বাংলাদেশ হোক ‘সবার জন্য’

বাংলাদেশ জনসংখ্যার দিক থেকে অষ্টম বৃহত্তম দেশ।[১] এ দেশের গৌরবোজ্জ্বল একটি ইতিহাস রয়েছে, এবং এ দেশের মানুষ পরিশ্রমী ও সাহসী; তারপরও দেশ হিসেবে আমরা সবদিক থেকে পিছিয়ে রয়েছি। পিছিয়ে পড়ার কিছু কারণ আমাদের চোখের সামনে দৃশ্যমান; যেমন দুর্নীতি, রাজনৈতিক বিভাজন, রাজনীতিবিদদের ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি, ইত্যাদি। কিন্তু এর পাশাপাশি বাংলাদেশের সম্মুখে অগ্রসর না হওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে আমরা একটি ‘ইনক্লুসিভ’ (সবার জন্য) বাংলাদেশ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছি।

বাংলাদেশ সরকারের Directorate of Primary Education (DPE) এর তথ্যানুসারে, বাংলাদেশে আনুমানিক ১৬ লক্ষ প্রতিবন্ধী শিশু রয়েছে যারা প্রাইমারী স্কুলে যাওয়ার যোগ্য, কিন্তু তার মধ্যে মাত্র ৪% প্রতিবন্ধী স্কুলে পড়ালেখার সুযোগ পায়, বাকি ৯৬% প্রতিবন্ধী শিশু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত।[২] আবার এই ৪%-এর বেশির ভাগই মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে লেখাপড়া অবস্থায় বৈষম্য, শিক্ষকদের অনভিজ্ঞতা ও প্রতিবন্ধীদের উপযোগী সুযোগ সুবিধার অভাবের কারণে ঝরে পড়ে। এই ১৬ লক্ষ প্রতিবন্ধীদের উপযোগী একটি ইনক্লুসিভ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠলে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে যেত। প্রতিবন্ধীরাও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অবদান রাখতে পারত। মেহেরপুরের ওমর ফারুক মামুন একটি বড় উদাহরণ। বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক ‘কালের কণ্ঠে’র ৩ জানুয়ারি ২০১৭-এর একটি রিপোর্টের পর তিনি পরিচিতি পান।[৩] মামুন দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে ২০০৬ সালে এইচএসসিতে পড়া অবস্থায় পড়ালেখা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। ২০১২ সালে তিনি আবারও পড়ালেখায় মনোযোগী হন এবং এইচএসসি পাশ করেন। মামুন দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী হয়েও পরিশ্রম করে নিজে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিয়ে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ‘আইকন আইসিটি এন্ড কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার’ উদ্বোধন করেন। তিনি শিক্ষার কারণে নিজে স্বাবলম্বী হয়েছেন, পরিবারকে স্বাবলম্বী করেছেন, পাশাপাশি নিজের এলাকার ছাত্র-ছাত্রীদের কম্পিউটার শিক্ষায় শিক্ষিত করার চেষ্টা করছেন।

প্রতিবন্ধী শিশুদের মত বাংলাদেশের অধিকাংশ পথ-শিশুরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। Bangladesh Institute of Development Studies (BIDS)-এর ২০০৫ সালের একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায় বাংলাদেশে প্রায় ৭ লক্ষ পথ-শিশু রয়েছে, যার মধ্যে ঢাকাতেই পথ-শিশু রয়েছে প্রায় আড়াই লক্ষ।[৪] একই রিপোর্টে প্রজেকশন করা হয় ২০১৫ সালে পথশিশুর এ সংখ্যা হবে ১৫ লক্ষ। অধিকাংশ পথ-শিশুরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে অল্প বয়সেই বিপজ্জনক, ঝুঁকিপূর্ণ এবং স্বল্প বেতনের কাজে ঢুকে যাচ্ছে। অনেক পথশিশু ঝুঁকে পড়ছে মাদক সেবনে, অনেককেই কাজে লাগানো হচ্ছে সেক্স ট্রাফিকিং-এ। শিক্ষাখাতে ‘সবার জন্য শিক্ষা’ আমরা নিশ্চিত করতে পারিনি।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতেও আমরা ‘সবার জন্য চিকিৎসা সেবা’ নিশ্চিত করতে পারিনি। The World Bank-এর তথ্যানুসারে বাংলাদেশের প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য মাত্র ৩ টি হাসপাতালের বেড রয়েছে, প্রতি ২০০০ মানুষের জন্য ১ জন ডাক্তার এবং প্রতি ৫০০০ হাজার মানুষের জন্য মাত্র ১ জন নার্স কাজ করছেন।[৫] বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে বাংলাদেশে প্রায় ১৬০০০ ডাক্তার সরকারী হাসপাতালে কাজ করে।[৬] হাসপাতাল, রোগীদের বেড ও সরকারী ডাক্তারের স্বল্পতা ইঙ্গিত দেয় বাংলাদেশের চিকিৎসা সেবার করুণ অবস্থা।[৭]

(বিস্তারিত দেখুন জানুয়ারি-মার্চ ২০২০ সংখ্যায়)

Leave a Reply