মতবিরোধের কারণ পর্যালোচনা এবং শাহ ওয়ালিউল্লাহ’র প্রস্তাবনা

ইসলামি ফিকহ একটি বিস্তৃত শাস্ত্র। প্রধানত কুরআন, হাদিসের ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠা এই শাস্ত্রে আরও দুটি উৎস থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়—এক. ‘ইজমা’ বা সাহাবি কিংবা তাবেয়িদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত; দুই. ‘কিয়াস’ বা তুলনা। কাছাকাছি আরেকটি বিষয় হচ্ছে ‘ইলমুল হাদিস’। ইসলামি জ্ঞানচর্চার বহুল-চর্চিত এই দুটি শাখাসহ অন্যান্য শাস্ত্রের একটি স্বাভাবিক ঘটনা হচ্ছে ইখতিলাফ বা মতবিরোধ। জীবনের আর সব কর্মকৌশলের মতো মৌলিক ও পারিপার্শ্বিক নানান কারণে সংঘটিত এই মতবিরোধেও মুসলিম পণ্ডিতগণ নিজস্ব ঐতিহ্য ধারণ করে রেখেছেন। দীনের বিধান রক্ষা ও সহজবোধ্য করে তোলার জন্য যে নিরলস প্রচেষ্টা সেটি যেমন তারা ধরে রেখেছেন, তেমনি মতবিরোধের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিদ্বেষ ও পারস্পরিক দূরত্ব থেকেও নিজেদের সযত্নে রক্ষা করেছেন। ইউনুস সাদাফি বলেন, “আমি ইমাম শাফেয়ির চেয়ে প্রজ্ঞাবান কাউকে দেখিনি। একদিন একটি মাসআলা নিয়ে তার সঙ্গে তর্ক করলাম এবং আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। পুনরায় তার সঙ্গে দেখা হলে আমার হাত ধরে তিনি বললেন : হে আবু মুসা, একটা মাসআলায় একমত হতে না পারলেও আমরা কি ভাই হতে পারি না?”

রাসুলের জীবদ্দশায় এমনকি ওহি নাজিল হওয়ার সময়েও উমর রা. বিভিন্ন বিষয়ে রাসুলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন। বহুক্ষেত্রে উমরের মত ও প্রত্যাশার পক্ষে কুরআনের বিধান নাজিল হয়েছে। এ ছাড়া রাসুলের সা. জীবদ্দশায় সাহাবিদের মাঝে রাসুলের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বোঝার ক্ষেত্রে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয় এবং রাসুলের মধ্যস্থতায় সেসব ভিন্নতার সমাধান ও সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছার উপলক্ষ্য তৈরি হয়। রাসুলের তিরোধানের পর সাহাবিগণ এবং তাদের উত্তরসূরিদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক মতপার্থক্য পরিলক্ষিত হয়, যা মুসলিম সমাজে একটি স্বাস্থ্যকর ও সুষ্ঠু বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার দ্বার উম্মুক্ত করে। ফলে মুসলিম উম্মাহ এমন এক স্মরণীয় যুগের জন্ম দেয়, যা মানবেতিহাসে অদ্বিতীয়। ধর্মতত্ত¡ থেকে শুরু করে বিজ্ঞান, গণিত, মহাকাশ, দর্শন, ভূগোল ইত্যকার সকল বিষয়েই তারা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার শীর্ষে অবস্থান করেন। অন্যান্য জাতিসমূহ ধ্বংস হয়ে গেছে তাদের আলেমদের কারণে, আর মুসলিম উম্মাহ তার স্বকীয়তা ও বিশুদ্ধতা রক্ষা করে চলেছে এই উম্মাহর আলেমদের নিরলস ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে—যারা মানুষকে বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যান কুরআন ও সুন্নাহর দিকে। কুরআন, হাদিস ও উম্মাহর পথপ্রদর্শকদের বক্তব্যের নির্যাসও তা-ই।

আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মুমিনগণ, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস কর, তবে তোমরা আনুগত্য করো আল্লাহর, আনুগত্য করো রাসুলের এবং তাদের, যারা তোমাদের মধ্যে ক্ষমতার অধিকারী; কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটলে তা উপস্থাপন করো আল্লাহ ও রাসুলের কাছে। এটাই উত্তম এবং পরিণামে প্রকৃষ্টতর।” রাসুল সা. বলেছেন, “প্রত্যেক প্রজন্মের ন্যায়নিষ্ঠ কিছু মানুষ এই ইলম বহন করবে। তারা এই ইলম থেকে সীমালঙ্ঘনকারী ও বাতিলপন্থিদের বিকৃতি এবং মূর্খদের ব্যাখ্যা দূর করবে।”  তিনি আরও বলেন, “প্রতি হাজার বছরে আল্লাহ এই উম্মতে একজন সংস্কারক পাঠাবেন।”

পরবর্তী যুগের আলেমগণ বিষয়ভেদে বিভিন্ন মত ধারণ করতেন। কিন্তু তারা সকলে একমত ছিলেন, দলিল কেবল কুরআন ও সুন্নাহ। ফলে যখনই কুরআন-সুন্নাহর কোনো দলিল পাওয়া যেত, তারা তা-ই আঁকড়ে ধরতেন। ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেছেন, “জেনে রাখা উচিত, যে ইমামগণ উম্মাহর কাছে ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়েছেন, তারা কেউ স্বেচ্ছায় রাসুলের সা. একটি হাদিসেরও বিরোধিতা করেননি, সূক্ষ্ম বা স্পষ্ট কোনো ধরনেরই নয়। রাসুলের অনুসরণ আবশ্যক হওয়ার ব্যাপারে তারা সকলে একমত।”

আমাদের দায়িত্ব হলো, মতবিরোধপূর্ণ বিষয়ে মুজতাহিদদের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখে কুরআন-সুন্নাহর ভিত্তিতে সমাধান খুঁজে বের করা; ভিন্ন মতধারণকারীদের প্রতি সহনশীল দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করা এবং শাখা-বিষয়গুলোতে ছাড় দিয়ে বৃহত্তর বিষয়াবলির প্রতি মনোযোগী হওয়া।

ইখতিলাফ কী ও কেন?

ইখতিলাফ এটি একটি আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ হলো ভিন্ন হওয়া, বিপরীত হওয়া। ঐকমত্যের বিপরীত হলো ইখতিলাফ। পরিভাষায় ইখতিলাফ বলা হয়, সত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কিংবা মিথ্যা অপনোদনের লক্ষ্যে পরস্পরের বিপরীতে অবস্থান গ্রহণ করা। আর যদি পরস্পরের বিপরীতে অবস্থানের ক্ষেত্রে সত্য প্রতিষ্ঠা কিংবা মিথ্যা অপনোদন উদ্দেশ্য না হয় তাহলে সেটা ইখতিলাফ নয়—সেটা ‘খিলাফ’ বা বিরোধিতা। ধর্মীয় কোনো নীতিতে মাজহাবের বৈপরীত্য বা সালাফদের (পূর্বসূরি আলেম) মতভেদকেই ইখতিলাফ বলা হয়; সেক্ষেত্রে এটি ‘ইজমা’র বিপরীত।

ইখতিলাফের কারণ হচ্ছে মানবপ্রকৃতি। মানুষের চিন্তা-চেতনায় মতবিরোধের প্রবণতা রয়েছে। এমনকি কুরআন ও হাদিসের নানান নসের (টেক্সট) মধ্যে ইখতিলাফের বীজ দেখা যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমার রব ইচ্ছা করলে সব মানুষকে এক জাতি করতে পারতেন, কিন্তু তারা মতবিরোধ করতেই থাকবে। তবে তারা নয়, তোমার রব যাদের দয়া করেন এবং তিনি তাদের সৃষ্টি করেছেন এজন্যই।”

আবি নাজিহ ইরবাস ইবনে সারিয়া রা. বলেন, “রাসুল সা. আমাদের নসিহত করলেন; তাতে অন্তর কেঁপে উঠল এবং অশ্রু প্রবাহিত হলো। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, যেন এটা বিদায়ী নসিহত! আপনি আমাদের অসিয়ত করুন। তিনি বললেন, আমি তোমাদের তাকওয়া অবলম্বনের অসিয়ত করছি এবং আনুগত্যের অসিয়ত করছি, যদি তোমাদের আমির একজন গোলামও হয়। তোমাদের মধ্যে যারা বেঁচে থাকবে তারা অনেক মতবিরোধ দেখবে। তখন তোমাদের কর্তব্য হলো, আমার এবং হেদায়াতপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদিনের আদর্শকে মাড়ির দাঁত দিয়ে আকড়ে ধরা, নব উদ্ভাবিত বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকা। নিশ্চয় প্রত্যেক বেদআতই ভ্রান্তি।”

ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেছেন, “যদি মতবিরোধ এমনভাবে হয় যে, সেটা বিভেদ এবং দলাদলির দিকে ঠেলে দেয় না এবং মতবিরোধকারীদের সবার উদ্দেশ্য হয় আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য, তাহলে সে-মতবিরোধ ক্ষতিকর নয়। সেটা এমন একটি বিষয়, যা মানবতার পরিগঠনে অপরিহার্য। যদি মূল উৎস, কাক্সিক্ষত লক্ষ্য এবং গৃহীত পন্থা এক হয়, তাহলে মতবিরোধ হতে পারে না। যদি হয়ও সেটা ক্ষতিকর নয়। যেমন, সাহাবিরা মতবিরোধ করেছেন। তাদের শেকড় ছিল একটাই—আল্লাহর কিতাব এবং নবীজির সুন্নাহ। তাদের লক্ষ্য ছিল একটাই, আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য। এবং তাদের পথও ছিল একটাই—কুরআন ও সুন্নাহর দলিলে সমস্যার সমাধান খোঁজা এবং কুরআন ও সুন্নাহকে সব মতামত, যুক্তি, রুচি ও রাজনীতির ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া।

Leave a Reply