদ্ধি বেশি হয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে বলা হয়— সেবাখাত, শিল্পখাত ও উৎপাদনমুখী খাতে আশাব্যঞ্জক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। তবে কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি হওয়ার কারণে মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থান ততটা পরিবর্তন হয়নি। অথচ বাস্তবত হলো, বেসরকারিখাতে কম বিনিয়োগ হওয়ার কারণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় না। আবার দুর্বল আর্থিক খাত প্রয়োজন অনুযায়ী বেসরকারিখাতে ঋণ প্রদান না করতে পারার কারণে বিনিয়োগও হ্রাস পায়। এ-কারণে জিডিপি প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়ে যায়। কারণ বিনিয়োগে বেসরকারিখাতের অবদান যদি হয় জিডিপির ২৩.৫৪%, সেখানে সরকারিখাতের অবদান প্রায় ৭%-এর মতো। আর প্রত্যেকটি সরকারই এই ধরনের বক্তব্য দেয়, কারণ দুর্বল আর্থিক খাতের বাস্তবতা প্রকাশ হয়ে যাবে যদি প্রবৃদ্ধি বেশি হারে না দেখানো হয়।

জিডিপি নির্ণয়ের ভিত্তিবছর পরিবর্তন

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরকে ভিত্তিবছর ধরে জাতীয় আয়ের হিসাব-নিকাশ করা হয়েছে টানা দুই দশক। ১৯৯২-৯৩ অর্থবছরে এসে এই ভিত্তিবছর পাল্টে করা হয় ১৯৮৪-৮৫। এরপর ১৯৯৯-২০০০ সময়কালে আবার ভিত্তিবছর হালনাগাদ করে নির্ধারণ করা হয় ১৯৯৫-৯৬। এরপর এক যুগ অতিক্রম করে এসে ২০১৩-১৪ অর্থবছর থেকে ২০০৫-০৬ অর্থবছরকে নতুন ভিত্তিবছর করা হয়। এ অবস্থায় সরকার নতুন কয়েকটি খাত যুক্ত করে ২০১৫-১৬ অর্থবছরকে নতুন ভিত্তিবছরের ওপর জাতীয় আয়ের হিসাব-নিকাশ করছে ২০১৯ থেকে। প্রস্তাবিত নতুন ভিত্তিবছর থেকে প্রচলিত ১৫টি খাতের সঙ্গে আরও ছয়টি খাত যুক্ত হয়ে মোট ২১টি খাতের বাজারমূল্য যোগ করে জিডিপি নির্ণীত হবে। এতে করে কিছু সাংবাদিক, যারা অর্থনীতি বিষয় নিয়ে লিখছেন, তারা বোঝাতে চাচ্ছেন অর্থনীতির আয়তন বাড়বে। অথচ বাস্তবতা হলো, জিডিপির ভিত্তিবছর পরিবর্তন না করেও নতুন এসব আর্থিক খাতকে পরিসংখ্যানের মধ্যে নিয়ে আসা যায়। হ্যাঁ, ২১টি খাত সংযোগ করাতে জিডিপির আয়তন বাড়বে, তার ওপর ভিত্তিবছর পরিবর্তন করার কারণে আরও বাড়বে অর্থনীতির আয়তন। কিন্তু তারা বললেন না— এক দশক শেষ হওয়ার পূর্বেই এইভাবে ভিত্তিবছর পরিবর্তন করার কারণে প্রকৃত অর্থনীতির আয়তন কতটুকু বাড়ল, মুদ্রাস্ফীতি কতটুকু বাড়ল এবং প্রকৃত আয় মানুষের হ্রাস পেল না বাড়ল—তার হিসাব কীভাবে হবে।

কারণ, আমরা জানি ‘ভিত্তিবছর’ অর্থনীতিতে একটি স্থিরমূল্য বিবেচনা করার বছর। এই বছরের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী বছরগুলোর জিডিপির বর্তমান বাজারমূল্যকে অতীতের স্থিরমূল্যের সাথে তুলনা করা হয়। কারণ প্রতিবছর মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস বা বৃদ্ধির কারণে পণ্যের বাজার মূল্য স্থির থাকে না। তাই প্রতিবছরের বর্তমান বাজার মূল্যকে স্থিরমূল্যে রূপান্তর না করলে অর্থনীতির আয়তন বেড়েছে না হ্রাস পেয়েছে, তার তুলনা করা যায় না। আর জিডিপি যেহেতু দেশে উৎপাদিত ও ভোগকৃত সকল পণ্য বা সেবার বাজার মূল্য, তাই এক বছরের বাজার মূল্যের মূল্যস্ফীতির তারতম্যের কারণে ভিত্তিবছর না থাকলে আরেক বছরের সাথে তুলনা করা যায় না। আর পণ্য বা সেবার মূল্যের সঠিক মূল্যায়ন করার জন্য প্রতিবছরের জিডিপি ভিত্তিবছরের স্থির মূল্যের সাথে বিবেচনা করতে হয়। তাই ভিত্তিবছর বাংলাদেশে পরিবর্তন করাতে স্বাভাবিকভাবেই জিডিপির আয়তন অনেক বেড়ে যাবে। কিন্তু মানুষের জীবনমানের হার কতটুকু বাড়বে তা বলা অনেকটা কঠিন হয়ে যায়।

অর্থনৈতিক বৈষম্য ও মানুষের প্রকৃত আয়

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ার সাথে সাথে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ না বাড়লে বৈষম্য বাড়ে। মানুষের জীবনমান নির্ভর করে অর্থনৈতিক বৈষম্যের ওপর। বাংলাদেশের অর্থনীতির আয়তন ৩০২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। মাথাপিছু আয় ১৯০৯ মার্কিন ডলার।৫ কিন্তু বাংলাদেশেই দারিদ্র্য হার কিছুটা হ্রাস পেলেও কর্মসংস্থান সহায়ক প্রবৃদ্ধি আমরা দেখছি না। আমরা একটি তত্ত্বগত বিশ্লেষণের জন্য কয়েকটি বিষয়ে অনুমান অপরিবর্তিত ধরে নিয়ে ১টি উদাহারণ দিই। আমরা উদাহরণস্বরূপ অর্থনীতিবিদদের মতো হাইপথিসিসের শর্ত ধরে নিই : যেমন, হক সাহেব একজন নিম্ন মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ।

নিম্ন মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ মোট আয়ের ৮০% ভোগ্যপণ্য ও জীবন ব্যয় নির্বাহে ব্যয় করে।

নিম্ন মধ্যবিত্তের বেতন প্রতিবছর ১০% হারে ইনক্রিমেন্ট বা বৃদ্ধি পায়।

২০১৩-২০১৮ পর্যন্ত গড় মুদ্রাস্ফীতির পরিমাণ ৫.৫%।

২০১৯-২০২০ পর্যন্ত গড় মুদ্রাস্ফীতির পরিমাণ ৭%, ভিত্তিবছর পরিবর্তন করার কারণে।

ধরা যাক—হক সাহেব ২০১৩ সালে ১৫ হাজার টাকা বেতন পেতেন। তিনি যেহেতু নিম্ন মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ তাই তার আয়ের ৮০% ব্যয় হতো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ক্রয় ও বাড়ি ভাড়ায়। তিনি ২০১৩ সালে ৮০% ব্যয় করতেন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য বা সেবা ভোগ করে। আর তার সঞ্চয় থাকত ২৩৪০ টাকা। সেই একই ব্যক্তি ২০১৪ সালে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য বা সেবা ভোগে ৮০% ব্যয় করে সঞ্চয় করতে পারেন ২৫৭৪ টাকা। অর্থাৎ বিগত বছরের তুলনায় মুদ্রাস্ফীতি ৫.৫% বেশি বৃদ্ধির কারণে এ বছর অতিরিক্ত আয় হচ্ছে মাত্র ২৩৪ টাকা। এভাবে অর্থনীতির ডিসকাউন্টিং মেথড অনুযায়ী যদি সহজভাবে হিসাব করা হয়, দেখা যাবে গড়ে প্রতিবছর একজন মানুষের আয়ের প্রবৃদ্ধি হয় মাত্র ২৬৭ টাকা। অথচ মুদ্রাস্ফীতির পরিমাণ বৃদ্ধি হয় তার চেয়ে বেশি বা দ্বিগুণ। কারণ ২০১৩ সালের ভিত্তিবছর ছিল ২০০৫-২০০৬। অথচ ২০১৯ সাল থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছরকে ভিত্তিবছর হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এতে করে ২০১৯ ও ২০২০ অর্থবছরে মুদ্রাস্ফীতির পরিমাণ বিগত ২০০৫-০৬ অর্থবছরকে ভিত্তিবছর বিবেচনা করে হিসাব না করায় হক সাহেবের আয়  অঙ্কের দিক থেকে বাড়লেও প্রকৃত আয় বাড়েনি। তাই আমরা দেখি ২০১৩-২০১৮ পর্যন্ত একজন মানুষের গড় আয় বৃদ্ধির পরিমাণ মাত্র ২৮৫.৮০ টাকা। ২০১৮ সাল পর্যন্ত আমরা ৫.৫% হারে মুদ্রাস্ফীতি হিসাব করার পর ২০১৯ থেকে মুদ্রাস্ফীতি ৭% হিসেবে করে দেখি ২০১৯ সালে হক সাহেবের প্রকৃত আয় ২০১৮ সালের তুলনায় বাড়ে মাত্র ৫৭ টাকা এবং ২০২০ সালে হক সাহেবের আয় বাড়ে মাত্র ৩৮৩ টাকা। এসবই প্রমাণিত হয়ে যাবে নিচের সারণিটি একবার দেখলে :

Leave a Reply