আহমদ ছফার বুদ্ধিজীবী-বিচার

‘বাঙালীরা আজ যা হয়েছে তা ইংরেজদের জন্যই হয়েছে।’ এক সাক্ষাৎকারে কথাটি বলেছিলেন একজন বাঙালি বুদ্ধিজীবী এবং দীর্ঘদিনের ইংরেজদের চাকুরে অন্নদাশঙ্কর রায়। ইউরোপের বণিক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে ইংরেজরা ভারতবর্ষে এসেছিলো।  বৃহত্তর বাজার সৃষ্টি করা এবং একচেটিয়া ব্যবসা করাই ছিলো তাদের উদ্দেশ্য। সামন্তবাদী সমাজের পতনের ফলে ভারতবর্ষের বাজারে একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠা করা তাদের জন্য সহজই ছিলো। ব্যবসায়িক মুনাফা অর্জনের পথ ধরে তারা দেশে আধিপত্য বিস্তার করেছিলো এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে দুইশো বছর বাঙালিদের শাসন করেছিলো। তারা যা-কিছু করেছিলো মুনাফা লাভের জন্যই করেছিলো। তারা যে-শিক্ষাব্যবস্থা চালু করেছিলো তার পেছনেও কাজ করেছিলো মুনাফা লাভের আকাঙ্ক্ষা। তারা হিন্দু কলেজ আর সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিলো মূলত দেশীয় কেরানি সৃষ্টির জন্য এবং অজস্র সেবক ও কেরানি তারা সৃষ্টি করতে পেরেছিল। বাঙালি বুদ্ধিজীবী-বিচারের আগে ইংরেজ-কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এ-দুটি কারখানার খোঁজ রাখা আমাদের জন্য জরুরি। কারণ, এসব কেরানির মধ্যে যারা বুদ্ধিকে বুদ্ধি খাটিয়ে বেশি বিক্রি করতে পেরেছিলেন তাঁরাই বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। তাঁরা বুদ্ধি ও বিদ্যার বিনিময়ে বিত্তের বেসাতি করেছিলেন এবং নিজেদের মধ্যবিত্ত সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। শিক্ষার মধ্য দিয়ে তাঁরা শাসক গোষ্ঠীর সেবক সেজে বিত্ত অর্জনের বিদ্যা রপ্ত করেছিলেন এবং বুদ্ধি-ব্যবসার মনোবৃত্তি গ্রহণ করেছিলেন। কতিপয় আদর্শবান মানুষের কথা বাদ দিলে, ইংরেজরা যাঁদের শিক্ষিত করে তুলেছিল তাদের অধিকাংশই শাসক গোষ্ঠীর কল্যাণে ও আত্মস্বার্থে লব্ধ বিদ্যা-বুদ্ধি ব্যয় করেছিলেন। মোগলদের দীর্ঘকালীন শাসন থেকে মুক্ত বাঙালির পক্ষে চূড়ান্ত স্বাধীন মনোবৃত্তি গ্রহণ করা সম্ভব ছিলো না; তাঁরা শিক্ষিত হয়েছিলেন এবং বিদ্যা অর্জন করেছিলেন বটে, কিন্তু স্বাধীন সত্তা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছিলেন এবং দ্বৈত কল্যাণের উদ্দেশ্যে মুনাফা সৃষ্টিতে মনোযোগী ছিলেন। এভাবে বিদ্যার সঙ্গে বিত্তের এবং বুদ্ধির সঙ্গে বৈভবের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো। বিত্ত খরচ করে বিদ্যা অর্জন করতে হয়, আবার বিদ্যার জোরেই গড়া যায় বিত্ত। তাই বুদ্ধিজীবীর কাজ হলো বুদ্ধিকে জীবিকা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে করে তোলা—এই নীতিতেই বুদ্ধিজীবী শ্রেণির বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়েছিলো। এখনো পর্যন্ত বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা তাঁদের চিত্তে এই বিশ্বাসের উত্তরাধিকার লালন করে আসছেন।

(বিস্তারিত দেখুন জানুয়ারি-মার্চ ২০২০ সংখ্যায়)

Leave a Reply