করোনা এপোকেলিপ্স

ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো তাঁর ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ বইটিতে আধুনিক যুগের প্রাক্কালে প্লেগ-আক্রান্ত শহরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। তিনি আধুনিক শৃঙ্খলা ও নজরদারিমূলক জৈব ক্ষমতার ইতিহাস লিখতে গিয়ে প্লেগ-নগরীর ব্যবস্থাপনার ইতিহাসের গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন। ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ বইয়ের আলোচনা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে হাজির থাকা নিয়ন্ত্রণ ও শাস্তির বিভিন্ন কলকব্জা ও কলাকৌশল নিয়ে, যেগুলো প্রয়োগের মাধ্যমে জনগণের দেহকে এমনভাবে ক্ষমতার কব্জার মধ্যে নিয়ে আসা হয়, যার ফলে আধুনিক রাষ্ট্রীয় স্বার্থের উপযোগী আচার ও জীবনযাপনে তাদের অভ্যস্ত করা যায়। এই আলোচনা করতে গিয়ে ফুকো বিভিন্ন ঐতিহাসিক উদাহরণ উল্লেখ করেছেন। ফ্রান্সের প্লেগ আক্রান্ত নগরের ব্যবস্থাপনাও তেমনি একটি উদাহরণ। এবং প্লেগ-আক্রান্ত নগরের আলাপ থেকেই তিনি পৌঁছে গেছেন প্যানোপ্টিক জেলখানার আলোচনায়। দেখিয়েছেন যে, প্লেগ-নগরী আর প্যানোপ্টিক ধরনের নজরদারি নির্ভর জেলখানার ব্যবস্থাপনা ও কলকব্জাগুলোয় মিল আছে। (ফুকো, ১৯৫-২০৫)

ফুকোর বরাতে যা বলতে চাচ্ছি, তা হলো, প্লেগ-আক্রান্ত নগরে জারি হওয়া কারফিউ ধরনের অবস্থা, পুলিশি শাসন, নজরদারিসহ বিশেষ ব্যবস্থাপনার মধ্যে আধুনিক বায়োপাওয়ার বা জৈবক্ষমতার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ খুঁজে পাওয়া যাবে। এবং সাম্প্রতিক দুনিয়ায় হাজির হওয়া করোনা মহামারি এই ইতিহাসেরই একটি চূড়ান্ত অবস্থা আমাদের সামনে উন্মোচন করেছে। এই উন্মোচন দুনিয়াজোড়া প্যানোপ্টিসিজমেরই একধরনের উন্মোচন বলা যায়।

প্যানোপ্টিসিজমের ধারণাটি ফুকো গড়ে তুলেছিলেন উপযোগবাদী দার্শনিক জেরামি বেন্থামের প্রস্তাবিত প্যানোপ্টিক জেলখানার ধারণা থেকে। বেন্থামের প্রস্তাবিত এই ধরনের জেলখানা একসময় পাশ্চাত্যের কিছু দেশে মডেল জেলখানা হিসেবে বাস্তবে হাজিরও ছিল। প্যানোপ্টিক জেলখানার বৈশিষ্ট্য হলো, একটা কেন্দ্রীয় নজরদারির মধ্যে জেলখানার কয়েদিদের এমনভাবে নিয়ে আসা, যেন তারা তাদের আচার-আচরণ নিজে থেকেই একটা শৃঙ্খলার মধ্যে চলে আসতে বাধ্য হয়, এবং অন্যদিকে জেলখানার ব্যবস্থাপনাও সহজ হয়। ফুকো এই প্যানোপ্টিক জেলখানার মধ্যেই আধুনিক নজরদারি ও শৃঙ্খলা-নির্ভর শাসনপদ্ধতির পূর্বসূরি বা মডেল দেখতে পেয়েছেন, যা জনগণের জীবনকে এমনভাবে খোপের মধ্যে ভরে ফেলে এবং কেন্দ্রীয় একটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে আসে, যাতে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন অস্তিত্বের মধ্যে জনগণ ক্ষমতার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও শৃঙ্খলিত হতে থাকে। আধুনিক রাষ্ট্র বা সমাজের মধ্যে হাজির থাকা এই ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক ম্যাকানিজম বা কলকব্জাকেই ফুকো নাম দিয়েছেন প্যানোপ্টিসিজম। ফ্রান্সের রাজকীয় চিড়িয়াখানা, প্লেগ-আক্রান্ত নগরের ব্যবস্থাপনা এবং জেরামি বেন্থামের প্যানোপ্টিক জেলখানার বিচার বিশ্লেষণ করেই তিনি হাজির করেছিলেন তার প্যানোপ্টিসিজমের ধারণা; দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, আমরা এখন যে রাষ্ট্রব্যবস্থা বা সমাজের মধ্যে বসবাস করি তা একধরনের জেলখানাও বটে। আর এই আলোচনা তিনি শুরুই করেছেন প্লেগ-আক্রান্ত নগরের উদাহরণ তুলে ধরে। সেইসাথে এ-ও দাবি করেছেন যে, আমাদের আধুনিক শৃঙ্খলা-নির্ভর সমাজের ইতিহাস আসলে সামাজিক ‘কোয়ারেন্টিন’ ধরনের ব্যবস্থা থেকে শুরু করে আরও সাধারণ ও সর্বত্র প্রয়োগযোগ্য প্যানোপ্টিসিজমের কলকব্জায় বিস্তৃত হওয়ারও ইতিহাস। (ফুকো, ২১৬)

ফুকোর কথা যদি মেনে নিই, তাহলে আমরা সবাই বর্তমানে একটা প্যানোপ্টিক জেলখানারই বাসিন্দা। এবং এই জেলখানার কাজ শুধু আমাদের আবদ্ধ করে রাখা নয়, একই সাথে নজরদারির মাধ্যমে আমাদের শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসা। এমনকি যে কর্তাসত্তা হিসেবে আমরা হাজির থাকি, সেটাকেও উৎপাদন করা।

করোনা মহামারিকে তাই শুধু এর মারণক্ষমতা দিয়ে, স্বাস্থ্যখাতে তৈরি হওয়া বিপর্যয় দিয়ে বা অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা দিয়ে বিচার করতে যাওয়াটা ঠিক হবে না। বরং আগের কালের বিভিন্ন মহামারির তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম মারণক্ষমতা নিয়েও যে তা বিশ্বব্যাপী দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার মাধ্যমে বহু মানুষের জীবন বিপন্ন করার, বিশ্বজোড়া সকল মানবিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা নিয়ে আসার এবং নানানরকম শৃঙ্খলার কলাকৌশল ও কলকব্জার মধ্যে আবদ্ধ করার সক্ষমতা রাখে—সেই বিচার-বিবেচনাও করতে হবে। করোনা ভাইরাস যে-ভয়ের বিষয়টা আমাদের সামনে তুলে ধরল, তা হলো, এখনকার দুনিয়ায় যে-কোনও প্লেগ খুবই দ্রুত সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। এবং আরও ভয়ের ব্যাপার হলো, কম মারণক্ষমতা নিয়েও একটি প্লেগ সারা দুনিয়ার মানুষের প্রাত্যহিক স্বভাব ও অভ্যাস নিয়ন্ত্রণের পেছনে কারণ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। নগর ও রাষ্ট্রব্যাপী কোয়ারেন্টিনের আবির্ভাব ঘটাতে পারে। মানে মধ্যযুগীয় প্লেগের মতো বেশি মানুষ না মারতে সক্ষম হলেও সমাজদেহের ওপর জৈবক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারে। এবং করোনা এপোকেলিপ্স আরও যা উন্মোচন করে দিলো, তা হলো, যেই পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ও বিশ্বব্যবস্থার প্রয়োজনে এমন সমাজ গড়ে তোলা হয়েছে; সেই পুঁজিবাদ তার চিরচেনা কলকব্জা আর কলাকৌশলগুলো প্রয়োগ করেও নিজেকে টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে।

দুই.

ফুকো-পরবর্তী সময়ে আধুনিক রাষ্ট্র ও সমাজে জৈবক্ষমতার স্বরূপ নিয়ে যিনি গুরুতপূর্ণ আলোচনা করেছেন, ফুকোর চিন্তাকে আরও বিস্তৃত করেছেন এবং ক্ষেত্রবিশেষে তার সীমাবদ্ধতাগুলো অতিক্রম করেছেন—তিনি হলেন ইতালীয় দার্শনিক জর্জো আগামবেন। ফুকো যেখানে প্যানোপ্টিক জেলখানার ব্যবস্থাকে হাজির করেছিলেন আধুনিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রকৃত রূপ তুলে ধরতে; আগামবেন সেখানে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের ব্যবস্থাপনার মধ্যে আধুনিক সরকারব্যবস্থার প্যারাডাইম খুঁজে পেয়েছেন। ফুকো যেখানে আধুনিক রাষ্ট্রগুলোতে সহিংস সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের ক্রম অপসারণ এবং শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনামূলক ক্ষমতা প্রয়োগের আগমনকে বাড়তি গুরুত্ব দিয়েছেন, আগামবেন সেখানে দেখিয়েছেন যে, এই দুই ধরনের ক্ষমতাই আধুনিক রাষ্ট্রগুলো প্রয়োগ করে। এই দুই ধরনের ক্ষমতার সবচাইতে প্রকট প্রয়োগ তিনি দেখেছেন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে। আগামবেনের কথা মেনে নিলে, আধুনিক রাষ্ট্র একদিকে যেমন মানুষের জীবনকে খোপের মধ্যে থাকা শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবের জীবনে পরিণত করে, তেমনি এই জীবের জীবনকে সব সময়ই হত্যা বা খরচযোগ্য জীবন হিসেবেও উৎপাদন করে। তার দাবি, কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের নামুস (Nomos) বা আইনি-ব্যবস্থাই আজকের দুনিয়ার সরকার-ব্যবস্থার প্রধান প্যারাডাইম হয়ে উঠেছে। (আগামবেন, ১৭৬)

আগামবেনের এই দাবির মধ্যে একধরনের অন্টোলজিকাল জেনারালাইজেশন হাজির আছে বলে একধরনের সমালোচনা আছে বিভিন্ন বুদ্ধিজীবী ও পণ্ডিতদের তরফ থেকে। যে-কোনও অন্টোলজির মধ্যেই একধরনের জেনারালাইজেশন থাকে বটে, জেনারালাইজেশন ছাড়া অন্টোলজিকাল সম্পর্কগুলো তথা বিভিন্ন ধরনের অস্তিত্বের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে সত্য তুলে ধরাও কঠিন। সুতরাং, যে-কোনও অন্টোলজিকাল সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে গেলে বাস্তব দুনিয়ায় একই ধরনের অন্টোলজিকাল অস্তিত্বের মধ্যেও হাজির থাকা পার্থক্য ও বৈচিত্র্য মাথায় রাখতে হয়। এটা তো সত্যি যে, ক্যাম্পের ব্যবস্থাপনা যদি প্যারাডাইম হিসেবে দুনিয়ার সব রাষ্ট্রের চরিত্রের মধ্যে, বা ক্যাম্প পরিস্থিতি যদি সবখানেই সম্ভাবনা হিসেবে থাকেও, তা-ও সবখানে সমানভাবে তার প্রকাশ ঘটে না। কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের প্যারাডাইম নির্ভর শাসনব্যবস্থা আগামবেনের দেশ ইতালি বা বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশে যত সহজে প্রয়োগ করা যায় বা যতটা প্রকটভাবে উন্মোচিত হয়, পশ্চিম ইউরোপের নাগরিক ও মানবাধিকারের শক্তিশালী ঐতিহ্য থাকা রাষ্ট্রগুলাতে থাকে তার চাইতে অনেক আড়ালে আবডালে।

কিন্তু করোনা মহামারি আজকে সারা দুনিয়াতেই কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পসম আইনি-ব্যবস্থাকে উন্মোচিত করে দিয়েছে। সামাজিক কোয়ারেন্টিন প্রয়োগের পাশাপাশি দুনিয়ার বিভিন্ন রাষ্ট্রে খরচযোগ্য প্রাণের অস্তিত্বও আমরা খুবই খোলামেলাভাবেই দেখতে পাচ্ছি। বিভিন্ন দেশে স্বাস্থ্যখাত ভেঙে পড়ায় চিকিৎসকদের এখন নৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে—কার প্রাণ বাঁচাবেন আর কাকে খরচের খাতায় ফেলে দেবেন। বাংলাদেশ ও ইন্ডিয়াতে আমরা দেখলাম জনগণের সম্মতিতেই নিরাপত্তা বাহিনী সহিংস ক্ষমতা প্রয়োগ করে সামাজিক কোয়ারেন্টিন প্রতিষ্ঠা করতে নেমে গেল। সব মিলিয়ে আগামবেনের চিন্তা এখন আমাদের জন্যে আগের যে-কোনও সময়ের চাইতে বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কিন্তু ইতালিতে করোনা সংকট শুরু হওয়ার পর যখন দেশজুড়ে সামাজিক কোয়ারেন্টিন ও কারফু ধরনের অবস্থা জারি হলো, এবং আগামবেন যখন তার স্বাভাবিক দার্শনিক অবস্থান থেকেই ইতালি জুড়ে জরুরি অবস্থার এই স্বাভাবিকীকরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেন, তখন তিনি পড়লেন বড় ধরনের সমালোচনার মুখে। এই সমালোচনায় শামিল হলো ইতালির সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী সমাজ থেকে শুরু করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের কয়েকজন নামকরা দার্শনিকও। এটা সত্যি যে, আগামবেন তার প্রথম লেখায় ইতালির সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সমালোচনা করতে গিয়ে জনস্বাস্থ্য প্রসঙ্গটিকে এড়িয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ডাক্তার না, তিনি দার্শনিক। তার কাজ রোগের চিকিৎসা বা স্বাস্থ্যখাতের ব্যবস্থাপনা নিয়ে না, বরং করোনা মহামারি আমাদের সামনে যে রাজনৈতিক ও নৈতিক সংকট হাজির করেছে—সেটা তুলে ধরা। পরবর্তী আরও দুইটি লেখায় আগামবেন তার এই অবস্থান আরও স্পষ্ট করেছেন। এবং আগামবেনের এই অবস্থানের সঙ্গে দ্বিমত করা যে-কারও পক্ষেই আজ কঠিন। পুরো দুনিয়াজুড়েই আজকে চিন্তাশীল বুদ্ধীজীবী সমাজ ইতোমধ্যে ফ্যাসিবাদে ঢুকে পড়া বর্তমান দুনিয়ার রাষ্ট্রগুলোর আরও ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার সুযোগ দেখতে পাচ্ছেন এই করোনা সংকটের মধ্যে। করোনা ক্রাইসিসে সারা দুনিয়া যেসব নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রশ্নের মুখোমুখি, সেইসব প্রশ্ন বাংলাদেশে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। আমাদের বাংলাদেশে এই বিষয়টায় কোনও রাখঢাক নাই যে, সরকারের কাছে করোনা ক্রাইসিস তাদের বল প্রয়োগের, সহিংসতা সংঘটনের, জনগণের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার সীমাগুলো পরীক্ষা করে নেওয়ারও একটা সুযোগ। তাদের ভাইরাস পরীক্ষার টেস্ট কিট থাকুক না থাকুক, মানুষকে বেআইনিভাবে পিটিয়েও যে জনসমর্থন পাওয়া যাবে তা তাদের জানা আছে, এবং এখন আরও জানা হয়েছে। বর্তমান বাংলাদেশ সরকার অন্তত একটা জায়গায় লুকাছাপা করে না, তা হলো, জনগণের অধিকার ও স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতা প্রদর্শনে। এইক্ষেত্রে তারা অন্য সকল বিষয়ে অসত্য বলার মতোই নির্লজ্জ সত্যবাদী। করোনা ক্রাইসিসের উসিলায় তারা এই সত্যটি এদেশের শিক্ষিত সমাজের সমর্থন সহকারেই আবারও প্রকাশ করলেন।

Leave a Reply