ইবনে খালদুন কেন প্লেটো, এরিস্টটল ও আল ফারাবির চেয়ে ভিন্ন?

ইবনে খালদুনের পূর্বের জ্ঞান ইতিহাসে আমরা এমন কোন জ্ঞানসাধক বা দার্শনিকের খোঁজ পাইনা, যিনি সমাজের গতি প্রকৃতি ও সমাজের উত্তরণ-অধঃপতনের স্বাভাবিক নীতিমালা নিয়ে পৃথকভাবে কোন পুস্তকে প্রণয়ন করে গিয়েছেন; যাকে আমরা সমাজবিজ্ঞান বলে অভিহিত করে থাকি। যদিও এ বিষয়টা কোন অজ্ঞাত রহস্যের মত গুপ্ত ছিলো না। এটাকে ঘিরে যে দার্শনিকদের চিন্তা আবর্তিত হয়নি, এমনও নয়। বরং আমরা দেখতে পাই, ইবনে খালদুনের পূর্বে বিভিন্ন দার্শনিক এ বিষয়ে দৃষ্টিপাত করেছেন, তাদের রচনাবলীতে ইশারা ইঙ্গিত দিয়েছেন; কিন্তু ইবনে খালদুন সমাজ-সম্পর্কিত বিদ্যাকে যেভাবে একটা শাস্ত্রীয় কাঠামোয় বেধে দিয়েছেন, সেই আবিষ্কারের সৌভাগ্য তার পূর্ববর্তীদের ভাগ্যে জোটেনি। পূর্ববর্তীরা ইবনে খালদুনের মত সমাজের সামগ্রিক প্রশ্ন ও সংকট তুলে ধরতে পারেননি; আলোচনায় আনতে পারেননি এর সমাধানগুলো। সে হিসেবে ইবনে খালদুনকেই বলা যায় সমাজবিজ্ঞানের জনক ও অধিকর্তা। তিনি এই পথের সমস্ত দিগন্তের মানচিত্র এঁকে দিয়েছেন।

কারাদে ভক্সের মূল্যায়ন

বিখ্যাত ফরাসি প্রাচ্যবিদ কারাদে ভক্স (Carra de Vaux) মুসলিম চিন্তকদের নিয়ে লিখিত তার ‘Les penseurs de l’Islam’ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে লিখেছেন, ‘আফ্রিকা জ্ঞানের ইতিহাসে জন্ম দিয়েছে প্রথম সারির একজন সমাজবিজ্ঞানী ইবনে খালদুনকে, যার পূর্বের পৃথিবীতে এমন কোন জ্ঞানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়না, যা ইতিহাসের দর্শন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও বিশুদ্ধ ব্যাখ্যা দিতে পেরেছে। কারণ, জাতিসত্তার আধ্যাত্মিক অবস্থা, এর উপর আরোপিত পরিবর্তনশীলতার কার্য-কারণ, রাষ্ট্র জন্মের প্রক্রিয়া, বিবর্তন, উত্থান-পতন, এরই মাঝে বেড়ে উঠা সভ্যতা-সংস্কৃতির বৈচিত্র্য নিয়ে ইবনে খালদুন তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-মুকাদ্দিমা’য় যে অতলস্পর্শী আলোচনা করেছেন, আধুনিক ইউরোপেও খ্রিস্টীয় অষ্টাদশ শতকের পূর্বে আমরা এমন চিন্তাবিদের সন্ধান পাইনা, যিনি ইতিহাসদর্শনের গুপ্ত রহস্যগুলো উন্মোচনে সক্ষম হয়েছেন। এদিক থেকে ইবনে খালদুন বুদ্ধিবৃত্তিক ধারায় মন্তেস্কুঁ (Montesquien), ম্যবলি (Mably), তারদে (Tarde), গবিন্যানের (Gobinean) মত সমাজচিন্তকদের অগ্রজ মুরুব্বী।

‘Les prenseurs de l’Islam’ গ্রন্থের লেখক জীবনী শীর্ষক আলোচনায় লিখেছেন, চার্লস বার্গেজ (Bargues) ইবনে খালদুনের সমালোচনা করে লিখেছেন, ‘তার মধ্যে একক অবস্থার উপর মোটেও স্থিরতা ছিল না। রাজনৈতিক দিক থেকে তার আদত ছিল, নিছক ব্যক্তিগত স্বার্থে ও নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে বারবার চেহারা পাল্টে এক দল হতে অন্য দলে ঠাঁই নিতেন।’ এখানে বার্গেজ ইবনে খালদুনের যুগের অস্থিতিশীল প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক ভঙ্গুরতা, অর্থনৈতিক সংকটের বিষয়টি হয়তো চোখের সামনে রাখেননি, যেগুলোর অভিঘাত ইবনে খালদুনের পরিবর্তন-প্রবণতাকে নিজের জীবনে স্বাগত জানাতে বাধ্য করেছে। কিন্তু মজার বিষয় হল, বার্গেজ ইবনে খালদুনের অস্তিত্বে অস্থিরতার তকমা আঁটলেও আখেরে তাকে অভিহিত করেছেন ‘দার্শনিক ঐতিহাসিক’-এর অভিধায়।

কারাদে ভক্স এরপর উল্লেখ করেছেন, কিভাবে ইবনে খালদুন জীবনের অনবরত তাগাদায় গ্রানাডার সুলতানের চোখের আড়ালে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন কাস্তিলের জালিম সুলতান বেত্রার নিকটে। কিভাবে এই জালিম সুলতান ইবনে খালদুনকে লোভের ঝকমক আলেয়ায় দৃষ্টি ধাঁধিয়ে দিয়ে নিজের বুদ্ধিজীবী বানানোর কোশেশ করেছিলেন। কিন্তু এইসব ফন্দিফিকিরের ছিপে ইবনে খালদুনের লাগাম বাঁধতে পারেননি। এরপর লেখক প্রসঙ্গ টেনেছেন মিসরে হিজরতের অতিবাহিত দিনগুলোর, যেখানে তিনি কাজির পদে কাজ করেছেন। কিছুদিন বাদেই তিনি সফরসঙ্গী হন সুলতানের, তৈমুর লংয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রায়। তৈমুর লংয়ের সাথে ইবনে খালদুনের যেসব বোঝাপড়া হয়েছিল, তারও ইতিবৃত্ত তিনি বইতে তুলে ধরতে ভুলেননি। চুয়াত্তর বছর এই পৃথিবীর আলো বাতাসে প্রাণচঞ্চল নিঃশ্বাসে জীবন অতিবাহিত করে ১৪০৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

(বিস্তারিত দেখুন জানুয়ারি-মার্চ ২০২০ সংখ্যায়)

Leave a Reply