অ-ইউরোপীয়রা কি চিন্তা করতে পারে?

সম্প্রতি আল জাজিরাতে বিখ্যাত ইউরোপিয় দার্শনিক (Slavoj Zizek) স্লাভোজ জিজেকের প্রশংসা করে চমৎকার একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। সেখান থেকে আমরা একটু পড়ি:

‘বর্তমান সময়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও সক্রিয় দার্শনিক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে জুডিথ বাটলার (Judith Butler), ইংল্যান্ডে সাইমন ক্রিচলে (Simon Critchley), স্পেনে ভিক্টোরিয়া ক্যাম্পস (Victoria Camps), ফ্রান্সে জ্যাঁ লুক ন্যান্সি (Jean-Luc Nancy), বেলজিয়ামে চ্যানটাল মৌউফ (Chantal Mouffe), ইতালিতে গিয়ানি বাত্তিমো (Gianni Vattimo), জার্মানিতে পিটার স্লটার্ডিজক (Peter Sloterdijk) এবং স্লোভেনিয়ায় স্লাভোজ জিজেক (Slavoj Zizek)। এছাড়া ব্রাজিল, চায়না ও অস্ট্রেলিয়াতে অন্যান্য যেসব দার্শনিক রয়েছেন তাদের নাম নাহয় নাইবা বললাম।’

শুরুতেই এরকম একটা অনুচ্ছেদ দেখে পাঠক তৎক্ষণাৎ যে হোঁচটটা খায় তা হলো একান্তই ইউরোপিয় আচার ও স্বভাবের বিষয়টাকে বেহায়ার মত ‘বর্তমান সময়ের দর্শন’ বলে উল্লেখ করা। এর মানে হচ্ছে দর্শনের চর্চা এবং বর্তমান কাল উভয়কেই ইউরোপিয়ানদের নিজস্ব বিষয় হিসাবে দেখানো।

এমনকি জুডিথ বাটলার, যাকে উপরোক্ত লেখায় যুক্তরাষ্ট্রের দার্শনিক হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনিও নিশ্চিতভাবে ইউরোপিয়ান দর্শনের সিলসিলা বহন করেন। কারণ, জেন্ডার ও সেক্সুয়ালিটি নিয়ে যে বোঝাপড়াটা তিনি আমাদের মাঝে হাজির করেছেন তা মূলত ইউরোপের দেরিদা ও ফুকোর চিন্তার মাঝামাঝি একটা অবস্থান।

অবশ্যই, লেখক চীন, ব্রাজিল, এবং অস্ট্রেলিয়াকে (এই অস্ট্রেলিয়া আবার মূলত ইউরোপেরই বর্ধিতাংশ) দর্শন চর্চার দেশ হিসাবে উল্লেখ করেছেন। দার্শনিকদেরকে ‘অন্যান্য দার্শনিক’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু লেখাটা পড়ে মনে হয় এসব দেশের কোনো সুনির্দিষ্ট দার্শনিকের নাম মহৎ ইউরোপিয় চিন্তকদের নামের পাশে উল্লেখ করার মত না।

অবশ্যই, আমি এখানে এইসব বিখ্যাত ইউরোপিয়ান এবং তাদের বলয়ের মধ্যে যুক্ত নির্দিষ্ট আমেরিকান দার্শনিকরা মূলত যেসব চিন্তা কাঠামো ধারণ করেন তার বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করছি না। এই দার্শনিকদের চিন্তা থেকে আফ্রিকার গহীন অঞ্চল থেকে শুরু করে ভারতের সবচেয়ে প্রান্তিক গ্রাম, চীন, ল্যাটিন আমেরিকা, আরব ও মুসলিম বিশ্বের প্রত্যন্ত (কাল্পনিক ইউরোপীয় কেন্দ্র থেকে দূরত্ব অর্থে প্রত্যন্ত) অঞ্চলের মানুষেরা অনেক কিছুই শিখতে পারে এবং ভালোভাবে তাদের জীবনযাপনের বিষয়গুলো বুঝতে পারে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে এই চিন্তকরা নিজেদের চিন্তার বৈশ্বিকতা নিয়ে আস্থাবান। অন্যথায় এসব দার্শনিকরা যে দার্শনিক ঐতিহ্য বহন করে তা আমাদের জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোকে ডিঙিয়ে না পারতো নিজেদের দর্শনকে বৈশ্বিক কিম্বা সার্বজনীন দাবি করতে, না পারতো একটা বাক্য লেখার জন্য কাগজে কলম রাখতে কিম্বা কিবোর্ডের উপর হাতের আঙ্গুল রাখতে।

(বিস্তারিত দেখুন জানুয়ারি-মার্চ ২০২০ সংখ্যায়)

Leave a Reply