মনিপুরের স্বাধীনতা ও ভারত রাষ্ট্রচিন্তায় ঘাটতি

গত অক্টোবর মাসের ২৯ তারিখে আচমকা মনিপুরের স্বাধীনতাকামী কিছু নেতা মনিপুর রাজ্যকে ভারত থেকে স্বাধীন বলে ঘোষণা করে বসে। তারা লন্ডনে বসে এই ঘোষণা দেন ও সেখানেই এক প্রবাসী সরকার গঠন করা হয়েছে বলে জানান। তারা মনিপুরের মহারাজা লেইশেম্বা সানাজাওবার নির্দেশে এই স্বাধীনতা ঘোষণা করেন বলেও জানিয়েছেন।

– পুনর্পাঠ

ভারতের নর্থ-ইষ্টের সাত রাজ্যের (সিকিমকে সাথে ধরলে আট রাজ্য) সবচেয়ে বড় রাজ্য হল আসাম। এছাড়া বাকিগুলো সবই ছোট ছোট রাজ্য। অন্যভাবে বলা যায় ১৯৭২ সালের আগে এরা হয় আসাম রাজ্যের সাথে অন্তর্ভুক্ত হয়ে ছিল, নয়তোবা এরা কোন রাজ্য নয়, কেন্দ্র-শাসিত অঞ্চল হয়ে ছিল। আলাদা রাজ্য বলে কেউই ছিল না। সেগুলোকেই ১৯৭২ সালে (বা এরপরের সময় কালে) ট্রাইবাল পরিচয়ের ভিত্তিতে যার যার সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাকে আলাদা আলাদা রাজ্য বলে ভাগ করে দেয়া হয়েছিল। এই আট রাজ্যের কার কেমন জনসংখ্যা তা বুঝার একটা তরিকা হতে পারে কার ভাগে কয়টা কেন্দ্রীয় সংসদে (এমপি) আসন পড়েছে তা দিয়ে। যেমন পুরা নর্থ-ইস্টের আট রাজ্যের মোট এমপি আসন ২৫, যার মধ্যে একা আসামেরই ভাগে ১৪টা। আর ওদিকে মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও সিকিমের একটা করে আসন। আবার অরুণাচল, মনিপুর, মেঘালয় আর ত্রিপুরা — এরা প্রত্যেকের দুটা করে। এই হিসাবে এখন প্রায় ২৮ লাখ জনসংখ্যার ছোট মনিপুর রাজ্যের ভাগে দুটা এমপি আসন। এই হল স্বাধীনতা ঘোষণা দেয়া মনিপুর সম্পর্কে কিছু বেসিক তথ্য।

ভৌগোলিক গঠনের দিক থেকে ভারতের পুরা নর্থ-ইস্টই প্রধানত পাহাড়ি এলাকা। আর যেকোনো পাহাড়ি এলাকায় যেমন একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায় তেমনি এই পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষদের পড়শি সমতলি বড় জনসংখ্যার ভূমি ও প্রাকৃতিক রিসোর্স চাহিদার চাপ সব সময় তাদেরই বইতে হয় বা তাদের উপরেই এসে পড়ে। সমতলিদের থেকে দূরে থাকতে তারা সমতল ভূমি তাদেরকে ছেড়ে দিয়ে আরো উঁচু পাহাড়ে সরে গিয়ে নিজের মত বসবাস করতে থাকে। তা এখানেও ব্যতিক্রম নয়, নর্থ-ইস্টেও তা শুরু হয়েছিল বহু প্রাচীন কাল থেকে। এসব পাহাড়ি বাসিন্দাদেরকে পাহাড়ি, ট্রাইব, উপজাতি, জনজাতি, আদিবাসী ইত্যাদি নানান নামে ডাকার রেওয়াজ দেখা যায়। এছাড়া শাসন ও শাসিত হবার দিক থেকে ব্রিটিশরা ভারতে আসার বহু আগে থেকে এরা নিজ স্বাধীন রাজার রাজ্য হিসাবে শাসিত ছিল। সেগুলোই পরে ব্রিটিশের অধীনতায় চলে যাবার পরে ‘প্রিন্সলি স্টেট’ বা করদ রাজ্যের মর্যাদা নিয়ে টিকে যায়। মানে আগের মত তাঁদের রাজারাই রাজ্য-প্রশাসন চালাবে কিন্তু, আদায় করা রাজস্বের একটা অংশ ব্রিটিশদের সাথে শেয়ার করবে। আর এরা ব্রিটিশেরা ছাড়া অন্য কারও সাথে কোন বৈদেশিক বা সামরিক সম্পর্ক করতে পারবে না। বিদেশের সঙ্গে ব্যবসা এবং সামরিক বিষয়াদিতে ব্রিটিশদের একচেটিয়া কর্তৃত্ব মেনে নিতে হবে। এঙ্গলো-মনিপুর যুদ্ধ ১৮৯১ সালে হয়েছিল; আর এই যুদ্ধের পর থেকে মনিপুর ব্রিটিশ করদ রাজ্যে পরিণত হয়। যদিও মনিপুরের বেলায় কিছু বিশেষ ব্যতিক্রম ঘটনা ছিল। যেমন মনিপুরের পূর্ব সীমান্ত পুরাটাই আসলে বার্মিজ সীমান্ত। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার মতে, এরা ১৭৬২ সালে মানে, পলাশী যুদ্ধে ব্রিটিশ বিজয়ের পরের কালের কিছু তথ্য জানিয়ে বলছে, যে সেসময়ের মনিপুরের মহারাজা জয় সিংহ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে এক চুক্তি করেছিল যেন তারা মনিপুর থেকে দখলদার বর্মান বা বার্মিজদেরকে উৎখাত বা বের করে দিতে তাদের সাহায্য করে। কিন্তু পরবর্তীতে ১৮২৪ সাল পর্যন্ত এবিষয়ে খুব কিছু অগ্রগতি হয় নাই; তখন মনিপুরের রাজা আবার দ্বিতীয়বার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু মনিপুরের প্রায় সব রাজার বেলাতেই উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্ক ফ্যাসাদ হয়েছিল; আর মনিপুরের প্রায় সব রাজার আমলেই সিংহাসনে বসার শুরুতে তা ঘটেছিল। ১৮৯১ সালে এমনই পাঁচ বছর বয়সের সেকালের রাজপুত্রের সিংহাসনে আরোহণ নিয়ে এক বিতর্ক দেখা দিলে তা নিরসন করা হয়েছিল ব্রিটিশ সহায়তা ও প্রটেকশনে। এথেকেই ব্রিটিশদের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা ও বার্মিজদের মনিপুর থেকে চির উৎখাত ঘটেছিল।

(বিস্তারিত দেখুন জানুয়ারি-মার্চ ২০২০ সংখ্যায়)

Leave a Reply