ইসলামী দর্শনের ভাগ্য বিপর্যয়: গাজালি ও ইবনে রুশদ পুনর্পাঠ

আবু হামিদ গাযালির “হুজ্জাতুল ইসলাম” হয়ে উঠার পেছনে আল্লাহর কুদরতের বিস্ময়কর ছোঁয়া ছিল। বিশেষত তিনি দুটি জীবন্ত গ্রন্থের মধ্য দিয়ে চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন। একটি হচ্ছে “ইহয়াউ উলুমিদ্দিন”, অন্যটি “তাহাফুতুল ফালাসিফা”। প্রথমোক্ত গ্রন্থে স্থান পেয়েছে একজন মুসলিমের ইহ ও পরজাগতিক সফলতার অপরিহার্য উপাদান বিষয়ে আলোচনা। এর মধ্যে আছে কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক ইলমুল কালাম, প্রাত্যহিক জীবনে ইবাদাত ও চিত্তাকর্ষক আচার-ব্যবস্থাসহ দ্বীনি মৌলিক কার্যাবলীর বিবরণ। এছাড়াও জীবন জগতের নানা অনুষঙ্গ নিয়ে তার প্রথম রচনাটি উপজীব্য হয়ে উঠেছে। আবহমানকাল থেকে এসব বিষয় মুসলিম মনন, মানস ও অন্তরের উপযোগী আহার্যরুপে বিবেচিত হয়ে আসছে। এ কারণেই তাঁর সুবিস্তৃত অবদান অতীতের মতোই এ যুগেও নতুন বিবেচনায় গ্রহণীয় ও প্রাসঙ্গিক। তথাপি, তার এ আলোচিত কিতাবটিই মাগরিব বা পশ্চিমাদেশে পৌঁছলে, কতিপয় গোঁড়াপন্থি আলেম বেঁকে বসে। তারা মনে করে, ইমাম গাযালি এতে সুন্নাহ বিরোধী বিপুল কথার সমাবেশ ঘটিয়েছেন। ফলাফলে ফিতনা সর্বসমাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, যাবতীয় কপি আগুনে পোড়ানো হয়।(১)

ইমাম গাযালি ও তাহাফুতুল ফালাসিফা

গাযালির দ্বিতীয় কিতাব “তাহাফুতুল ফালাসিফার” আগমনকালে “ইসলামি দর্শন” সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে ছিল। ইবনে সিনার হাতে তখন নির্ধারিত হচ্ছিল “ইসলামি দর্শনের” নীতি। কিন্তু অনেকের নিকটই ইসলামি দর্শনের ভিন্নরূপ ধরা পড়ল। ইবনে সিনার দর্শনে এমন অনেক ধারণা শিকড় গেড়েছিলো, যার সাথে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের ন্যূনতম সম্পর্ক নেই। এমন সঙ্কটে ইমাম গাযালি হাজির হন “তাহাফুতুল ফালাসিফা” নিয়ে। তাজুদ্দীন সুবকির ভাষায়, তখন আসমানি আলোর চেয়ে দার্শনিকদের দিকভ্রষ্টতার খণ্ডনের প্রতি মানুষ বেশী মুখাপেক্ষী ছিল।(২)

দার্শনিকদের উপর আগ্রাসী প্রতিক্রিয়ার ধারা গাযালিই আরম্ভ করেছেন, এমন ধারণা নিতান্তই অযথার্থ। কারণ, সেসময়ে সুন্নাহর অনুসারী মুতাকাল্লিম বা বিতার্কিকগণ মু’তাযেলিদের বিরোধিতাকে দরকারি মনে করেন। মু’তাযেলিরা ধর্মীয় কিছু বিষয়ে মাত্রাতিরিক্ত মুক্তচিন্তার প্রবক্তা ছিল। ফলে মুতাকাল্লিমগণ গ্রীক-দর্শনের খণ্ডনে তখনই সচেষ্ট হন, যখন মুসলিমদের মধ্যে একাডেমিক পর্যায়ে দর্শন-চর্চার ধারা শুরু হয়। এ তালিকায় আবুল হাসান আশয়ারির পরেই আমরা ইমাম গাযালির ওস্তাদ জুওয়াইনির নাম উল্লেখ করবো। ধর্মতত্ত্ব ও তর্কশাস্ত্রে তার অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ইমাম গাযালি ‘আল মুনকিয মিনাদ্দালাল’–এ লিখেছেন, “মুসলিম জ্ঞানীদের এমন কাউকে আমি পাইনি যিনি দর্শনচর্চা ও এর খণ্ডনে সচেষ্ট ছিলেন।” কিন্তু, গাযালির আগেও বহুজনের সরব উপস্থিতি আছে, যারা বিপথগামী চিন্তকদের খণ্ডনে নিবিষ্ট ছিলেন। যেমন, ইমামুল হারামাইন জুয়াইনি “পৃথিবীর অনাদিত্ব” নিয়ে লিখেছেন, “চতুর্থ মূলনীতিতে আমরা এমন কিছু নশ্বর বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো, আদিতে যার অস্তিত্ব ছিল না। এ মূলনীতিতে প্রবেশ অতি জরুরী। এ মূলনীতি প্রতিষ্ঠিত হলে নাস্তিক্য বলয়ে প্রকম্পন সৃষ্টি হবে। কারণ, নাস্তিক্যবাদের সারকথা হলো, জগত তার গতি-প্রকৃতিসহ নিরন্তর বিদ্যমান। অথচ কক্ষপথের প্রতিটি আবর্তনে চিন্তা ভাবনা করলে লক্ষ্য করি, তা পূর্বের আবর্তন থেকে ভিন্ন। সুতরাং, পরবর্তী আবর্তনের অনাদিত্ব সহজেই অনুমিত হচ্ছে, জগতের কিছুই আদি থাকছে না।(৩)

এছাড়া ইমামুল হারামাইন স্রষ্টার বিদ্যমানতা নিয়েও যথার্থ আলোচনা করে লিখেছেন, “কার্যকারণ রীতি অনুসারে সকল কারণের একটি কার্য অবশ্যই থাকতে হয়। এ ক্ষেত্রে কোন বস্তুকে কারণ ধরে নিলে তার আদিত্ব ও অনাদিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠে । সেই বস্তুকে আদিকারণ ধরে নিলে জগতের আদিত্ব আবশ্যক হয়ে যায়। অথচ তার অসারতা পূর্বে উল্লেখ করা হলো। অন্যথায় সে বস্তুগত কারণকে অনিত্য ধরা হবে। এক্ষেত্রে এমন কারো উপস্থিতি অতি আবশ্যক যার দ্বারা কার্যকারণের এই ক্রমাগত ধারা রুদ্ধ হয়ে যাবে। তিনি আদিকারণ রূপে বিবেচিত হবেন । বলাবাহুল্য তিনিই আল্লাহ।(৪)

ইমাম গাযালির সৃষ্টি ও স্রষ্টা সংক্রান্ত দার্শনিক আলাপে ইমামুল হারামাইন-এর আলোচিত দিকগুলো ভাস্বর হতে দেখা যায়। এছাড়াও ইমাম গাযালি নাস্তিক ‘ইবনে রাওয়ান্দির’ খণ্ডনে লেখা আবুল হাসান খাইয়্যাতের বক্তব্য থেকেও গ্রহণ করেছেন। জগতের ‘নশ্বর টুকরা বস্তুসমূহের’ ব্যাপারে আল্লাহর জ্ঞান সংক্রান্ত আলোচনায় ইমাম গাযালি দার্শনিকদের খণ্ডনে যে বক্তব্য হাজির করেন, তার সাথে খাইয়াতের বক্তব্যের বিস্তৃত অংশের মিল পাওয়া যায়। (৫)

গাযালির সাথে পূর্ববর্তীদের যোগসূত্রের ক্ষেত্র বিস্তৃত, বিশেষত বিপথগামী দলগুলোর জবাবি দিকগুলোতে। সবশেষে যোগসূত্রের আলোচনায় তৃতীয় যার নাম মথিত হয়, তিনি আবু মুহাম্মদ ইবনে হাযম জাহেরি। জগতের আদিত্ব নিয়ে কারও কারও বক্তব্য ছিল প্রান্তিক, তারা আদি কারণ স্রষ্টার অস্তিত্ব স্বীকার করলেও, জগতের অনিত্য হওয়াকে অস্বীকার করেছেন। ইবনে হাযম তাদের জবাবে লিখেছেন, “সকল কার্য বা জগত শূন্য থেকে অস্তিত্বে এসেছে, সুতরাং, এটি অনিত্য । পূর্বে ছিল না এমন সকল বস্তুই নশ্বর, অনিত্য। তাই দার্শনিকদের এ প্রান্তিক বক্তব্য বিবেকবিরুদ্ধ।(৬) ইবনে হাযমের এ প্রমাণ ও জবাবি বক্তব্য গাযালির ‘তালবিসুল ফালাসিফা’ সংক্রান্ত আলোচনার কাছাকাছি অবস্থিত।(৭) অথচ স্বীকৃত যে ইবনে হাযমের মৃত্যু ৪৫৬ হিজরি; গাযালি তার রচনা পড়েছেন এবং মুগ্ধ হয়েছেন।(৮)

যাইহোক, এসব আলোচনার মধ্যে ইমাম গাযালির মর্যাদা ও মূল্যায়নকে খাটো করা বা পূর্ববর্তীদের সাথে সমীকরণ উদ্দেশ্য না, বরং এ আলোচনার প্রতিপাদ্য হলো ইমাম গাযালির সালাফ বা শিকড় সন্ধান। তবে ইমাম গাযালির এসব অগ্রজদের থেকে তত্ত্ব যাহির করার বিষয়টা স্বাভাবিক। ইমাম গাযালির জন্ম আবূ আলি সিনার মৃত্যুর ২০ বছর পরে। সে হিসেবে ইবনে সিনা ধর্মতত্ত্বের তুলনায় দর্শনে যে মর্যাদা ও শক্তিমত্তার জোগান দিয়েছেন, গাযালি তা প্রত্যক্ষ করেছেন। সেই সাথে দার্শনিকদের খণ্ডনে সর্ব অস্তিত্ব লীন করেছেন । ইমাম গাযালি একাধারে ফকিহ, ধর্মতত্ত্ববিদ ও সুফি ছিলেন। দর্শন চর্চায় ছিল তার গভীরতা। তিনি দেখলেন যে, ভাগ্য তাকে দর্শন ও দার্শনিকদের বিরুদ্ধে এক নীতিনির্ধারক রণক্ষেত্রে উপস্থিত করেছে। তিনি স্বীয় রচনা সমূহে যে বিষয়ে মনস্থির করেছেন, অত্যন্ত চৈতন্য ও শক্তিশালী বুদ্ধিমত্তার সাথে তার যথার্থ প্রয়োগ হয়েছে । এ হচ্ছে ক্ষীণ পরিসরে ইমাম গাযালির পরিচয়। দর্শন ও দার্শনিকদের বিপরীতে তিনি অন্তহীন যুদ্ধে নেমেছিলেন, ‘তাহাফাতুল ফালাসিফা’র মতো গ্রন্থ এ বিষয়ে তিনি লিখেছেন।

(বিস্তারিত দেখুন জানুয়ারি-মার্চ ২০২০ সংখ্যায়)

৩টি মন্তব্য

Leave a Reply