আশরাফ আলী থানভীর আধ্যাত্মিক রাজনৈতিক চিন্তাধারা

আশরাফ আলী থানভীকে বলা হয় হাকিম উল উম্মত। হাকিম উল উম্মত অর্থ হচ্ছে জাতির চিকিৎসক। চিকিৎসক যেমন তার পেশাগত জ্ঞান দিয়ে অসুস্থ ব্যক্তিকে ধীরে ধীরে আরোগ্য করে তোলেন, তেমনি থানভী ঔপনিবেশিক ভারতে বিধ্বস্ত, পিছিয়ে পড়া, প্রান্তিক মুসলমানদের ভিতরে ইসলামী নৈতিকতার আলো জ্বালিয়ে তাদের আত্মবিশ্বাসকে পুনর্জীবিত করার চেষ্টা করেছিলেন।

ভারতে কয়েকশ বছরের মুসলিম শাসনের অবসান এবং ১৮৫৭ সালের আজাদী আন্দোলনের ব্যর্থতা পরবর্তী ইংরেজের প্রতিশোধকামিতার  মধ্যে ১৮৬৭ সালে উত্তর ভারতে বিখ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতারা ছিলেন ১৮৫৭’র আজাদীর যুদ্ধে বেঁচে যাওয়া কয়েকজন গাজী মুসলমান। এরা মনে করেছিলেন রাজনৈতিক ও সামরিক ভাবে পরাজিত মুসলমানদের নৈতিকভাবে যদি শক্তিশালী না করা যায়, তবে ভারতের বুকে ইসলাম স্পেনের পরিণতি বরণ করতে পারে। ১৮৫৭’র যুদ্ধে আলেমরা আজাদীর অন্বেষায় বেহিসাব খুন ঝরিয়েছিলেন। কিন্তু সেই আজাদী তখন মেলেনি। নতুন পরিস্থিতিতে আলেমরা তাই ইসলামী নৈতিকতা ও সংস্কৃতির চর্চা করে একদিকে ইংরেজের রাজনৈতিক অভিঘাত, অন্যদিকে খ্রিস্টান মিশনারিদের উপদ্রব এবং ইসলামের বিরুদ্ধে ওরিয়েন্টালিস্টদের নিরবচ্ছিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচারণার মোকাবিলা করতে চেয়েছিলেন। এই বিপ্লবী আলেমদের ভাব সন্তান (Brain child) আশরাফ আলী থানভী ছিলেন এই মাদরাসার ছাত্র এবং এটির বিপ্লবী সিলসিলার সার্থক ওয়ারিশ। অধ্যাপক কাশিম জামান দেওবন্দ মাদরাসার এই বৈশিষ্ট্যের কথা তুলে ধরেছেন, যা আমরা পরবর্তীকালে থানভীর জীবনে প্রতিবিম্বিত হতে দেখি:

To the early Deobandis, a self-conscious adherence to the teachings of the Qur’an and the hadith, as refracted through the norms of the Hanafi school of law, and a sense of individual moral responsibility were among the best means not only of salvation but also of preserving an Islamic identity in the adverse political conditions of British colonial rule.[১]

আশরাফ আলী থানভী ছিলেন একাধারে দরবেশ ও সুফি, মুফতি, শাস্ত্রজ্ঞ, শিক্ষক, সংস্কারক, লেখক ও প্রচারক। থানভী প্রধানত মুসলমান নারীদের ভিতরে সেইকালে সংস্কার আনবার জন্য লিখেছিলেন তার বিখ্যাত গ্রন্থ বেহেশতী জেওর – স্বর্গীয় অলংকার। এটি গত শতাব্দীর একটি অন্যতম প্রভাবশালী কিতাব যা উপমহাদেশের সাধারণ মুসলমান জনগণের জীবনকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করেছে। ইসলামী শাস্ত্র ও ধর্মতত্ত্ব নিয়ে থানভীর লেখালেখি, বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক তার অসংখ্য ফতওয়া যেমনি জীবদ্দশায় তাকে অত্যন্ত প্রভাবশালী আলেমে পরিণত করেছিল, তেমনি উত্তর ঔপনিবেশিক উপমহাদেশে ইসলামী আইনের কাঠামো নির্মাণে তার চিন্তা এখনও ক্রিয়াশীল রয়েছে। শুধু তাই নয়, লেখালেখির পাশাপাশি তার কয়েকজন স্বনামধন্য ছাত্র দক্ষিণ এশীয় ইসলামের বুদ্ধিজীবিতার জগৎকে রীতিমতো রোশনাই করে দিয়েছেন। থানভী ও তার  ছাত্ররা আধুনিক কালে দক্ষিণ এশীয় ইসলামের একটি রূপ দেয়ার চেষ্টা করেছেন। পাশাপাশি তাদের ধর্মীয় কর্তৃত্ব কীভাবে বুদ্ধিবৃত্তি ও রাজনীতির জগতকে প্রভাবিত করেছে সেটিও চিত্তাকর্ষক আলোচনার বিষয়।

(বিস্তারিত পড়তে পিডিএফ ডাউনলোড করুন)

১টি মন্তব্য

  • দারুণ একটি কাজ হয়েছে, জাযাকুমুল্লাহ। তরুণ প্রজন্মের অনেকে (তারা ব্যক্তি জীবনে যথেষ্ট ধার্মিক) এ মহান ব্যক্তিকে হেয় করে কথা বলে, যা আমার কাছে কথিত সহিহ ধারার কুফল মনে হয়।

Leave a Reply